পটিয়া ইউপি নির্বাচনে অনিয়মে তদন্ত : রহস্য উম্মোচন

666

পটিয়া করেসপন্ডেন্ট :: সারাদেশে গত ২৮শে মে অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধিনে চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলার ১ন (খ) চরপাথরঘাটা ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে ২টি কেন্দ্রে ব্যাপক জালভোট, কেন্দ্র দখল, ভোট কারচুপিসহ অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে পটিয়া উপজেলা পরিদর্শন করে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটি।

গত ২১ নভেম্বর সোমবার সকাল ১০ টার দিকে ১ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটির প্রদান ও চট্টগ্রাম বিভাগের আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা আব্দুল বাতেন পটিয়া পরিদর্শন করেন। এবং পূর্বে নোটিশ ইস্যূ করায় নির্বাচন কালীন দায়িত্বরত সকল রির্টানিং অফিসার, প্রিজাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসার সহ সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের চেয়ারম্যান প্রার্থী মেম্বার ও মহিলা প্রতিদ্বন্দী প্রার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।

চরপাথরঘাটা ইউনিয়নে ১নং ওয়ার্ডের হামিদিয়া এতিমখানা ও মাদ্রাসা এবং ২নং ওয়ার্ডের চরপাথরঘাটা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভোট কেন্দ্র অনিয়ম বিষয়ে সকলের আলাদা আলাদা জবানবন্ধী গ্রহণ করেন। এমনকি পোলিং এজেন্টেদের কাছে তদন্তকারী কর্মকর্তা কর্তৃক ১৪টি প্রশ্নের উত্তর সম্বলিত লিখিত বক্তব্য গ্রহণ করেন। সরজমিনে উপস্থিত থেকে তা প্রত্যেক্ষ করেন। ঐ সময় স্থানীয় জনগণের সাথে কথা বলে অভিযোগ সম্পর্কে তথ্য উপাত্ত যাচাই করে নেন তিনি। পরে অভিযুক্ত প্রতিদ্বন্দী প্রার্থী, তাদের সমর্থক, নির্বাচনী কর্মকর্তা কর্মচারী,প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাসহ স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে তাদের স্বাক্ষ্য নেন তদন্ত কর্মকর্তা ও আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মোঃ আবদুল বাতেন এই সময় পটিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আবুল হাসেম, জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা খোরশেদ আলম, উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ছৈয়দ আবু ছায়েদ তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য থাকে যে, গত ২৮শে মে অনুষ্ঠিতব্য চরপাথরঘাটা ইউপি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ প্রার্থী হাজী ছাবের আহমদ এর বিরুদ্ধে পাহাড়সম অভিযোগ। এমনকি নিকটতম ধানের শীষ প্রার্থীর এজেন্ট ও অন্যান্য মেম্বার প্রার্থীদের এজেন্ট ও ভোটারদের বের করে দিয়ে ১নং ও ২নং ভোট কেন্দ্র দখল করে ব্যাপক জাল ভোটসহ ভোট ডাকাতির অভিযোগ করেন। ঐ কেন্দ্রের ফল বাতিল করে কেন্দ্রটিতে পুনঃরায় নির্বাচনের দাবীতে মহামান্য হাইকোর্টে ৯৪২৭/১৬ইং রিট পিটিশন করে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। সঙ্গে একই দাবী নিয়ে চরপাথরঘাটা ইউনিয়নের বিভিন্ন কর্মসূচী দিয়েছিল স্থানীয় জনগন।

পরে এসবের প্রেক্ষিতে হাইকোর্টে আদেশে নির্বাচন কমিশন (ইসি) চট্টগ্রামের আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা আবদুল বাতেন কে প্রধান করে ১টি তদন্ত কমিটি গঠন করেন।

অভিযোগ সম্পর্কে বিএনপি সমর্থিত ধানের শীর্ষের চেয়ারম্যান প্রার্থী এম.মঈন উদ্দীন জানান, ২৮শে মে ভোটের দিন চরপাথরঘাটা ইউনিয়নের ১নং ও ২নং ওয়ার্ডের ভোট কেন্দ্রে ভোট গ্রহণকালে নৌকা সমর্থিত দুস্কৃতিকারীরা সকালেই কেন্দ্র দখল করে, এজেন্টদের বের করে ব্যালেট ছিনিয়ে সম্পন্ন ভোট নৌকা প্রতীকে মেরে বাক্সে পেলে। কোন ভোটারকে চেয়ারম্যান ব্যালেট দেয়নি। এমনকি ভোট কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসারদের উপস্থিতিতে নৌকা প্রতীকে সীল মেরে অবাধে জাল ভোট প্রদান করেন। সুষ্ঠ নির্বাচন হলে জিততে পারবে না বলে ভোট কেন্দ্র দখল করে নজির বিহীন ঘটনার ঘটান বলে মন্তব্য করেন।

তিনি আশা প্রকাশ করেন ২টি কেন্দ্রের কারচুপি ভোট বাতিল হলে তিনি ১৬৭৩ ভোটে এগিয়ে থাকে এবং জনগণ যদি নির্বিঘ্নে ভোট প্রদান করতে পারে। জয় তার ১০০% বলে নিশ্চিত করেন।

অন্যদিকে জাতীয় পার্টির সমর্থিত লাঙ্গল প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী নুরুচ্ছফা ফেরদৌস জানান, নৌকার সমর্থন পুষ্ট বহিরাগত দুষ্কৃতিকারীদের হামলার ফলে ভোট কেন্দ্র ২টিতে ভোটারেরা সুষ্ঠভাবে ভোট দিতে পারেনি। তাই কেন্দ্র ২টির ফল বাতিল করে সেখানে পুনঃ নির্বাচনের দাবী জানিয়ে তিনি বলেন, প্রহসনমূলক ও জালভোটের ফল বাতিল করে অচিরেই চরপাথরঘাটা ইউনিয়নে ২টি কেন্দ্রে পুনঃ ভোট গ্রহণ করা জরুরী অন্যথায় জনগণ কর্তৃক কঠোর আন্দোলনের কর্মসূচী দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রার্থী ও সাবেক চেয়ারম্যান হাজী ছাবের আহমদ জানান, ১নং ও ২নং ওয়ার্ডের ভোট কেন্দ্রে ভোট সুষ্ঠ, অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়েছে যা দায়িত্বরত প্রশাসনের সবাই বলছে। তবে যিনি পরাজিত হন তিনি সবসময় প্রশ্ন তুলে অনিয়মের এমন মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে একই ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের স্থানীয় বাসিন্দা ও কর্ণফুলী ওয়ালটন শো রুমের সত্বাধিকারী মোঃ শাহজান জানান, সকালে ভোট কেন্দ্রে ভোটার অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে দেখি চেয়ারম্যানের কোন ব্যালট পেপার নাই এবং ২টি ব্যালট পেপার দিচ্ছে পুরুষ ও মহিলা মেম্বারদের। তিনিও এমন প্রহসনমূলক ২টি কেন্দ্রের ফলাফর বাতিল করে জনগণের নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দেবার দাবী জানান।

অত্র ইউনিয়নের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য পদপ্রার্থী বানাজা বেগম নিশি জানান, ১নং ও ২নং ওয়ার্ডের চেয়ারম্যানের ভোট কোন ভাবেই সুষ্ঠ, অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়নি কারণ চেয়ারম্যান প্রার্থীর কোন ব্যালট পেপার জনগণ পায়নি। গত ২১শে নভেম্বর ইসির তদন্ত টিমকে অবহিত করেছি।

তদন্তকালে তদন্তকারী কর্মকর্তা আবদুল বাতেন বলেন, গত ২৮শে মে ৫ম ধাপে সারাদেশে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব ইউপির মধ্যে চরপাথরঘাটা ইউপিতে চেয়ারম্যান প্রার্থী এম.মঈন উদ্দীন নির্বাচন কমিশনে ইউনিয়নের ২টি কেন্দ্রের অনিয়মের অভিযোগ এনে হাইকোর্টে রিট করে। পরে কমিশন তা গ্রহণ করে তদন্তে নামে। আমরা অভিযোগের সত্যতা তদন্ত করে দেখতেছি এবং এজন্য সবার সঙ্গে কথা বলেছি।

অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত প্রতিদ্বন্ধী প্রার্থী, তাদের সমর্থক, সাধারণ লোকজন, ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা কর্মচারী প্রিজাইডিং অফিসার, স্ট্রাকিং ফোর্স, পোলিং এজেন্ট, নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রিট সহ যারা ঐ কেন্দ্র ২টির দায়িত্বে ছিলেন সবার মৌখিত ও লিখিত স্বাক্ষী নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ প্রশাসনিক ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা সঙ্গে কথা বলেছি। সবার সঙ্গে কথা বলে সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে।

বিষয়টি যেহেতু আদালতের রিটের কারণে হচ্ছে। তাই এই মুহুর্তে বিস্তারিত কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে যথাযথ নির্পেক্ষভাবে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী তদন্ত রিপোর্ট জমা দেওয়া হবে বলে জানান। এমনকি বাকীটা নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ার বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তদন্তকারী কর্মকর্তা জানান, সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রে ভোট প্রদানে কোন বিঘœ সৃষ্টি হয়েছিল কিনা, ভোট দিতে গিয়ে সাধারণ ভোটারেরা কোন ভাবে বাধাগ্রস্থ হয়েছিলেন কিনা এবং কোন প্রার্থীর পোলিং এজেন্টকে ভোট কেন্দ্রে থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল কিনা সেগুলো সুষ্ঠ তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

সিটিজিসান.কম/রবি

Print This Post