ভেজাল ও মানহীন পণ্য তৈরী করছে ফুলকলি

আপডেট: ৯ জুন ২০১৮ ৫:২৮ অপরাহ্ন


চট্টগ্রাম : ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযানে একের পর এক জরিমানা দিয়ে যাচ্ছে। তবুও ভেজাল ও মানহীন পণ্য তৈরী থেমে নেই চট্টগ্রামের স্বনামধন্য খাদ্যপণ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ফুলকলি। আর এসব পণ্য খেয়ে সাধারণ মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে নানা অজানা রোগে।

ভেজাল রোধে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধে সচেতন মহল জোর দাবি জানালেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন শুধু অভিযান চালিয়েই দায় সাড়ছে। আর এই অভিযানকে রাজস্ব বৃদ্ধির নামে সরকারের চাঁদাবাজি হিসেবে দেখছেন প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ কয়েকজন কর্মকর্তা।

আর এ নিয়ে বিস্তারিত তথ্য জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবছার প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক এম এ সবুরের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন।

ব্যবস্থাপক এম এ সবুরের কাছে জানতে চাইলে এ বিষয়েও তিনিও কোন কথা বলতে অনিহা প্রকাশ করেন। তবে ভেজাল ও মানহীন খাদ্য পণ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, ফুলকলির কারখানায় ভেজাল ও মানহীন কোন পণ্য তৈরী হয় না। স্বাস্থ্যসম্মত উন্নত উপকরণে ভোগ্যপণ্য তৈরী করা হয়ে থাকে।

যদি তাই হয় তাহলে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযানে একের পর এক জরিমানা করার কারন জানতে চাইলে তিনি নিরবতা পালন করেন। তবে আরেকটি পক্ষ এ বিষয়ে বলেন, ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান সরকারের রাজস্ব বাড়ানো একটি কৌশল। প্রশাসনের মাধ্যমে এটি সরকারের এক ধরণের চাঁদাবাজি।

কিন্তু জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারি পরিচালক মোহাম্মদ হাসানুজ্জামান বলছেন অন্য কথা। তিনি বলেন, ফুলকলি সম্পূর্ণ অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে খাদ্যপণ্য তৈরী করছে। নগরীর বাকলিয়া রাহাত্তারপূল ও বায়েজীদ কারখানায় যতবার অভিযান চালানো হয়েছে ততবার অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশ দেখেছে ভ্রাম্যমান আদালত।

শুধু তাই নয়, ফুলকলির তৈরী ভোগ্য পণ্যে অত্যন্ত নিম্মমানের চাল, ডাল, চিনি, ময়দা ও ভেজাল ভোজ্যতেলসহ নানা খাদ্য উপকরণ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আবার স্বাদ ও ফ্লেভারের জন্য ব্যবহার করা হয় স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্বক ক্ষতিকর বিভিন্ন মেয়াদোত্তীর্ণ রাসায়নিক উপকরণ। যা খেলে মানবদেহের কিডনি, পিত্তাশয়, যকৃত, হৃদপিন্ড মারাত্বক জটিল রোগে আক্রান্ত হবে। ভেজাল ও মানহীন এসব পণ্য খাওয়া মানে নিজেকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া।

সূত্র জানায়, ফুলকলির কারখানায় সর্বশেষ গত ২২ মে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান চালানো হয়। এ সময় ভেজাল ও মানহীন পঁচাবাসী খাবার তৈরী ও বিক্রীর দায়ে প্রতিষ্ঠানটিকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। সেই সাথে ভেজাল ও মানহীন পণ্য তৈরী ও পচা বাসী খাবার বিক্রি বন্ধে কঠোরভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এরপরও থেমে নেই ভেজাল ও মানহীন পণ্য তৈরী।

এর আগে ২০১৭ সালেও নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ভেজাল ও নিম্মমানের খাদ্যপণ্য তৈরীর দায়ে ৪ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করে ভ্রাম্যমান আদালত। ২০১৬ সালেও একই অভিযোগে ১০ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করে র‌্যাব। এভাবে প্রতিবছর একের পর জরিামানা দিয়ে গেলেও ফুলকলির থেমে নেই অস্বাস্থ্যকর, নোংরা পরিবেশে ভেজাল ও মানহীন ভোগ্যপণ্য তৈরী।

বর্তমানে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ১১০টি শাখা খুলে এসব পণ্য বিক্রী করছে ফুলকলি। ভেজাল ও নিম্মমানের এসব পণ্য বিক্রীর দায়ে শাখাগুলোকেও বারবার জরিমানা করেছে প্রশাসন। গত ২৩ মে সিলেটের বন্দরবাজার শাখাকেও ভেজাল পণ্য বিক্রীর দায়ে ৭০ হাজার টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমান আদালত। সিলেট জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট উম্মে সালিক রুমাইয়া অভিযানে নেতৃত্ব দেন।

আলাপকালে বাকলিয়া রাহাত্তারপূল কারখানার একাধিক শ্রমিক জানান, ঈদ উপলক্ষে ফুলকলি এবার লাচ্ছা সেমাই তৈরী করেছে ব্যাপকভাবে। যা অত্যন্ত নিম্মানের চাল ও ময়দা ব্যবহার করা হয়েছে। ভেজাল ও পোড়া তেলে এসব সেমাই ভাজা হয়েছে। সুস্বাদুর জন্য এতে ব্যবহার করা হয়েছে এক ধরণের বন্যপ্রাণীর হারাম চর্বি। যা দেখলে শরীর ঘিন ঘিন করে। একইভাবে হারাম চর্বি ও রাসায়নিক ব্যবহার করে তৈরী করা হয় ফুলকলির নুডলস। এরমধ্যে মরা মুরগির মাংস ব্যবহার করে চিকেন নুডলস, পঁচা ডিম ব্যবহার করে এগ নুডলস তৈরী করা হয়েছে।

এছাড়া ফুলকলিতে নানা রকম মিষ্টিও তৈরী করা হয়। যেখানে মানবদেহের শরীরের জন্য মারাত্বক ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। নিম্মামানের চিনি ও দুধের ফ্লেভারও ব্যবহার করা হয় এতে। এছাড়া নানা ধরণের বিস্কুট, কেক, পাউরুটি, টোস্ট বিস্কুট তৈরী করা হয়। যা সম্পূর্ণ অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে প্রস্তুত করা হয়ে থাকে।

শ্রমিকরা জানান, ভোগ্যপণ্যের অধিকাংশই নগরীর বাকলিয়া এলাকার রাহাত্তারপূল কারখানায় তৈরী করা হলেও তা বায়েজীদ এলাকার অত্যাধুনিক কারখানায় প্রস্তুত বলে প্রচার করে ফুলকলি। একইভাবে আইএসও সনদ লাভের নামে বিদেশেও রপ্তানীর কথা প্রচার করে। অথচ ভেজাল ও নিম্মমানের হওয়ায় বিদেশে ফুলকলির কোন পন্যই রপ্তানী হয় না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শ্রমিক জানান, কারখানায় চাল, আটা, ময়দাসহ ভোগ্যপণ্য তৈরীর সকল উপকরণ হাত ও পায়ে মাড়িয়ে তৈরী করা হয়। শ্রমিকদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার কোন ব্যবস্থাও ফুলকলির নেই। শ্রমিকদের কেউ কেউ হাতের নখ কাটলেও অনেকেই নখে ময়লা নিয়ে কাজ করে। মাথার চুল খোলা, শরীরের ঘাম, নাকের লালা, পায়খানা-প্রস্রাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নেই বললেই চলে। যা দেখলে মানুষ জীবনেও এসব খাবার খাবে না।-সুত্র মানবজমিন।

Print This Post Print This Post