মাসিক ‘টাকার কন্ট্রাক্টে’ ইপিজেডে ওয়াসার পানি নিয়ে বাণিজ্য— নেপথ্যে ক্যাশিয়ার সুলতান

নিজস্ব প্রতিবেদক | আপডেট : ৯ এপ্রিল, ২০২১ শুক্রবার ০২:৫০ পিএম

চট্টগ্রামের ইপিজেড এলাকায় ওয়াসার আবাসিক পানির সংযোগ নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে পানি বিক্রির অবৈধ ব্যবসা করছেন ওই এলাকার কিছু ওয়াসার গ্রাহক। মাসিক মাসোহারার ভিত্তিতে এ ব্যবসার ‘অলিখিত লাইসেন্স’ দিচ্ছে ইপিজেড থানার কথিত ক্যাশিয়ার সুলতান। শুধু তাই নয়, এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে খোদ ওয়াসার এক কর্মচারী। ক্যাশিয়ার সুলতান ও ওয়াসার কর্মচারির সহযোগিতায় সেখান থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতিমাসে কয়েক লাখ টাকা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, স্থানীয় থানাকে ‘ম্যানেজ’ করে দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকার মাসিক মাসোহারার ভিত্তিতে এ ব্যবসার ‘পারমিশন’ সিস্টেম করে দেয় ইপিজেড থানার কথিত ক্যাশিয়ার সুলতান প্রকাশ আনসার সুলতান। আর ওয়াসার মিটার রিডার নিজের ‘চোখ বন্ধ’ রাখার জন্য মাসে তোলে পাঁচশ’ টাকা করে।

বাসাবাড়ির ওয়াসার লাইন থেকে রাস্তার পাশে অবৈধ সংযোগ টেনে বা মিনারেল ওয়াটারের জন্য অনুমোদন নিয়ে সহজেই চালানো হচ্ছে এ ব্যবসা। আর এ ব্যবসা পরিচালনার জন্যে ‘থানা কন্ট্রাক্ট’ ও ওয়াসার অসাধু কর্মচারিদের ম্যানেজ করতে পারলেই মেলে এ অবৈধ ব্যবসার অনুমোদন!

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইপিজেড এলাকার নিউমুরিং তক্তারপোল, তিন রাস্তার মোড়, মাইলের মাথা, ব্যারিস্টার কলেজ, আবদুল মাবুদ সওদাগরের বাড়ির পাশে, বন্দরটিলা জালাল প্লাজা, চক্ষু হাসপাতালের পাশে, সিটি ব্যাংকের পাশে, নেভী হাসপাতাল গেইট, আকমল আলি রোড, রেইনবো কমিউনিটি সেন্টার, নারিকেল তলা, এস আলম ও বি আলম গলিসহ আরও ১০-১২ স্পটে চলে এ অবৈধ পানি বিক্রির ব্যবসা।

স্থানীয়রা জানান, অসাধু কিছু গ্রাহক ওয়াসার আবাসিক সংযোগ নিয়ে ড্রাম প্রতি ১৫-২০ টাকা করে বিক্রি করে দেয় ভ্যানগাড়ির পানি ব্যবসায়ীদের কাছে। আর সেই পানিই বিভিন্ন এলাকার বাসা-বাড়িতে বিক্রি হয় ২৫-৩০ টাকা ড্রাম দরে।

পানি বিক্রির সাথে জড়িত এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমরা জানি এটা অন্যায়। কিন্তু করা যাচ্ছে বিধায় করছি। আমরা তো থানাকে টাকা দিয়েই পানি বিক্রি করি। বলতে হলে থানাকে বলেন। আমাদের বলে লাভ আছে কোন?’

তিনি বলেন, ‘নাম বলব না, তবে থানার এক লোককে আমরা প্রতিমাসে টাকা দিয়েই ব্যবসা করি। থানায় টাকা দিই কারণ নাহলে আমাদের পুলিশ দিয়ে হয়রানি করে ক্যাশিয়ার। যাঁরা থানাকে টাকা দিবে তাঁরাই এ ব্যবসা করতে পারবে, নাইলে পারবেনা। তবে আপনার কাছে অনুরোধ এ ব্যাপারে নিউজ করবেন না, প্লিজ!’

ইপিজেড এলাকায় এ অবৈধ ব্যবসা যেন এখন ‘ওপেন সিক্রেট ’। প্রশাসন সবকিছু জেনেও কোনো প্রকার ব্যবস্থা নিচ্ছে না। সুলতান নিজেকে ‘ওসির লোক’ হিসেবে পরিচয় দেয়। তার বিরুদ্ধে কিছু বলতে গেলে পেতে হয় নানা হুমকি। একদিকে ওয়াসার পানির জন্য হাহাকার এলাকাজুড়ে, অন্যদিকে এরা সবাই মিলে এ পানি অবৈধভাবে বিক্রির ব্যবসা করছে দীর্ঘদিন ধরে।— এমন অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।

এবিষয়ে অভিযুক্ত আনসার সুলতান বলেন, ‘প্রমাণ তো সবাই দিতে পারে, কিন্তু টাকা কি পড়ে আছে যে টাকা মানুষ আমাকে এমনে দিয়ে দেয়? ওয়াসার পানি বিক্রি করে সেটা ওয়াসার ব্যাপার। এখানে আমাকে কেন টাকা দিবে?’

অভিযোগ উঠেছে থানাকে ম্যানেজ করার কথা বলে আপনি মাসিক ভিত্তিতে দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা নেন। এটা কি তাহলে মিথ্যা— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আর নিলেও আপনি আমাকে ফোন দিবেন কেন? আপনি থানায় গিয়ে যোগাযোগ করে দেখেন আমি কে। আপনি সাংবাদিক, আপনি আমাকে ফোন দিবেন কেন? আমাকে ফোন দেয়ার অধিকার আপনার নেই। আমাকে পুলিশ ধরবে, আপনি ফোন দিলেন কেন আমার নম্বরে?’

একপর্যায়ে তিনি এ প্রতিবেদকের সাথে অশোভনীয় আচরণ করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

এদিকে থানার নাম করে সুলতান প্রতিমাসে টাকা উত্তোলন করলেও তিনি এব্যাপারে কিছুই জানেন না।— এমনটাই দাবি ইপিজেড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) উৎপল বড়ুয়ার।

ওসি বলেন, ‘ওয়াসার বিষয়ে অন্য কারও টাকা তোলার প্রশ্নই আসেনা। ওয়াসা কর্তৃপক্ষ অভিযোগ দিলে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নিব। এখানে আসলে আমাদের করণীয় কিছু নাই। থানা-পুলিশের নাম বিক্রিরও সুযোগ নেই।’

প্রতিবেদকের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আসলে এখানে এরকম এই নামে কেউ আমাদের নেই। আরও অনেকজন ইয়ে করছে, ওখানে আরও একজন কি যেন নাম আরো অনেকে আছে…।’

পুলিশের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি করার বিষয়ে আপনাদের করণীয় নেই?— এমন প্রশ্নের জবাবে ওসি বলেন, ‘অবশ্যই ব্যবস্থা নিব, নেব না কেন? এখানে থানাকে ম্যানেজ করার কিছু নাই।’

ওয়াসার লস, ‘সিন্ডিকেটের’ পকেট ভারি

বন্দরটিলা এলাকার পানি বিক্রির সাথে জড়িত বাবুল বলেন, ‘প্রতি ছোট ড্রাম পানি ১৫ টাকা করে নেয়া হয়। একটি ভ্যানে ১৫টি ড্রাম রাখা যায়। অনেক ভ্যানে ধরে ২০টি। দৈনিক ৮০ থেকে ১০০টি ভ্যানে বিক্রি হয় পানি। কখনো কখনো দেড় শ’ বা দুই শ’ ভ্যানও বিক্রি হয়।’

ড্রামপ্রতি ১৫ টাকা হিসেবে একজন বিক্রেতা প্রতিদিন বিক্রি করে অন্তত ২২ হাজার ৫০০ টাকার পানি। এ হিসাবে প্রতিদিন এ এলাকায় বিক্রি হয় অন্তত ২২ লাখ ৫০ হাজার টাকার পানি। মাসে টাকার অঙ্ক হিসেব করলে দাঁড়ায় ৬ কোটি ৭৫ লাখে।

আবার, প্রতি জারে ২০ লিটার হিসেবে একজন বিক্রেতাই প্রতিদিন বিক্রি করে অন্তত ৩০ হাজার লিটার পানি। এক স্পটে একশ’ ভ্যানগাড়ির কাছে পানি বিক্রি করলে পনেরোটি স্পটের হিসেবে দৈনিক বিক্রি হয় চার লাখ ৪৫ হাজার লিটার পানি। মাসে যার পরিমাণ দাঁড়ায় এক কোটি ৩৫ লক্ষ লিটারে।

ওয়াসা সূত্র বলছে, ওয়াসার আবাসিক লাইনের প্রতি হাজার লিটার (এক ইউনিট) পানির বিল প্রায় বারো টাকা ৪০ পয়সা এবং বাণিজ্যিক লাইনের ইউনিট প্রতি পানির বিল ত্রিশ টাকা ৪০ পয়সা। আবাসিক সংযোগ নিয়ে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালানো সম্পূর্ণ অবৈধ। এর ফলে সরকার বছরে হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব।

এ ব্যপারে ওয়াসার নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুর রউফ বলেন, ‘ওয়াসা সংযোগ আবাসিক কিংবা অনাবাসিকভাবে নিয়েও পানি বিক্রি সম্পূর্ণ অবৈধ এবং গুরুতর অপরাধ। পতেঙ্গার ওদিকে পানি সংকট থাকায় অনেকেই এই অবৈধভাবে পানি বিক্রির ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন, যা আমরাও জানি। তবে প্রায়ই ওদিকে অভিযান চালানো হয়।’

তিনি বলেন, ‘পানি বিক্রির জন্য কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আলাদা পারমিশন নিতে হবে। আর এ ধরণের অভিযান আমাদের ম্যাজিস্ট্রেট মহোদয়ের মাধ্যমেই করতে হয়। আমি নিজে নিতে পারিনা, কারণ এ ধরনের অভিযান পরিচালনার সময় লোক থাকতে হয়। দেখা গেলো, আমি নিতে গেলাম স্টেপ, আমার দুটো অফিসারও নিয়ে গেলাম। কিন্তু যাঁরা এই কাজগুলো করে তাঁদের সাথে ফাইট করার মত যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেট মহোদয় অভিযানে গেলে দেখা যায় এগুলোর অস্তিত্ব থাকেনা।’

পানি বিক্রির বিষয়টি স্বীকার করে নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, ‘আমি নিজেও কয়েকবার গিয়েছি ওখানে ড্রামে করে ওয়াসার পানি বিক্রি হয় শুনে। আসলে এটির মূল উৎপাটন করতে হলে স্থানীয় কাউন্সিলরকেও এগিয়ে আসতে হবে। স্থানীয় সচেতনতা বৃদ্ধি এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলে কাজটা আরও সহজ হয়।’

‘তবে আমাদের প্লান আছে ওদিকে পানির সরবারাহ বাড়াবো, বেশিদিন লাগবে না। আমি আমার দিক থেকে এসব অবৈধ ব্যবসা বন্ধে যতটুকু করতে পারি, চেষ্টা করব। আমি চেষ্টা করব ম্যাজিস্ট্রেট মহোদয়কে নিয়ে অভিযান চালানোর।’— যোগ করেন আবদুর রউফ।

রবিউল হোসেন রবি/এমএ/সিএস

Print This Post