অনলাইন ডেস্ক ::
কোনো কঠিন শর্তে বিদেশি সহায়তা নেবে না বাংলাদেশ৷ তাই ব্রিটেনের দেয়া জলবায়ু তহবিলের এক কোটি ৩০ লাখ পাউন্ড ফেরত পাবে দেশটি৷ বস্তুত বিশ্বব্যাংকের দেয়া কঠিন শর্ত নিয়ে বনিবনা না হওয়ায় এ অর্থ ব্যবহার করছে না বাংলাদেশ৷ খবর ডিডব্লিউর।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৮ সালে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় বিশ্বব্যাংকের নেতৃত্বে গঠিত ‘বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ রেজিয়েলেন্স ফান্ড’ (বিসিসিআর)-এর আওতায় যুক্তরাজ্যের দাতা সংস্থা ডিএফআইডি এ অর্থ বরাদ্দ রেখেছিল৷ সে সময় সাত কোটি ৫০ লক্ষ পাউন্ড অনুদানের ঘোষণা করে ব্রিটিশ সরকার৷ সেই অর্থ থেকে বাংলাদেশ এক কোটি ৩০ লাখ পাউন্ড অর্থ গ্রহণ করলেও, অর্থ সরবরাহের মাধ্যম হিসেবে বিশ্বব্যাংকের অন্তর্ভূক্তি মেনে নেয়নি৷
এ কারণে বরাদ্দকৃত অর্থ খরচ করেনি দেশটি৷ তাছাড়া এরপর শর্ত নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা হলেও কোনো সুরাহা হয়নি৷ শেষ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা ডিএফআইডি তাদের ছাড় করা এক কোটি ৩০ লাখ পাউন্ড অর্থ ফেরত নিচ্ছে৷
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অবশ্য এ নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য জানা যায়নি৷ বাংলাদেশের একটি সংবাদমাধ্যম এ নিয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) বিশ্বব্যাংক শাখার প্রধান ও অতিরিক্ত সচিব কাজী সফিকুল আজমের সঙ্গে যোগাযোগ করে৷ তবে তিনি এ বিষয়ে কিছু বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন৷
তবে লন্ডনে বাংলাদেশ হাই কমিশনের মুখপাত্র আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘‘বাংলাদেশ সরকারের সাথে বিশ্বব্যাংকের সম্পর্ক তিক্ততায় রূপ নেয় পদ্মা সেতুর অর্থায়নে বিশ্বব্যাংক যখন ৭৬৪ মিলিয়ন পাউন্ড অর্থ ফিরিয়ে নেয়, তখন থেকে৷ এরপর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যেকোনো অনুদান গ্রহণের ক্ষেত্রে যথেষ্ট কঠোর হয়েছেন৷ এটা স্পষ্ট করেছেন যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের শর্ত আরোপ করা কোনো দান গ্রহণ করতে ইচ্ছুক নন তিনি৷”
এই অর্থ ফেরত নেয়াকে ব্রিটিশ সরকারের ব্যর্থতা বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা৷ তাঁরা বলছেন, ‘‘জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের দক্ষতা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে ব্রিটিশ সরকার৷”
‘লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্স’-এর ভিজিটিং ফেলো জোসেফ হ্যানলন একটি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘‘বিশ্বব্যাংকের সাথে বাংলাদেশের মতপার্থক্য থাকতে পারে৷ কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে বাংলাদেশ প্রায় ২০ বছর ধরে যুদ্ধ করছে, এ বিষয়ে বাংলাদেশের প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানীরাও যথেষ্ট অভিজ্ঞতা সম্পন্ন৷ দেশটি জলবায়ু পরিবর্তনে স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে৷ তবুও যুক্তরাষ্ট্র ও ডিএফআইডির মতো দাতা সংস্থাগুলো বাংলাদেশের এই দক্ষতার স্বীকৃতি না দিয়ে, নিজেরা বেশি জানেন বলে দাবি করায় এই অর্থ ফেরত এসেছে৷ অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় বাংলাদেশের এই বরাদ্দ প্রয়োজন ছিল৷”
বিশ্বব্যাংকের নেতৃত্বে ২০১০ সালে ‘বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ রেজিয়েলেন্স ফান্ড’ (বিসিসিআর) গঠন করা হয়৷ ডিএফআইডি তখন সিদ্ধান্ত নেয় যে, বাংলাদেশ সরকারকে এ অর্থ সরাসরি না দিয়ে বিসিসিআই-এর মাধ্যমে দেওয়া হবে৷ তবে এ ধরনের উদ্যোগের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকের কঠিন শর্তের কারণে এ অর্থ নিতে শুরু থেকেই অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছিল বাংলাদেশ৷
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)-এর অর্থনীতিবিদ ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, ‘‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় বাংলাদেশ নিজেই আড়াই হাজার কোটি টাকার একটি ফান্ড গঠন করেছে৷ নিজস্ব অর্থে এই ফান্ড গঠন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মেকাবেলায় রোল মডেলে পরিণত করেছে বাংলাদেশকে, যদিও এই ফান্ডের ব্যবহার নিয়ে অভিযোগ আছে৷”
তিনি বলেন, ‘‘বাংলাদেশ যে ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট’ গঠন করেছে সেখানে কেউ প্রভাব বিস্তার করুক, বাংলাদেশ তা চায় না৷ বাংলাদেশ তার নিজস্ব নীতি অনুযায়ী কাজ করছে৷ তাই অন্যের নীতি গ্রহণ করতে আপত্তি আছে দেশটির৷”
বাংলাদেশের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে নানাভাবে৷ কৃষিক্ষেত্রও এর মধ্যে রয়েছে৷ তবে আশার কথা, এই প্রভাব মোকাবিলায় সক্ষম কিছু ধানের জাত উদ্ভাবনের কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, ব্রি-র মহাপরিচালক ড. জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস৷
তিনি আরো বলেন, ‘‘বাংলাদেশ মনে করে, উন্নত দেশগুলো পরিবেশের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে৷ তাই সহায়তা করা তাদের দায়িত্ব৷ কিন্তু সেই সহায়তার সঙ্গে কোনো শর্তের ঝুঁকি নিতে চায় না বাংলাদেশ সরকার৷ বিশ্বব্যাংককে বাদ দিয়ে সরকার এখন নিজেই পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন করছে৷ তাই কোনো বদনাম না নিয়ে বাংলাদেশ সরকার চায় নিজেদের অর্থায়নেই জলবায়ুর প্রভাব মোকাবেলার ও পুনর্বাসনের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করতে৷”
বাংলাদেশে জলবায়ু তহবিলের বড় একটি অংশ খরচ করা হয় পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)-এর মাধ্যমে৷ পিকেএসএফ-এর চেয়ারম্যান ড. কাজী খলিকুজ্জামান আহমেদ বলেন, ‘‘বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ভিজিলেন্স ফান্ড তৈরি করা হয়েছিল, যেখানে ব্রিটেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশ মোট ১৯০ মিলিন ডলার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল৷ এরমধ্যে তারা ১৩০ মিলিয়ন ইউএস ডলার দেয়, যার মধ্যে ৮৭ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়ে যায়৷ এরসঙ্গে বিশ্বব্যাংকও ছিল৷ পাঁচ বছরের ওই চুক্তি শেষ হয়ে যাওয়ায় এই ফান্ড আর ব্যবহার করা হচ্ছে না৷” সূত্র: ডয়েচে ভেলে
সিটিজিসান.কম/বিউটি
Print This Post

