চট্টগ্রাম :: দেশের প্রধান দুই দলের প্রভাবশালী নেতাদের ছেলেরা বর্তমান রাজনীতিতে পরিচিত মুখ, তাও আবারও ব্যারিস্টার। রাজনীতি তাদের দিয়েছে প্রভাব-সম্মান-জনপ্রিয়তা। স্বভাবতই তারা চাইবেন ছেলেরা উত্তরসূরি হোক রাজনীতিতে। আর এ জন্য তাদের কাছে ছেলের ব্যারিস্টার হওয়াটা ছিল প্রধান অগ্রাধিকার। বাবাদের আকাক্সক্ষা ইতিমধ্যে পূরণও করেছেন বেশ কজন ছেলে। খবর ঢাকাটাইমস।
তবে ছেলেদের সবারই যে রাজনীতিতে আগ্রহ আছে তেমন নয়। বাবাদের আগ্রহে তাদের কেউ কেউ ইতিমধ্যে রাজনীতিতে নাম লিখিয়েছেন। আবার কারো কারো রাজনীতির প্রতি ঝোঁক ছিল আগে থেকেই।
‘রাজনীতির প্রতি ঝোঁক দেখে বাবা সব সময় বলতেন, যদি রাজনীতি করতে চাও পেশা হিসেবে ওকালতিটাই উত্তম। তাই নৃবিজ্ঞানে স্নাতক আমি শেষ পর্যন্ত বাবার আগ্রহে ব্যারিস্টার হতে এ বিষয়ে লেখাপড়া করি। এ পেশার প্রতি আমার খুব বেশি আগ্রহ ছিল না তা নয়, কারণ ব্যারিস্টার শব্দটি নিছকই ঔপনিবেশিক চিন্তাপ্রসূত, যদিও এটির আলাদা দাম ও দাপট রয়েছে।’
নিজের ব্যারিস্টার হওয়ার গল্পটা এভাবেই জানালেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী ও মহানগর মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হাসিনা মহিউদ্দিনের বড় ছেলে মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল।
একইভাবে বাবার আগ্রহে ব্যারিস্টার হয়েছেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি দস্তগীর চৌধুরীর ছেলে ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর। ‘ছোটবেলা থেকেই মা-বাবা চাইতেন, আমি যেন বড় হয়ে ব্যারিস্টার হই। তাই যখন বার-এট-ল পাস করি, মা-বাবার সে কী আনন্দ! আজ বাবা নেই। আমি ব্যারিস্টার হওয়ার পরপরই মারা গেছেন তিনি। তার অনুপস্থিতি আমাকে কষ্ট দেয়। তবে এ ভেবেও আনন্দ পাই যে, আমি তার স্বপ্ন সার্থক করতে পেরেছি।’
মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ও ফয়সাল দস্তগীরই নন, ব্যারিস্টার হয়ে আইন পেশাকে বেছে নিয়েছেন চট্টগ্রামের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অনেক সিনিয়র নেতার ছেলে। বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিনের ছেলে মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন ও বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি ও সাবেক রাষ্ট্রদূত গোলাম আকবর খন্দকারের ছেলে তারেক আকবর খোন্দকার তাদের অন্যতম। ব্যারিস্টার হয়ে তারা সংশ্লিষ্ট পেশায় নিয়োজিত হয়েছেন। বাবার পথ ধরে এসব ব্যারিস্টার ছেলে ধীরে ধীরে জড়িত হচ্ছেন রাজনীতিতেও।
সম্প্রতি এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর ছেলে মুহিবুল হাসান চৌধুরী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক পদে আসীন হওয়ার বিষয়টি ‘টক অব দ্য টাউনে’ পরিণত হয়। এই সূত্র ধরে চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গন ও সচেতন মহলের মাঝে রাজনীতিকদের ছেলেদের নিয়ে চলছে নানা আলোচনা।
তবে মহিউদ্দিন চৌধুরীর ছেলে মুহিবুল হাসান চৌধুরী ছাড়া আর কেউ এখন পর্যন্ত কোনো দলের পদে আসীন হননি, এমনকি রাজনৈতিক অঙ্গনে তেমন সরবও নন। তারা ব্যবসা ও আইন পেশার পাশাপাশি উন্নয়ন সংগঠনের সঙ্গে জড়িত।
ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর জানান, বার-এট-ল পাস করার পর এখন তিনি প্র্যাকটিস করছেন হাইকোর্টে, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের সঙ্গে। সিজিএস থেকে ‘ও’ লেভেল পাস করার পর যুক্তরাজ্যের চ্যাল্টেনহেম কলেজ থেকে ‘এ’ লেভেল পাস করেন তিনি। এরপর যুক্তরাজ্যের মিডলসেকস ইউনিভার্সিটি থেকে এলএলবি (অনার্স) পাস করেন তিনি। নর্থ আমব্রেয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ও বার-এট-ল একসঙ্গে করেন তিনি। ২০০৭ সালে বার-এট-ল পাস করার পর ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে প্র্যাকটিস করছেন ফয়সাল দস্তগীর। এখন বাবার পথ ধরে চট্টগ্রামে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি।
আরেক রাজনীতিবিদ মীর নাছিরের ছেলে ব্যারিস্টার মীর হেলাল উদ্দিন। ২০০৪ সালে বার-এট-ল পাস করেন দি অনারেবল সোসাইটি অব লিংকনস ইন থেকে। এর আগে তিনি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অধীনে ‘ও’ লেভেল ও ‘এ’ লেভেল শেষ করে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব উলভারহ্যাপ্টন থেকে এলএলবি (অনার্স) এবং এরপর লন্ডনের ইউনিভার্সিট অব ল অব ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস থেকে বার ভোকেশনাল কোর্স স¤পন্ন করেন তিনি।
এরপর সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী খন্দকার মাহাবুবউদ্দিন আহমদের জুনিয়র হিসেবে উচ্চ আদালতে প্র্যাকটিস শুরু করেন। বর্তমানে তিনি তার মা-বাবার ‘দ্য লইয়ার্স কাউন্সিল’ পরিচালনা করছেন। সাম্প্রতিক সময়ে আইন পেশার পাশাপাশি বিএনপির বিভিন্ন কর্মকা-েও তাকে দেখা যাচ্ছে।
রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টার কথা স্বীকার করে ব্যারিস্টার মীর হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘বাবার হাত ধরে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছি।’
মহিউদ্দিন চৌধুরীর ছেলে ব্যারিস্টার মুহিবুল হাসান চৌধুরী চট্টগ্রামের সানসাইন গ্রামার স্কুল থেকে ‘ও’ লেভেল এবং লন্ডনের ডেভিড গেইম কলেজ থেকে ‘এ’ লেভেল পাস করেন। ২০০৬ সালে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্স থেকে করেন নৃবিজ্ঞান ও আইন শাস্ত্রে স্নাতক (অনার্স)। ২০০৭ সালে লন্ডনের কলেজ অব ল থেকে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা-বার ভোকেশনাল কোর্স শেষে ২০০৮ সালে লিংকনস থেকে বার-এট-ল পাস করেন এবং ২০১০ সালে বার কাউন্সিলের সদস্য হন তিনি।
বর্তমানে বিজয় টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন মুহিবুল হাসান। ব্যারিস্টার হওয়ার প্রেরণা সম্পর্কে মুহিবুল হাসান চৌধুরীর এককথায় উত্তর, ‘আমার বাবা মহিউদ্দিন চৌধুরী।
ছাত্রজীবনে প্রখর মেধাবী ছিলেন বিএনপির নেতা গোলাম আকবর খোন্দকারের ছেলে তারেক আকবর খোন্দকার। বাবার আগ্রহে বার-এট-ল পাস করে তিনিও এখন ব্যারিস্টার। ২০১২ সালে লন্ডন কলেজ অব ল’ থেকে বার-এট-ল পাস করেন তিনি। এর আগে ২০১১ সালে লন্ডনের কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স ইন ল (করপোরেট অ্যান্ড কমার্শিয়াল) এবং ২০১০ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি (অনার্স) করেন তিনি। ২০০৭ সালে ঢাকা স্কলাস্টিকা ও ব্রিটিশ স্কুল অব মাসকটে লেখাপড়া করে ‘এ’ লেভেল এবং ২০০৫ সালে লিটল জুয়েলস স্কুল থেকে ‘ও’ লেভেল পাস করেন তারেক আকবর। ‘কনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ’ বিষয়ে পিএইচডি করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
তারেক লেখাপড়া শেষ করে দেশের যুবসমাজের উন্নয়নে কাজ করছেন। ‘ইয়ুথ ভয়েস অব বাংলাদেশ’ নামে একটি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান তিনি।
ব্যারিস্টারি ছাড়াও চট্টগ্রামের বিএনপি নেতাদের অনেকের ছেলে ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। এর মধ্যে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান এম মোরশেদ খানের ছেলে ফয়সাল মোরশেদ একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। দেশ-বিদেশে বিশাল ব্যবসা রয়েছে তার। চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সভাপতি আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ছেলে ইসরাফিল খসরুও ব্যবসায়ী। পারিবারিক ব্যবসায় সঙ্গে জড়িত তিনি।
সিটিজিসান.কম/রবি
Print This Post

