পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদের বিরুদ্ধে ‘অনড় অবস্থানে’ লালদিয়া চরের বাসিন্দারা

নিজস্ব প্রতিবেদক | আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ শুক্রবার ০৮:২০ পিএম

আদালতের আদেশে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ লালদিয়া চরে শিগগিরই উচ্ছেদের উদ্যোগ নিলেও পুনর্বাসন বা ক্ষতিপূরণ ছাড়া উচ্ছেদের বিরুদ্ধে অনড় অবস্থানে রয়েছে সেখানকার ১৪ হাজার মানুষ।

শুক্রবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১১টায় চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধন করে এ দাবি জানায় তারা।

শুক্রবার সকাল থেকেই পতেঙ্গার লালদিয়ার চর থেকে বেশ কয়েকটি বাসে করে হাজার খানেক নারী-পুরুষ চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব প্রাঙ্গনে এসে জড়ো হন। তাদের সাথে মানববন্ধনে একাত্মতা প্রকাশ করে যোগ দেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

সংবাদ সম্মেলনে লালদিয়া চর পুনর্বাসন কমিটির আহ্বায়ক আলমগীর হাসান বলেন, ‘লালদিয়া চরে যদি আদি বাসিন্দাদের বাইরে কেউ এসে থাকে তাহলে তা বের হবে। ২০১৪ সালে লালদিয়ার চরের সি ব্লকে মাল্টিপারপাস টার্মিনাল করতে বন্দর উদ্যোগ নিয়ে তাদের সাথে যৌথ সার্ভে করা হয়। সেখানে ৪৫২ জনকে বন্দরই চিহ্নিত করেছিল। আমরা বলেছিলাম ৪৮২ জন। অল্প পার্থক্য। সেটা শুধু সি ব্লকে। এ ব্লকে ১৭০০ পরিবার থাকে। কোনো সার্ভে করা হয়নি। সার্ভে হলে পরিষ্কার হয়ে যাবে ৭২ সালে আমরা কোন পরিবারগুলো ছিলাম।’

তিনি বলেন, ‘১৯৭২ সালে চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমান বন্দর করার সময় আমাদের উচ্ছেদ করে লালদিয়া চরে বসবাস করতে দেয় সরকার। তখন এখানে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালে কর্ণফুলীতে বেড়িবাঁধ দিয়ে লালদিয়া চরকে ভাঙন থেকে রক্ষা করা হয়।’

‘নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী যে কথা বলেছেন, এখানে ভাড়াটিয়ারা থাকে। যৌথ সার্ভে করলে সেটার উত্তর বের হবে। বন্দর কর্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসন, মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধি এবং প্রয়োজনে আদালতের প্রতিনিধিসহ থেকে সার্ভে করা হোক।’— বলেন আলমগীর হাসান।

মানববন্ধন চলাকালে নগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনি বলেন, ‘আমরা আন্দোলনে নেমেছি যারা জমি হারিয়েছে, পৈতৃক ভূমি হারিয়েছে তাদেরকে পুনর্বাসন করার দাবিতে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি মানবিক রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে বিমান ঘাটি সম্প্রসারণের জন্য তিনি অত্র এলাকার বাসিন্দাদের লালদিয়ার চরে স্থানান্তর করেছিলেন। আজকে এমন একটা সময়ে তাদেরকে উচ্ছেদের কথা বলা হচ্ছে যখন সারা বাংলাদেশে উন্নয়ন হচ্ছে। ক্ষতিপূরণ ছাড়া তাদের উচ্ছেদের কথা বলা হচ্ছে। ’

রনি বলেন, ‘দীর্ঘসময় ধরে এটি সুরাহা না হলেও এলাকাবাসী শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করছে। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিকে ‘উস্কানি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে আন্দোলটিকে, ক্ষতিপূরণের মানবিক আবেদনকে নসাৎ করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। একটি মানবিক আবেদনকে ‘উস্কানিমূলক’ আখ্যায়িত করে যে বক্তব্য এসেছে আমরা তার তীব্র নিন্দা ও ঘৃণা জানাচ্ছি।’

চট্টগ্রামের মানুষকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চট্টগ্রামবাসীর অধিকার হরণ করা যাবে না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অতীতে আমরা দেখেছি ব্রিটিশরা পারেনি, একাত্তরে সোয়াত জাহাজ বন্দরের আশেপাশের হাজারো মানুষ রক্ত দিয়ে ফিরিয়েছিল। এই বন্দরের উন্নয়ন হয়েছে, বন্দরের টাকায় পায়রা বন্দর হয়েছে, গভীর সমুদ্র বন্দর হচ্ছে। তখন বন্দরের আশপাশ থেকে অসহায় মানুষকে উচ্ছেদের কথা বলা হচ্ছে, অমানবিক নির্যাতন করা হচ্ছে।’

‘আমরা স্পষ্ট বলতে চাই, আমরা কোনো ভাড়াটিয়ার জন্য আন্দোলনে নামিনি, আন্দোলনে নেমেছি যারা পৈত্রিক ভূমি হারিয়েছে তাদেরকে পুনর্বাসন করার দাবিতে। পুনর্বাসন না হলে এ আন্দোলন এক দফা এক দাবিতে যাবে। অন্যথায় চট্টগ্রামবাসীকে বৃদ্ধাঙ্গুলি বা আইনের কথা বলে ন্যায্য অধিকার থেকে দূরে রাখতে চান, তাহলে তার দাঁতভাঙা জবাব চট্টগ্রামবাসী দেবে।’—বলেন রনি।

আওয়ামী লীগ নেতা ওয়াহিদুল আলম বলেন, ‘রোহিঙাদের আশ্রয় দিয়েছেন আমাদের নেত্রী। তাহলে আমাদের কেন ঠাঁই হবে না? নৌ প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, উস্কানিদাতাদের তালিকা হচ্ছে। ১০ দিন ধরে বিদ্যুৎ-পানিহীন মানবেতর জীবনযাপন করছি। আজ যদি মহিউদ্দিন চৌধুরী বেঁচে থাকতেন এ কথা আপনি বলতে পারতেন না। মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারীরা আজও বেঁচে আছে।’

তিনি বলেন, ‘এ জমি বঙ্গবন্ধু আমাদের দিয়েছিলেন। ২০০৫ সালের রায় কেন বাস্তবায়ন করছেন না? আমরা বেঁচে থাকতে উচ্ছেদ হবে না। আমাদের গায়ের উপর বুলডোজার চালাতে পারলে উচ্ছেদ করুন।’

উল্লেখ্য, ১৯৭২ সাল থেকে লালদিয়ার এলাকায় বসবাস করে আসছেন প্রায় দুই হাজার ৩০০ পরিবারের ১৪ হাজার মানুষ। সেখানে এ, বি ও সি ব্লকে বিভক্ত হয়ে গঠিত হয় লালদিয়ার চর।

২০০৫ সালের ১২ জুলাই লালদিয়ার চরের বি ব্লক থাকা প্রায় পাঁচশ পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়। ২০১৯ সালেও লালদিয়ার চর এ-ব্লকের কিছু অংশ উচ্ছেদ করার পরও নতুন করে চলতি বছরের আগামী ২৫ ফেব্রুয়ারি এ-ব্লক উচ্ছে করার জন্য নোটিশ দেয় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।

ইতোমধ্যে ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গত ২০ ফেব্রুয়ারি মানববন্ধন করেছেন লালদিয়া চরের হাজার হাজার মানুষ।

এরমধ্যে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামে এসে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী লালদিয়ার চরে উচ্ছেদে অনড় অবস্থানের কথা জানিয়ে বলেন, সেখানে পুনর্বাসনের করার মতো কেউ নেই। লালদিয়ার চরে জমি ‘দখলে রেখে’ যারা আর্থিক ‘ফায়দা লুটেছে’ তাদের তালিকা করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ, শ্রমিক লীগ ও ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ চরবাসীর পক্ষে তাদের অবস্থান জানিয়েছেন। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সদস্য বিদায়ী প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজনও পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদের বিরোধীতা করেছেন।

প্রসঙ্গত গত ২৫ ফেব্রুয়ারি লালদিয়া চরে অবৈধ স্থাপনাসমূহ উচ্ছেদের কথা থাকলেও সেই সিদ্ধান্ত পিছিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। পহেলা মার্চের দিকে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার করার কথা ভাবছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।

আরএইচ/সিএস

Print This Post