সারাদেশে ভূঁইফোড় লীগ ও পরিষদের দাপট!

আপডেট: ১ ডিসেম্বর ২০১৬ ১:১১ অপরাহ্ন

ja

অনলাইন ডেস্ক :: ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা ক্ষমতাশীন আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের নামে বেশ কিছু সংগঠনের কারণে মান যাচ্ছে দলটির। এসব সংগঠনের হাইব্রিড নেতারা দলের দুর্দিনে মাঠে না থাকলেও সুদিনে তাদের দাপট অনেক বেশি। এমন সংগঠনের সংখ্যা অর্ধশতাধিক।

গঠনতন্ত্রে এদের অস্তিত্ব নেই, তবু নামের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু, লীগ বা পরিষদ যুক্ত এসব সংগঠনগুলোর নেতার্মীরা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ছত্রচ্ছায়ায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। তারা নিজেদের ছবি সংবলিত ছোট-বড় ব্যানার, পোস্টার ও বিলবোর্ড সাধারণ জনগণের সামনে নিজেদের তুলে ধরছেন। খবর বায়ান্নবিডির।

ভূঁইফোর এসব সংগঠনের সাইনবোর্ড ব্যবহার করে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে দালান-কোঠায় অফিস পরিচালনার নামে গেড়ে বসেছেন তারা। এ ছাড়া শুভেচ্ছা জানানোর নামে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের ছবি সংবলিত বিভিন্ন রঙের ব্যানার, ফেস্টুন লাগিয়ে রেখেছেন তারা।

বৃহস্পতিবার সকালে গুলিস্তান এলাকায় গড়ে ওঠা এমন কয়েকটি সংগঠনের কার্যালয়ে গিয়ে কথা হয় নেতাদের সঙ্গে। এ সময় তারা একে অপরের প্রতি নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

সংগঠনগুলো হলো- বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগ, বঙ্গবন্ধু লেখক লীগ, বঙ্গবন্ধু প্রজন্ম লীগ, বঙ্গবন্ধু যুব পরিষদ, বঙ্গবন্ধু ছাত্র পরিষদ, বঙ্গবন্ধু স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ, বঙ্গবন্ধু বাস্তুহারা লীগ, বঙ্গবন্ধু আওয়ামী হকার্স ফেডারেশন, বঙ্গবন্ধুর চিন্তাধারা বাস্তবায়ন পরিষদ, বঙ্গবন্ধু গ্রাম ডাক্তার পরিষদ, বঙ্গবন্ধু আদর্শ পরিষদ, জননেত্রী শেখ হাসিনা কেন্দ্রীয় লীগ, জননেত্রী শেখ হাসিনা কেন্দ্রীয় সংসদ, আওয়ামী প্রচার লীগ, আওয়ামী সমবায় লীগ, আওয়ামী শিশু লীগ, আওয়ামী প্রচার লীগ, আওয়ামী তৃণমূল লীগ, আওয়ামী ছিন্নমূল হকার্স লীগ, আওয়ামী শিশু যুবক সাংস্কৃতিক জোট, তৃণমূল লীগ, একুশে আগস্ট ঘাতক নির্মূল কমিটি, আমরা মুজিব হবো, চেতনায় মুজিব, মুক্তিযোদ্ধা তরুণ লীগ, নৌকা সমর্থক গোষ্ঠী, দেশীয় চিকিৎসক লীগ, ছিন্নমূল মৎস্যজীবী লীগ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী লীগ, নৌকার নতুন প্রজন্ম, ডিজিটাল ছাত্রলীগ, ডিজিটাল আওয়ামী প্রজন্ম লীগ, ডিজিটাল আওয়ামী ওলামা লীগ, আওয়ামী মোটরচালক লীগ, আওয়ামী তরুণ লীগ, আওয়ামী রিকশা মালিক-শ্রমিক ঐক্য লীগ, আওয়ামী যুব হকার্স লীগ, আওয়ামী পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা লীগ, আওয়ামী নৌকার মাঝি শ্রমিক লীগ, আওয়ামী ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী লীগ, আওয়ামী যুব সাংস্কৃতিক জোট, বাংলাদশে আওয়ামী পর্যটন লীগ, জননেত্রী পরিষদ, দেশরত্ন পরিষদ, বঙ্গমাতা পরিষদ, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব পরিষদ, আমরা নৌকার প্রজন্মসহ আরো.. আরো..নানা লীগ ও পরিষদ।

গত ১৫ নভেম্বর বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবের অডিটোরিয়াম হল রুমে বঙ্গবন্ধু পরিষদ আয়োজিত জেলহত্যা দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভায় সংগঠনগুলোর সমালোচনা করেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম।

তিনি বলেন, এখন অনেক পরিষদ, লীগের সংগঠন আওয়ামী লীগভক্ত। নাম সর্বস্ব লীগ নামে অনেক সংগঠন হয়ে গেছে। স্বাধীনতার পরে দলের দুর্দিনে এদের কেউ তখন ছিল না, তখন আমরাই ছিলাম। এসব সুবিধাবাজদের দিকে নজর রাখতে দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান মোহাম্মাদ নাসিম।

আওয়ামী হকার্স লীগের একাংশের কেন্দ্রীয় যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক কামাল হোসেন বলেন, আওয়ামী লীগের দুর্দিনে এসব সংগঠনের কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এখন সুদিনে এসে অনেক হাইব্রিড সংগঠন জন্ম নিয়েছে বসন্তের কোকিলদের নেতৃত্বে।

তিনি বলেন, আমরা হকার্স লীগকে শক্তিশালী করে দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছি। সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ মোকাবেলা করার জন্য রাজপথে থেকে হকারদের নিয়ে আন্দোলন করাই আসল উদ্দেশ্য।

এসব সংগঠনের অনুমোদন আছে কিনা এ বিষয়ে জানতে চাইলে কামাল বলেন, একদিকে দল থেকে অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে না আবার কোনো কিছু বলছেও না। তবে ধরে নিতে পারি কোনো একদিন সংগঠনগুলো আওয়ামী লীগের সহযোগী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।

আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রে স্বীকৃত সাতটি সহযোগী সংগঠনগুলো হচ্ছে, যুবলীগ, কৃষক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ, যুব মহিলা লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ ও তাঁতী লীগ। ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠন হলো ছাত্রলীগ ও শ্রমিকলীগ।

আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলো দলের জন্য যেভাবে কাজ করে যাচ্ছে, আওয়ামী হকারলীগ একইভাবে কাজ করছে বলে জানান ওই অংশের সভাপতি এস এম জাকারিয়া হানিফ।

তিনি বলেন, আমাদের অনুমোদন দেয়নি এটা ঠিক, কিন্তু দলের স্বার্থে সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের মতোই মাঠে থেকে নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের নানা কর্মসূচিতে দলের শীর্ষ নেতা, এমনকি মন্ত্রীরাও অংশ নেন।

দলের দুর্দিনে এবং ১/১১-এর সময় মাঠে থেকে লড়াই সংগ্রামের কথা বলে হানিফ বলেন, সময়ের সাধুরা সে সময় কোথায় ছিলেন। এসব হাইব্রিড ও মৌসুমী নেতাদের কারণে দল অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ট্রেড ইউনিয়নযুক্ত হকার্স লীগের কর্মকাণ্ডে আওয়ামী লীগের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে কিনা এমন এক প্রশ্নে জাকারিয়া হানিফ বলেন, এদের কাজ সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করা। যখনই যে সরকার আসে তখনই তারা তাদের হয়ে যায়। এদের কারণে সরকার এবং দলের মান ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলেও এ নেতা জানান।

তবে, তার কথা উড়িয়ে দিয়ে ট্রেড ইউনিয়ন যুক্ত হকার্স লীগের সভাপতি এম, এ কাশেম বলেন, তাদের মতো সুবিধাবাদী আমরা না। আমরা সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। তাদের তো কোনো অনুমোদন নেই, তারাই অবৈধভাবে সংগঠন চালাচ্ছে। বরং, এসব ভূঁইফোর সংগঠনের কারণেই আওয়ামী লীগ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং মান হারাচ্ছে।

দলের জন্য কী করছেন এমন এক প্রশ্নে এম এ কাশেম বলেন, আমরা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সভা-সেমিনারে লোকবল পাঠিয়ে সহযোগীতা করে থাকি। কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশে যেকোনো সময় যেকোন স্থানে শক্তি যোগান দিয়ে থাকি। তবে এ সংগঠনগুলো অবৈধ ও দলের কোনো সম্পর্ক নেই বলেও জানিয়েছেন এ নেতা।

হঠাৎ গজিয়ে ওঠা এসব সংগঠনের ব্যানার-পোস্টারে নানান নীতিবাক্য ছাপানো থাকলেও উদ্যোক্তাদের সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিভিন্ন অনুষ্ঠানের নামে চাঁদাবাজি, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের কাউকে কাউকে কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করিয়ে সেই ছবি দেখিয়ে নানান তদবির, টেন্ডারবাজি ও দখল প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত থাকার অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে।

জানতে চাইলে আওয়ামী তৃণমুল লীগের সভাপতি টিপু চৌধুরী বলেন, আমরা ভোগে নয়, ত্যাগে বিশ্বাসী। আওয়ামী লীগ দির্ঘদিন যেন ক্ষমতায় থাকে সে লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি।

তিনি বলেন, তৃণমূল মানুষদের কাছে সরকার বা দলের উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে তুলে ধরা। দেশের মানুষদেরকে দল বা সরকার সম্পর্কে পজেটিভ বোঝানো। অন্যদের মতো টেন্ডারবাজি বা দালালি করার জন্য নয়।

এ বিষয়ে, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলেন, এসব ভুঁইফোড় সংগঠনের সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনো সম্পর্ক নেই। এরা আওয়ামী লীগের কেউ নয়।

দলের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এ প্রসঙ্গে বলেন, দলের নেতাকর্মীদের আমি বার-বার তাগাদা দিয়ে যাচ্ছি ভুঁইফোড় এসব সংগঠন ও বসন্তের কোকিলদের ব্যাপারে সজাগ থাকতে। যাতে তারা দলের মান ও ভাবমুর্তি ক্ষুন্ন করতে না পারে। এরপরও সময়মতো এদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সিটিজিসান.কম/শিশির

Print This Post Print This Post