লামায় ধর্ষণের শিকার প্রতিবন্ধী কিশোরীর সন্তান প্রসব

আপডেট: ৯ অক্টোবর ২০২০ ২:৩০ পূর্বাহ্ন

বান্দরবান প্রতিনিধি | আপডেট : ৯ অক্টোবর, ২০২০ শুক্রবার ১০:০০ এএম

ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের প্রথাগত নিয়মেই অন্তঃসত্ত্বা কিশোরীর ইজ্জতের মূল্য ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করেই ধামাচাপা দেয়া হয়েছে একটি ধর্ষণের ঘটনা। পরে ওই কিশোরী সন্তান প্রসবের পর বাচ্চার পিতৃপরিচয় নিয়ে পড়েছেন চরম বিপাকে। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পুরুষ ও মহিলা মেম্বার এবং পাড়ার কারবারিসহ অন্তত ২০-২৫জন লোক উপস্থিত ছিলেন কিশোরী অন্তঃসত্ত্বার বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর আয়োজিত গ্রাম্য সালিশে।

তবে এই প্রতিবন্ধী ত্রিপুরা কিশোরী সন্তান প্রসবের পর বাচ্চার দায়িত্ব নিচ্ছেন না কেউই। ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের প্রথাগত নিয়মের উপর দায়চেপে গ্রাম্য সালিশে ধর্ষণের বিচার এবং কিশোরীর ইজ্জতের মূল্য নির্ধারণের অপরাধ থেকে এখন নিজেরা বাঁচার চেষ্টা করছেন সেই সালিশ কারকরা।

ধর্ষণের পর সন্তান প্রসবের ঘটনাটি বান্দরবানের লামা উপজেলার গজালিয়া ইউনিয়নের নাজিরাম ত্রিপুরা পাড়ার। আর গ্রাম্য সালিশে ২০ হাজার টাকা জরিমানায় ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়া হয় পাশ্ববর্তি আজিজনগর ইউনিয়ন পরিষদ মিলনায়তনে।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে গ্রাম্য সালিশের প্রধান এবং আজিজনগর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘ধর্ষিত কিশোরীর পরিবারকে থানায় মামলা করার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলাম। তবে তারা প্রথাগত নিয়মে সমাধান চাওয়ায় পাড়ার কারবারিসহ স্থানীয়রাই সালিশের মাধ্যমে একটি সমাধাণটি দিয়েছে।’

একই কথা বলেন গজালিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বাথোয়াইচিং মারমা। তিনি বলেন, ‘মহিলা মেম্বারের কাছ থেকে ঘটনাটি জেনে থানায় মামলা করার পরামর্শ দিয়েছি। ধর্ষণের শিকার কিশোরীর পরিবার মামলা করতে রাজি না হওয়ায় ইউনিয়ন পরিষদে সালিশ ডেকে সমাধাণ করা হয়েছে।’

আর লামা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘এ বিষয়ে কেউই থানায় মামলা করতে আসেননি। মামলা করলে ওই কিশোরী মা অবশ্যই আইনগত প্রতিকার পাবেন।’

পাড়ার কারবারি (সর্দার) নাজিরাম ত্রিপুরা বলেন, ‘কে তাকে ধর্ষণ করেছে তাকে সঠিকভাবে ওই প্রতিবন্ধী কিশোরী শনাক্ত করতে পারেনি। স্থানীয় লিটন (৩২) নামক এক যুবককে সন্দেহভাজন ধর্ষক অভিযুক্ত করে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। পরে সেই টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা নিয়ে শুকর কিনে জবাই দিয়ে পাড়া শুদ্ধিকরণ করা হয়েছে।’

‘আর ৫ হাজার টাকা আদায় করে ধর্ষণের শিকার প্রতিবন্ধী কিশোরীর পরিবারকে দেয়া হয়েছে। জরিমানার অবশিষ্ট ১০ হাজার পরিশোধ করার জন্য অভিযুক্ত লিটন সময় নিয়েছেন বলে জানান নাজিরাম ত্রিপুরা। ওই কিশোরী অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার খবর জানাজানি হওয়ার পরই আজিজনগর ইউনিয়ন পরিষদ মিলনায়তনে ত্রিপুরা প্রথা অনুযায়ী গ্রাম্য সালিশে বিষয়টি সমাধান করা হয়েছে।’— যোগ করেন পাড়ার কারবারি নাজিরাম ত্রিপুরা।

আরও পড়ুন: লামায় কবরের মাটি থেকেও ঘুষ আদায়

একই সুরে গজালিয়া ইউনিয়নের মহিলা মেম্বার ও নাজিরাম ত্রিপুরা পাড়ার বাসিন্দা সইততি ত্রিপুরা বলেন, ‘প্রতিবন্ধী কিশোরী অন্তঃস্বত্তা হওয়ার পর বিষয়টি পরিবারসহ পাড়াবাসীর নজরে আসে। পরবর্তীতে পাড়ার কারবারি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গদেরকে নিয়েই ত্রিপুরা প্রথা অনুযায়ী আজিজনগর ইউনিয়ন পরিষদে বসে ঘটনাটি সমাধান করা হয়।

ধর্ষণের শিকার প্রতিবন্ধী কিশোরী জানান, প্রায় ১০ মাস পূর্বে নাজিরাম ত্রিপুরা পাড়ার পাশে বে-সরকারি একটি বিদ্যালয়ে রাতে একটি অনুষ্ঠান হয়। সেই অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পথে পাড়ার নিচে অবস্থিত যাত্রী ছাউনীতে তাকে ধর্ষণ করে।

প্রতিবেশী জুয়েল ত্রিপুরা জানান, মেয়েটি খুবই অসহায়। ধর্ষণের ফলে জন্ম নেয়া সন্তানটির পিতৃ পরিচয় মেলেনি। গত চার সপ্তাহ পূর্বে সে সন্তান প্রসব করে। আজিজনগর ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের হরিণমারা গ্রামের মৃত শামসুল হকের শারীরিক প্রতিবন্ধী ছেলে সিএনজি অটোরিকশা চালক মো. লিটনকে ধর্ষণে সন্দেহভাজন অভিযুক্ত শনাক্ত করা হয়েছে। তবে ২০ হাজার টাকায় বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। এখন এই বাচ্চার লালনপালন ও কিশোরীর দায়িত্ব নেয়ার কেউই নেই।

ধর্ষণের ঘটনায় গ্রাম্য সালিশে অভিযুক্ত লিটন তাকে জড়ানোর বিষয়টি ষড়যন্ত্র দাবি করেছেন।

লিটনের ভাষ্য, সে শারীরিক প্রতিবন্ধী। তার একটি পা না থাকা সত্ত্বেও সিএনজি অটোরিকশা চালিয়ে জীবন ধারণ করে সে। কিন্তু এই ঘটনায় তাকে ষড়যন্ত্রমূলক ফাঁসানো হয়েছে।

জেইউএইচ/আরএইচ

Print This Post Print This Post