এম বেলাল উদ্দিন, রাউজান :: এখন অগ্রহায়ন মাস। চট্টগ্রামের রাউজানের উপজেলার প্রান্তজুড়ে ফসলের মাঠে দোলা দিচ্ছে সোনালী ধান। পাকা ধানের মৌ মৌ গন্ধে ফুটেছে কৃষাণের মুখে হাসি। এই সোনালি ফসল ঘরে তুলতে কৃষাণের চলছে নানা প্রস্তুতি। তাই প্রয়োজনীয় উপকরণ কেনাকেটায় কৃষকরা ভিড় জমাচ্ছে স্থানীয় হাট-বাজারে।
এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য উপকরণ হল ‘চট বা চাটা’। প্লাস্টিক, সিমেন্ট বা চালের বস্তা দ্বারা তৈরি চটকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ‘তেরপাল’ আর বাশেঁর তৈরি চাটা বলা হয় ‘ধাইজ্জ্যে’। কাকড় ও বালিমুক্ত ভাবে মাড়াই করা ধান শুকাতে বা স্তুপ রাখতে এই উপকরণগুলো ব্যবহার করেন কৃষকরা।
কয়েকজন প্রবীণ কৃষকের সাথে কথা বলে জানা যায়, বছর পাঁচেক আগে ফসল ঘরে তোলার পক্ষকাল পূর্ব থেকে কৃষাণিরা দল বেধেঁ এটেল, দোআশ ও গোবর সংমিশ্রিত আঠালো মাটি দ্বারা উঠান লেপনে ব্যস্ত সময় পার করত। হঠাৎ বৃষ্টিতে লেপনকৃত উঠান পানিতে ধূয়ে গেলেও পুনরায় কৃষাণিরা লেগে যেত উঠান লেপনের কাজে। কৃষকদের প্রায় প্রতিটি বাড়ির লেপনকৃত উঠান থাকত তকতকে পরিষ্কার। মাঠ থেকে আনা খড়সহ ধানের স্তুপ (পাড়া), গরু, কল দ্বারা ধান মাড়াই, ধান শুকানো, খড় শুকানো সহ ধান গোলা বা আড়তে মজুদ রাখার পূর্ব পর্যন্ত যাবতীয় কাজ এই উঠানে সম্পাদন করত। এখন কৃষাণের বাড়িতে এমন উঠান খুব কমই দেখা মিলে।
সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে প্রযুক্তির উৎকর্ষতা। এখন ধান কাটা, ধান মাড়াইয়ের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে অভিনব যন্ত্রপাতি। স্বল্প সময়ে, স্বল্প পরিশ্রমে কৃষক ঘরে তুলছেন অধিক ফসল। তাই লেপানো উঠানের বিকল্প হিসেবে কৃষকের নিকট অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উপকরণ হয়ে দাঁড়াল এই চট বা চাটা।
রাউজানর বিভিন্ন হাট-বাজারে এই চট বা চাটা পাওয়া গেলেও এর সবচেয়ে বড় বাজার হল উপজেলা সদরের ফকির হাট। এখানে উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কৃষকরা এই বাজারে এসে চটের দোকানে ভিড় করছে।
উপজেলার কদলপুর থেকে চট কিনতে আসা মোহাম্মদ কবির নামের এক কৃষক সিটিজিসান.কমকে জানান, দু’এক দিনের মধ্যে ধান কাটা শুরু হবে। তাই কাটা ধানের পাড়া (স্তুপ) ও মাড়াইয়ের জন্য চট কিনতে এসেছি।
তিনি আরো জানান, চট সহজে যেখানে সেখানে ব্যবহার করা যায়। বৃষ্টি হলে ধানের পাড়ার (কাটা ধানের স্তুপ) উপর তেরপাল (চট) দিয়ে ঢেকে দিলে বৃষ্টির পানি থেকে রেহায় পাওয়া যায়। কিন্তু বাজারে চটের দাম বেশি মনে হচ্ছে।
উপজেলার ফকির হাটের চট বিক্রেতা ঢেউয়া পাড়া এলাকার মৃত ফজল আহম্মদের পুত্র মোহাম্মদ মহিউদ্দিন সিটিজিসান.কমকে জানান, আমন ও বোরো ফসল ঘরে তোলার সময় চটের চাহিদা বেশী থাকে। তাই তুলনামূলকভাবে বছরের অন্যান্য সময়ের চেয়ে বেচাও বেশি হয়, দামও বেশি থাকে।
বাকী সময়গুলোতে তেমন বেচা থাকেনা। এমনকি সপ্তাহে একখানাও বিক্রি হয় না। তার দাদা, বাবাও এই ব্যবসায়ে জড়িত ছিলেন। সুবাদে শৈশবকাল থেকে সে বাপ-দাদার ব্যবসার প্রতি ঝুকে পড়েছেন। আগে বাঁশের চটা, লাই, কুলা, চাকুনি নিজেরা তৈরি করলেও এখন বেশির ভাগ উপকরণ বিভিন্ন স্থান থেকে ক্রয় করে এনে বিক্রি করছে। একটি ১৮০ (১২.১৫) বর্গফুটের প্লাস্টিকের চটের দাম পড়ে ৬০০-৭০০ টাকা, আকার অনুসারে বাঁশের চটের দাম ১০০-৪০০ টাকা আর সিমেন্ট বা চালের বস্তা দ্বারা তৈরি চটের দাম ১০ বস্তার চট ১০০টাকা, ২০ বস্তার চট ২০০ টাকা। তবে বাশেঁর চটের চেয়ে প্লাস্টিকের চট বেশি চলে বলে জানান বিক্রেতা মহিউদ্দিন।
কালের আবর্তে সহজ ব্যবহারোপযোগীতার কারণে কৃষকের নিকট জনপ্রিয় হয়ে উঠে এই প্লাস্টিকের চট। অধিকহারে প্লাস্টিকের চট ব্যবহারের কারণে বাড়ছে পরিবেশের উপর হুমকি। সেই সাথে বিলুপ্তির পথে বাঁশ ও বেত শিল্প।
এছাড়াও ফসল তোলার মৌসুমে চট ব্যবসায়ীরা মোটামুটি ব্যবসা করলেও বাকী সময়গুলোতে অনেক চট ব্যবসায়ী ঋণের বোঝাসহ নানা কারণে মানবেতর জীবন অতিবাহিত করে বলে জানা যায়।
সিটিজিসান.কম/রবি
Print This Post

