নিজস্ব প্রতিবেদক | আপডেট : ১২ জুলাই, ২০২২ মঙ্গলবার ১১: ০০ এএম
সরকারি খাদ্যগুদাম থেকে কালো বাজারে চাল পাচার এবং পরিবহন খরচের নামে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ভুয়া বিল-ভাউচারে অর্থ আত্মসাৎ বন্ধ করতে খাদ্য পরিবহনে বিআরটিসির ট্রাক ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিগণ।
৬ জুলাই একটি দৈনিক পত্রিকার খাদ্য বিষয়ক বিভিন্ন বিষয়ে আলাপকালে এসব কথা বলেছেন। চট্টগ্রামে দীর্ঘ চার বছর পর সরকারি খাদ্য পরিবহনে নতুন ঠিকাদার তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া শুরু করার পরপরই তা মামলা করে থামিয়ে দেয়ার সংবাদ বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে আসে।
বিশ্লেষকগণ বলছেন, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধি অনুযায়ি (পিপিআর) ঠিকাদার অর্ন্তভুক্তির ও নিয়মিত টেন্ডারের মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতায় যখন ফিরতে বাধা, সেখানে অনিয়মকে নিয়মে পরিনত করা হয়েছে এটা বুঝতে অসুবিধে হওয়ার কথা নয়! সরকারের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা (খাদ্য অধিদপ্তর) ভেতরে-বাইরে সংঘবব্ধ একটি চক্রের নিকট জিম্মি হয়ে থাকা এটাও কল্যাণকর কোনো রাষ্ট্রের জন্য সুখকর নয়। টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এসব অনিয়ম ও দুর্নীতি কঠোর হস্তে রোধ করতে প্রয়োজনে অতীতের সকল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের খন্ডকালিন নিয়োগ চুক্তি বাতিল করে এ কাজে রাষ্ট্রীয় পরিবহন (বিআরটিসি) ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।
এদিকে বিআরটিসি চট্টগ্রামের সংশ্লিষ্টরা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম খাদ্য অধিদপ্তর থেকে চাহিদাপত্র পাঠালো যত ট্রান্সপোর্ট (ট্রাক) প্রয়োজন সাপোর্ট দেওয়া সম্ভব। তবে খাদ্য বিভাগতো চায় না, চাইলে পাবে।
তারা জানান, ঢাকায় বিআরটিসির শতশত ট্রাক অলস পড়ে আছে। খাদ্য বিভাগ চাইলে এসব ট্রাক সরকারি খাদ্য পরিবহনের কাজে ব্যবহার করা যায়।
এদিকে দীর্ঘ চার বছর পর নতুন ঠিকাদার তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া শুরু করেছে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের দপ্তর। ইতিমধ্যে তিনটি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করা হয়েছে। তবে এ কার্যক্রম থামিয়ে দিতে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের দপ্তর, খাদ্য গুদামের কর্মকর্তা, পরিবহন ঠিকাদার এবং অসাধু চাল ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি সংঘবব্ধ চাল চোর সিন্ডিকেট। যেকোনো মূল্যে উচ্চ আদালতে রিট (নিষেধাজ্ঞা নিয়ে) করে নতুন এ ঠিকাদার তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া বন্ধ করার জন্য দফায় দফায় রুদ্ধদ্বার বৈঠক করছেন বলে গোপন সূত্রে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, নগরের দেওয়ানহাট কেন্দ্রীয় খাদ্য সরবরাহ কেন্দ্র (সিএসডি) থেকে চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন এলএসডির উদ্দেশ্যে বের হওয়া ট্রাকে ট্রাকে চাল চোরাইপথে পাচার হয়ে যাচ্ছে খোলা বাজারে। সম্প্রতি এ সংক্রান্ত একাধিক সংবাদ গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর পরই টনক নড়ে খাদ্য বিভাগে।
নাম প্রকাশ না করা শর্তে চট্টগ্রাম আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, মুলত পরিবহন ঠিকাদারদের সহায়তায় চট্টগ্রামে এসব চাল চুড়ির ঘটনা ঘটে। তাই পিপিআর অনুযায়ি ২ বছর পরপর নতুন ঠিকাদার নিয়োগের নিয়ম থাকলেও গত চার বছরেও তা করেননি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এই সংস্থাটি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, চট্টগ্রামের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক (আরসিফুড) মো. জহিরুল ইসলাম খান গত ২৩ জুন দশম বারের মতো আরো তিন মাসের জন্য পুরোনো ঠিকাদারদের মেয়াদ বাড়িয়ে অফিস আদেশ জারি করেছেন। আর এই ইস্যুকে সামনে এনেই মামলার জালে আটকে নতুন ঠিকাদার অর্ন্তভুক্তি প্রক্রিয়া বানচাল করে দেয়ার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে চাল পাচারকারী সংঘবব্ধ জোট। এতে সচেতন মহল ও বিশ্লেষকরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
সুজন চট্টগ্রাম জেলার সম্পাদক এডভোকেট আকতার কবির চৌধুরী এই প্রসঙ্গে বলেন, শক্তিশালী মনিটরিং এবং জবাবদিহীতা নিশ্চিত করা না গেলে যেভাবে চলছে এভাবেই চলবে। আর অপরাধিরা পর্দার আড়ালেই থেকে যাবে।
চট্টগ্রাম ডিআরটিসির একটি সূত্র জানায়, নগরের পাহাড়তলী আর চাক্তাই খাতুনগঞ্জের ৬ জন অসাধু ব্যবসায়ী সরকারি গুদামের চাল চুরির সাথে সরাসরি জড়িত। এরা দীর্ঘদিন ধরে নগরের দেওয়ানহাট ও হালিশহর এলএসডি এবং পতেঙ্গা সাইলো থেকে বিভিন্ন এলএসডির উদ্দেশ্যে সরকারি খাদ্যপন্য বোঝাই ট্রাক ভাগিয়ে নিয়ে আসছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় চোরাই চালের ক্রেতার প্রতিষ্ঠার হলো পাহাড়তলীর ফারুক ট্রেডিং আর খাতুনগঞ্জের মেসার্স বেলাল ট্রের্ডিং।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিবেদকের সঙ্গে কোনো কথা বলতে রাজি হননি পাহাড়তলী চাল ব্যবসায়ী সমিতির সধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দিন।
গত ২৮ জুন দিনগত রাতে বেলাল ট্রেডিংয়ের গুদামে সরকারি চাল নামানোর (আনলোড) সময় পুলিশ ১৫ মেট্রিক টন (এক ট্রাকে ৩০৩ বস্তা) চাল জব্দ করে। অভিযোগ রয়েছে, এসব চাল জব্দকালিন সময় ভুয়া-কাগজপত্রে নিজেদের দাবীকরে ছাড়িয়ে নেয়ার ব্যর্থ চেষ্টা চালায় সেসার্স বেলাল ট্রেডিং এর মালিক বেলাল উদ্দিন ও তার ছোটভাই হেলাল উদ্দিন। সরকারি গুদামের চাল কালোবাজাওে পাচারের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে বিশেষ ক্ষমতা আইনে ট্রাকের চালক ও চালকের সহকারীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে। তবে এই মামলায় পরিবহন ঠিকাদার বা ভুয়া কাগজপত্রে সরকারি পাচারের চাল ছাড়িয়ে নিতে তদবীরকারী বেলাল ও হেলালকে রহস্যজনক কারণে অভিযুক্ত করা হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারি চাল উদ্ধারের প্রতিটি ঘটনায় মামলার বিবরণে ধামাচাপা দেয়া হয়। আর অধরাই থেকে যায় চাল চুড়ির নেপথ্যের কারিগররা।
এ বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. জহিরুল ইসলাম খান এর মোবাইলে একাধিকবার চেষ্টা করেও কোনো বক্তব্য মিলেনি।
সিএস
Print This Post
