বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি

পতেঙ্গায় বিনা টেন্ডারে মালামাল ভাগিয়ে নিল কাউন্সিলর পুত্র

নিজস্ব প্রতিবেদক | আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২০ বুধবার ১০:০০ এএম

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি চট্টগ্রাম বেসডিপো কর্তৃক উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করেও সেখানে সর্বোচ্চ দরদাতাকে কাজটি দেওয়া হয়নি। একইদিনে বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে বাতিল করা হয় দরপত্রটি। পরে ওইদিনই গোপনে রাতের আঁধারে রেডক্রিসেন্টের এক কর্মকর্তার যোগসাজশে স্থানীয় সাবেক কাউন্সিলর পুত্রের রাজনৈতিক তদবির ও প্রভাব বিস্তারে বিনা দরপত্রে মালামালগুলো ভাগিয়ে নেয় কাউন্সিলর পুত্রের অনুসারি এক ব্যক্তি— এমন অভিযোগ উঠেছে রেডক্রিসেন্টের চট্টগ্রাম জেলা ইউনিটের চেয়ারম্যান ও কেন্দ্রীয় বোর্ডের সদস্য ডা. শফিউল আজম এবং চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থানা ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ছালেহ আহমেদ চৌধুরীর পুত্র ওয়াহিদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে।

অভিযোগ রয়েছে— দরপত্রে অংশগ্রহণ করার পর সেখানে সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে নির্বাচিত হন মো. নুরুদ্দিন নামে এক ইজারাদার। ওইদিন তার কাছ থেকে রেডক্রিসেন্টের মেহেদি হাসান নামের এক কর্মকর্তা ১ লক্ষ টাকা ঘুষ দাবি করেন। তাকে বলা হয় ঘুষের টাকাটা দেয়া হলে সর্বোচ্চ দরদাতায় পাওয়া ৬৮ হাজার টাকায় দরপত্রটি দেয়া হবে। কিন্তু দাবিকৃত টাকা না দেয়ায় অতিরিক্ত টাকায় কাউন্সিলর পুত্রের তদবিরে বিনা দরপত্রে গোপনে মালামালগুলো বিক্রি করে দেয়।

জানা যায়, গত ২০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি চট্টগ্রাম বেইসডিপোর পুরাতন ওয়্যারহাউজে রক্ষিত কিছু মালামালের উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়। ওই দরপত্রে অংশগ্রহণ করেন মোট ১৯ জন। সেখানে সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে ৬৮ হাজার টাকায় দরপত্র পান মো. নুরুদ্দিন। সেখানে সর্বোচ্চ দরদাতা হয়েও তাকে মালামাল দেয়া হয়নি। বিভিন্ন অজুহাতে মৌখিকভাবে দরপত্রটি বাতিল করে কর্তৃপক্ষ।

এদিকে মৌখিকভাবে দরপত্র বাতিলের পরদিন রাতের আঁধারে গোপনে নিজে উপস্থিত থেকে মালামাল ভাগিয়ে নেয় স্থানীয় সাবেক কাউন্সিলর ছালেহ আহমেদ চৌধুরীর পুত্র ওয়াহিদ চৌধুরী। তিনি এই মালামালগুলো পাইয়ে দেন তার অনুসারি হিসেবে পরিচিত শেখ আহমদকে।

দরপত্রে অংশগ্রহণকারী সর্বোচ্চ দরদাতা ঠিকাদার মো. নুরুদ্দিন বলেন, ‘উক্ত উন্মুক্ত দরপত্রে সর্বোচ্চ ইজারাদার হয়েও কর্তৃপক্ষ নানা অযুহাত টেনে দরপত্রটি বাতিল করে দেয়। পরবর্তীতে গতকাল (সোমবার) রাতের আঁধারে গোপনে স্থানীয় সাবেক কাউন্সিলর ছালেহ আহমেদ চৌধুরীর পুত্র ওয়াহিদ চৌধুরীর সহযোগী শেখ আহমদ নামে এক ব্যক্তি বিনা টেন্ডারে মালগুলো নিয়ে যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা দরপত্র জমা দিলাম লিখিতভাবে কিন্তু তারা বাতিল করলো মৌখিকভাবে, এটা কেমন কথা? আমার মতো আরও যারা টেন্ডারে অংশগ্রহণ করেছিলো তারা এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছে।’

দরপত্রে অংশগ্রহণকারী প্রবেল ধর পাবেল নামে এক ব্যক্তি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘রেড ক্রিসেন্টের মত একটা প্রতিষ্ঠান রাতে আঁধারে দরপত্র আহ্বান করেও কিভাবে মালামাল অন্যের কাছে বিক্রি করে সেটা বুঝে আসে না। স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তির প্রভাবে তারা নৈতিকতা বিসর্জন দিবে এটা কখনোও কল্পনাও করিনি। রেড ক্রিসেন্টের মত একটি স্বনামধন্য সেবা সংস্থার নাম খারাপ করার জন্য এরকম কিছু বিতর্কিত ব্যক্তিই যথেষ্ট।’

কাউন্সিলর পুত্র ওয়াহিদ চৌধুরী এবং রেডক্রিসেন্টের চট্টগ্রাম জেলা ইউনিটের চেয়ারম্যান ও কেন্দ্রীয় বোর্ডের সদস্য ডা. শফিউল আজমের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে অনুসন্ধান চালায় সিটিজিসান ডটকমের এই প্রতিবেদক।

অনুসন্ধানে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির ডেপুটি ডিরেক্টর আবদুস সবুর মোল্লার সাথে দরপত্রে অংশগ্রহণকারী এক ব্যক্তির সাথে কথোপকথনের অডিও কলরেকর্ড হাতে আসে প্রতিবেদকের কাছে।

পাঠকদের জন্য কল রেকর্ডটি ভিডিও আকারে উপস্থাপন করা হলো—

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়াহিদুল আলম চৌধুরী বলেন, ‘এখানে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। আমি এসব ব্যাপারে কিছু জানিনা। এসব অভিযোগ মিথ্যা।’

ডেপুটি ডিরেক্টর আবদুস সবুর মোল্লা আপনার প্রভাব থাকার কথা স্বীকার করেছে। এব্যাপারে আপনার বক্তব্য কি?— প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা উনি মিথ্যা বলছে। এই টেন্ডারের ওখানে আমি যাইও নাই। উনি আমাকে চিনেন কিনা? ওনাকে বলবেন যে আমার সাথে ওনার পরিচয় আছে কিনা। আমি শুধু ফোনে কথা বলেছি। এটা উনি ভুল তথ্য দিছে। এটা অনেকে রাজনৈতিক ফায়দা নেয়ার জন্য ভুল তথ্য দিচ্ছে আপনাকে।’

এক প্রশ্নের জবাবে সুর পাল্টে ওয়াহিদুল আলম চৌধুরী বলেন, ‘আমি রেড ক্রিসেন্টের বোর্ড মেম্বার শফিউল আঙ্কেলকে ফোন দিছি। আমি বলছি যে ওদের সাথে ওখানে একটা সমস্যা হইছে। ওরা মাল নিয়ে যাচ্ছে, তখন যারা টেন্ডারে অংশগ্রহণ করছে তারা গাড়ি-টারি ধরছে। পরে আমাকে ডাকছে। ওখানকার সিকিউরিটি গার্ড আমাকে যাওয়ার পর বলতেছে ছবুর আপনার নাম বিক্রি করতেছে। ওখানে যাওয়ার পর সবার সামনে প্রমাণিত হইছে যে আমার এখানে সম্পৃক্ততা নেই।’

পরে তিনি প্রতিবেদককে পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘আপনি তাদের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করেন যারা আমার নাম বিক্রি করছে। এখানে আমার সম্পৃক্ততা নাই।’

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি পতেঙ্গা বেসডিপোর জুনিয়র সহকারী পরিচালক মো. আবদুর রহিম আকনের মুঠোফোনে কল দিলে তার নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির ডেপুটি ডিরেক্টর আবদুস সবুর মোল্লার মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলে প্রতিবারই সংযোগ বিচ্ছিন করে দেন তিনি।

এবিষয়ে জানতে বাংলাদেশ রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির কেন্দ্রীয় বোর্ডের সদস্য ডা. শফিউল আজমের মুঠোফোনে কল করা হলে প্রথমে তার পক্ষ থেকে সাড়া পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে আবারও কল করা হলে তিনি কল কেটে দেন।

আরএইচ/সিএস

Print This Post