চট্টগ্রাম : জলাবদ্ধতা রীতিমতো অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। টানা বৃষ্টিতে হলেই তলিয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রাম নগরীর নিম্নাঞ্চল। এ সময় প্রায় চার কোটি ঘনফুট পানিতে ডুবে যায় নগরবাসী।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন গবেষণা চালিয়ে বের করেছে এ তথ্য। গবেষণায় বলা হয়, চার কোটি ঘনফুট পানি অপসারণের ব্যবস্থা করতে পারলে এই মহানগরীর জলাবদ্ধতার মীমাংসা মিলবে। মাত্র দেড় ঘণ্টার বৃষ্টিতেই নগরীতে এই পরিমাণ পানি চারপাশ ভাসিয়ে নেয়। নদী-নালা ও খালবিল উচু হয়ে যাওয়ায় এ পানি অপসারণ করতে পারছে না।
গবেষণা প্রতিবেদনের বিবরণে বলা হয়েছে, দেড় ঘণ্টা টানা বৃষ্টি হলেই নগরীতে ৩৮.১ মিলিমিটার পানি হয়। এই বৃষ্টিতে পানির পরিমাণ দাঁড়ায় ১৪ কোটি ৫৮ লাখ ঘনফুট। নগরীতে বর্তমানে ৩৭ টি ছোট বড় খালের অস্তিত্ব আছে। ১৬১ কিলোমিটার লম্বা এই খালগুলোর পানি ধারণক্ষমতা ১০ কোটি ঘনফুট। বাড়তি ৪ কোট ৫৮ লাখ ঘনফুট পানি নিয়েই নগরবাসীর ভোগান্তি। এই পানিটুকু ম্যানেজ করা গেলেই নগরবাসীর ভোগান্তি বহুলাংশে কমিয়ে আনা যাবে। বিশেষত কর্ণফুলী নদীতে মানসম্মত ড্রেজিং করা সম্ভব হলে পানি ধারণ ক্ষমতা ১৫ কোটি ঘনফুট বাড়বে।
তবে আশার কথা হচ্ছে, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আগামী দিন কয়েকের মধ্যে কর্ণফুলী নদীতে বড় ধরনের ড্রেজিং শুরু করতে যাচ্ছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ কর্ণফুলী তলদেশ থেকে প্রায় ১৫ কোটি ঘনফুট বালি উত্তোলন করবে। যা নদীতে পানি ধারণক্ষমতা বাড়াবে। এই অবস্থায় নগরীর ১৬০৫ কিলোমিটার লম্বা নালা এবং খালগুলো পরিষ্কার করা হলে নগরীর জল-আতঙ্কমুক্ত নগরে পরিণত হতে পারে ধারণা করা হচ্ছে।
নগরীর জলাবদ্ধতা নিয়ে বিভিন্নমুখী পদক্ষেপের অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন উদ্যোগে খাল এবং নালার বর্তমান অবস্থা নিয়ে একটি সমীক্ষা চালানো হয়। এতে নগরীর বিদ্যমান খাল এবং নালাগুলোর শোচনীয় অবস্থা উঠে আসে। খাল এবং নালা দখলের মহোৎসব চলেছে নগরজুড়ে। আরএস জরিপের ধারে কাছে তো দূরের কথা, বিএস জরিপে রয়েছে এমন খালের বহু অংশ দখল করে ফেলা হয়েছে।
নগরীর ষোলশহর দুই নম্বর গেটের জলাবদ্ধতা নিয়ে সংশ্লিষ্ট একজন বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী বলেছেন, নগরীর সিডিএ এভিনিউর নাসিরাবাদ স্কুলের পাশ দিয়ে যাওয়া বড় নালাটি চশমা খালে গিয়ে পড়েছে। ওখানেই খাল দখল করে একটি ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলা হয়েছে। ৪০ ফুট প্রশস্ত খালের কোথাও আছে ১০ ফুট। এতে উপরের দিক থেকে আসা পানির গতি রুদ্ধ হয়। পানি ফুলে উঠে। সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা।
সূত্র মতে, নগরীতে সর্বমোট ৩৭টি খাল বিদ্যমান আছে। ১৬১ কিলোমিটার লম্বা এই খালগুলোর একটিরও আস্ত নেই বলেও এই প্রকৌশলী মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, খালগুলোতে ১০ কোটি ঘনফুট বৃষ্টির পানি ধারণের জায়গা আছে। এর থেকে বেশি বৃষ্টি হলেই আমাদের অবস্থা নাজুক হয়ে উঠে। অপরদিকে নগরীতে ১৬০৫ কিলোমিটার নালা থাকলেও অবস্থা নাজুক।
নগরীতে খাল এবং নালায় বাড়িঘরের প্ল্যান দেয়া বন্ধ করার উপর গুরুত্বারোপ করে এই বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী বলেন, আগে ঘরের পেছনে এবং পাশে নালা রাখা হতো। এখন বাড়িঘর করেই সামনের দিকে নালার উপর স্ল্যাব নির্মাণ করে দেয়া হয়। এতে নালা ভরাট হতে খুব বেশি সময় লাগে না। নগরীর খাল এবং নালাগুলো পরিষ্কার রাখা গেলে দেড় ঘন্টার ভারী বর্ষণের ১৪ কোটি ৫৮ লাখ ঘনফুট পানি ধারণ এবং দুই ঘন্টার মধ্যে সব পানি নদীতে পাঠিয়ে দেয়া কঠিন হতো না। তবে এজন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে একটি ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চালাতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী লে. কর্ণেল মোহাম্মদ মহিউদ্দীন আহমেদও দেড় ঘণ্টার বৃষ্টিতে চার কোটি ৫৮ লাখ ঘনফুট পানি নাগরিক বিড়ম্বনার কারণ বলে স্বীকার করেন। বৃষ্টির পানি দুই ঘণ্টা সময় পেলে নেমে যায় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কর্ণফুলী নদীর পানি ধারণক্ষমতা ১৪ কোটি ৮৩ লাখ ঘনফুট (৪২ লাখ ঘনমিটার) বাড়ানোর লক্ষে ড্রেজিং শুরু করতে যাচ্ছ বন্দর কর্তৃপক্ষ। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে ‘সদরঘাট টু বাকলিয়ার চর ড্রেজিং’ প্রকল্পের আওতায় এই কার্ষক্রম শুরু হবে। বন্দরের জাহাজ চলাচল অবাধ রাখতে নদীর নাব্যতা রক্ষায় ২৬০ কোটি টাকার প্রকল্পটি গ্রহণ করা হলে এটি নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্ল্যানিং অ্যান্ড এডমিন) মোহাম্মদ জাফর আলম এ প্রসঙ্গে বলেন, সবকিছু গুছিয়ে নেয়া হচ্ছে। শীঘ্রই নদীতে ড্রেজিং শুরু করার চেষ্টা চলছে।
Print This Post
