কেন্দ্রীয় কারাগারে পদে পদে বাণিজ্য!

আপডেট: ১১ জানুয়ারী ২০১৭ ৯:৩৪ অপরাহ্ন

xdhaka
অনলাইন ডেস্ক :: ‘কারাগারে ঢোকানোর পরই একজন আমার স্বামীকে বললেন, ভাই আপনি জেলে থাকতে পারবেন না। অনেক নোংরা, বিছানা নাই, বাথরুমের পাশে থাকতে হবে। হাসপাতালে থাকেন, মাত্র ১৫ হাজার টাকা দিলেই হবে।

যখন আমার স্বামী রাজি হইল, তখনই আমারে ফোন দিল এক দালাল। টাকা অ্যাডভান্স চাইল। আমি তার হাতেই প্রতি মাসের ২৭ তারিখে টাকা দিতাম। পরে আমার স্বামী বলল, দালাল পাঁচ হাজার টাকা খেয়ে ফেলে, এ জন্য তারে ভালো বিছানা দেয় না। এখন আমিই কাঠি (তার) দিয়া টাকা দিই।

এইখানে হাজার টাকার ওষুধ পাঠাইলে কমিশন দিতে হয়। খাবার পাঠাইলেও টেকা দিতে হয়, আবার কিনতেও হয় দ্বিগুণ দামে। টাকা ছাড়া কোনো কথা নেই। কারাগারের ভেতরে-বাইরে বাণিজ্য আর বাণিজ্য।’

নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকার কেরানীগঞ্জে কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী স্বামীকে দেখতে আসা এক নারী এমন তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। শুধু ওই নারীই নন, অন্তত ২০ জন বন্দীকে দেখতে আসা স্বজনদের সঙ্গে সম্প্রতি কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তাঁদের প্রায় সবাই কমবেশি এমন অভিযোগ করেন।

কেন্দ্রীয় কারাগার এলাকায় তিন দিন ঘুরে ‘সাক্ষাৎ বাণিজ্য’ ও নানা অনিয়মের চিত্র পাওয়া গেল। কারাগারের মূল ফটক থেকে শুরু করে ভেতরে, মাঠে, ঝোপঝাড়ের আড়ালে লোকজনের সঙ্গে কারারক্ষীদের কথা বলতে দেখা গেছে।

মাঠে একটি বেঞ্চে বসে সাক্ষাৎপ্রার্থীদের নাম-ঠিকানা লিখতে হয়। মূলত সেখান থেকেই বাণিজ্য শুরু হয়। ধীর গতিতে নাম লেখানো চলে, পাশাপাশি চলতে থাকে দালালদের দেনদরবার।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিন কারারক্ষী কাছে অভিযোগ করেন, কারাগারের মূল ফটক থেকে ভেতরে সব মিলিয়ে প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকার বাণিজ্য হয়। বেশি হয় সকাল আটটার আগে এবং বিকেল পাঁচটার পরে।

তাঁদের মতে, বন্দীর সঙ্গে সাক্ষাৎ, হাসপাতালে থাকা, আসামির জামিন, বন্দী রোগী বাইরের হাসপাতালে পাঠানো, পুনরায় গ্রেপ্তার, খাবার বা টাকা পাঠানো, মালামাল তল্লাশি করাসহ সবক্ষেত্রেই বাণিজ্য হয় কারাগারে।

তাঁরা অভিযোগ করে বলেন, সাক্ষাৎকার কক্ষটি পাঁচজন কারারক্ষীর কাছে এক মাসের জন্য ৬০-৭০ হাজার টাকায় ‘বিক্রি’ করা হয়। এরপর যা বাণিজ্য হয় তা ভাগ করে নেন কারারক্ষীরা।

জানা গেছে, কারাগারে বর্তমানে প্রায় ৭ হাজার বন্দী রয়েছেন। প্রতিদিন ১ হাজারের বেশি সাক্ষাৎ প্রার্থী আসেন।

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, বর্তমানে এ কারাগারটির প্রধান সমস্যা হলো সাক্ষাৎ বাণিজ্য, অবৈধভাবে কারাগারে কয়েদিদের কাছে টাকা পাঠানো এবং কয়েদিদের মুঠোফোনের ব্যবহার। নিষেধাজ্ঞা থাকলেও কারা কর্তৃপক্ষের সহায়তায় রসিদের মাধ্যমে টাকা পাঠানো হচ্ছে। কয়েদিদের মুঠোফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ভেতরে দায়িত্বরত কারারক্ষীদের সহায়তায় মুঠোফোনে কথা বলেন বন্দীরা।

জানতে চাইলে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ জেল সুপার জাহাঙ্গীর কবির বলেন, আগে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে এসব দুর্নীতি কিছুটা ছিল, ব্যবস্থাপনায় সমস্যা ছিল। কিন্তু কেরানীগঞ্জে এ ধরনের কোনো অনিয়ম বা বাণিজ্য নেই। বিশেষ করে মাদক বা সাক্ষাৎকার নিয়ে কোনো বাণিজ্য হচ্ছে না। উচ্চপর্যায়ের নজরদারি রয়েছে। তবে দু-একটি ঘটনা থাকতে পারে, সে ক্ষেত্রে আসামিরাও এসব অবৈধ সুবিধা চায়।

কারা সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ২৯ জুলাই থেকে কেরানীগঞ্জে কেন্দ্রীয় কারাগারের যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে এখানে প্রায় সাত হাজার বন্দী রয়েছে। সপ্তাহের প্রতি কর্মদিবসে এখানে এক হাজারের বেশি সাক্ষাৎপ্রার্থী আসেন।

টাকা দিয়ে কেন এ সুযোগ নেন এমন প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে হাজতি ও কয়েদিদের স্বজনেরা বলেন, স্বজনকে একটু দেখলে ভালো লাগে। টিকিট কেটে দূর থেকে ছায়াও দেখা যায় না, কথাও বলা যায় না।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ওই প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাক্ষাৎপ্রার্থীদের কাছ থেকে ২০০ টাকা ফি নিয়ে একটি রসিদ দেওয়া হয়। অথচ সাক্ষাৎপ্রার্থীদের কাছ থেকে দর্শনার্থী ফি বাবদ ২০০ টাকা নেওয়ার সরকারি কোনো নির্দেশনা নেই। এসব অনৈতিক কাজের সঙ্গে চার কারারক্ষী জড়িত। ইতিমধ্যে তাদের বিভিন্ন কারাগারে বদলি করা হয়েছে।

সিটিজিসান.কম/রবি

Print This Post Print This Post