উ.কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র কতটা বিপজ্জনক?

আপডেট: ২৮ এপ্রিল ২০১৭ ১২:৫৬ অপরাহ্ন

booma

অনলাইন ডেস্ক ::
মার্কিন যুদ্ধবিমানবাহী রণতরি এক আঘাতেই ধ্বংস করে ডুবিয়ে দিতে প্রস্তুত উত্তর কোরিয়া। দেশটির ক্ষমতাসীন ওয়ার্কার্স পার্টির পত্রিকা রোদং সিনমুনের মন্তব্য প্রতিবেদনে এ হুমকি দেওয়া হয়। দেশটির নেতা কিম জং-উনও এমন হুমকি হরহামেশাই দেন। আর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও উত্তর কোরিয়ায় হামলার ব্যাপারে আগ্রহী।

বর্তমান বিশ্বে উত্তর কোরিয়াকে ‘সর্বশ্রেষ্ঠ তাৎক্ষণিক হুমকি’ বলে মনে করছে যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা। এদিকে উত্তর কোরিয়াও যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানার ক্ষমতার কথাও জানায়। এসব শুনে আপনার মধ্য বিস্ময়ের উদ্রেক হতে পারে পিয়ংইয়ংয়েরে হাতে কী কী ধরনের অস্ত্র আছে।

১৫ এপ্রিল উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা কিম ইল-সুংয়ের ১০৫তম জন্মবার্ষিকীতে পিয়ংইয়ংয়ে বিশাল সামরিক কুচকাওয়াজে অস্ত্র-সরঞ্জামের পাশাপাশি ৬০টির মতো ক্ষেপণাস্ত্র প্রদর্শন করা হয়। সামরিক বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, কমিউনিস্ট দেশটির মজুতে বিভিন্ন পাল্লা ও ক্ষমতার হাজারের বেশি ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, আসলে কি উত্তর কোরিয়ার কাছে তেমন অস্ত্র আছে, যা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণ প্রতিহত করা সম্ভব বা পাল্টা জবাব দিতে পারবে দেশটি?

১৫ এপ্রিল পিয়ংইয়ংয়ে সামরিক কুচকাওয়াজে প্রদর্শিত একটি ক্ষেপণাস্ত্র। ছবি: এএফপি১৫ এপ্রিল পিয়ংইয়ংয়ে সামরিক কুচকাওয়াজে প্রদর্শিত একটি ক্ষেপণাস্ত্র।

পিয়ংইয়ংয়ের হাতে কি পারমাণবিক বোমা?
দেশটির হাতে পারমাণবিক অস্ত্র এবং ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যা এ অঞ্চলের মার্কিন মিত্রদের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে? এটা অসম্ভব মনে করা হয় যে ওয়ার হেডসহ পারমাণবিক বোমা বহনে আন্তমহাদেশীয় ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ দূরত্বে আঘাত হানতে পারে, এমন ক্ষেপণাস্ত্র পাঁচ বছর আগেই তৈরি করেছে উত্তর কোরিয়া। এই ক্ষেপণান্ত্র আমেরিকার মাটিতে আঘাত হানতে পারবে।

তর্জন-গর্জন
উত্তর কোরিয়া নাটকীয়ভাবে তার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার গতি সম্প্রতি বাড়িয়ে দিয়েছে। এ বছরে তিনটি সফল ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে দেশটি। আরও দুটি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়। ২০০৬ সালে অক্টোবরের পর থেকে পাঁচটি বড় পারমাণবিক পরীক্ষা চালানো হয়েছে। পিয়ংইয়ংয়ের দাবি, তারা ছয়টি পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়েছে, যা ‘আধুনিক’ এবং আঘাত হানতে ‘প্রস্তুত’।

তবে দেশটি যা-ই বলুক না কেন, পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যাপার সব সময় একটি রহস্যই। আনুমানিক ১০ এবং ১৬টি ক্ষেপণাস্ত্র বা পারমাণবিক অস্ত্র, যা-ই থাকুক, তারা কোথায় রাখে।

উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা কিম ইল-সুংয়ের ১০৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ১৫ এপ্রিল রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ে বিশাল সামরিক কুচকাওয়াজে এ ক্ষেপণাস্ত্রের প্রদর্শন করা হয়। ছবি: এএফপিউত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা কিম ইল-সুংয়ের ১০৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ১৫ এপ্রিল রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ে বিশাল সামরিক কুচকাওয়াজে এ ক্ষেপণাস্ত্রের প্রদর্শন করা হয়।

ক্ষমতাধর দেশ!
পিয়ংইয়ংয়ের কাছে ক্ষেপণাস্ত্র থাকায় দেশটিকে অনেকে ‘দ্বিতীয় স্ট্রাইক পাওয়ার’ বলে থাকেন। কিন্তু কী কী অস্ত্র আছে, তা নির্দিষ্ট করে কেউ বলতে পারে না।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
উত্তর কোরিয়ায় কেউ যদি আক্রমণ চালানোর ব্যাপারে আগ্রহী হয় বা ক্ষমতা থাকে, তাহলে উত্তর কোরিয়ার আক্রমণের আশঙ্কাও অনেক বেশি থাকে।

কিমের হাতে কি হাইড্রোজেন বোমা?
কিমের দাবি, তার কাছে হাইড্রোজেন বোমা আছে। আর এই বোমা অ্যাটম বোমার চেয়ে অনেক শক্তিশালী পারমাণবিক ধরনের একটি বোমা। দেশটির নেতা কিম জং-উনের দাবি প্রমাণিত নয়। তাঁর কাছে সম্ভবত শক্তিশালী পরমাণু বোমা আছে। এটি পুরোপুরি সত্য নয় যে দেশটির কাছে শক্তিশালী হাইড্রোজেন বোমা আছে।

১৫ এপ্রিল উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা কিম ইল-সুংয়ের ১০৫তম জন্মবার্ষিকীতে সামরিক কুচকাওয়াজে এমন অস্ত্র-সরঞ্জাম প্রদর্শন করা হয়। ছবি: রয়টার্স১৫ এপ্রিল উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা কিম ইল-সুংয়ের ১০৫তম জন্মবার্ষিকীতে সামরিক কুচকাওয়াজে এমন অস্ত্র-সরঞ্জাম প্রদর্শন করা হয়।

উত্তর কোরিয়ার কাছে অস্ত্রশস্ত্র, বন্দুক এবং একটি শক্তিশালী রাসায়নিক অস্ত্র আছে। দক্ষিণ কোরিয়ার হিসাব অনুযায়ী, তার প্রতিবেশী উত্তর কোরিয়ায় সেরিন ও ভিএক্সসহ ২ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার মেট্রিক টন রাসায়নিক অস্ত্র রয়েছে।

উত্তর কোরিয়ার বিপরীতে সমর সমাবেশ
উত্তর কোরিয়া পরমাণু বা ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালাতে পারে, এমন আশঙ্কার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাবমেরিন দক্ষিণ কোরিয়ায় পৌঁছেছে গত মঙ্গলবার। পারমাণবিক শক্তিসম্পন্ন ডুবোজাহাজ পাঠানোর পরদিনই বুধবার মিত্রদেশ দক্ষিণ কোরিয়ায় আলোচিত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ‘থাড’ (থাড হচ্ছে টিএইচএএডি বা টার্মিনাল হাই-অলটিচিউড এরিয়া ডিফেন্স) স্থাপনের কাজ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। এটি শত্রু ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংসের একটি ব্যবস্থা।

উত্তর কোরিয়ার সামরাস্ত্রের প্রদর্শনী। ছবি: রয়টার্সউত্তর কোরিয়ার সামরাস্ত্রের প্রদর্শনী।

উত্তর কোরিয়ার ভান্ডারে যা আছে-
উত্তর কোরিয়ার অস্ত্রভান্ডারের খোঁজ পাওয়াটা কিছু কঠিন। কারণ, দেশটি কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে পরিচালিত। তবে যেটুকু খবর পাওয়া যায়, তাতে দেখা যাচ্ছে দেশটিতে ৪ হাজার ২০০টি ট্রাংক রয়েছে। অস্ত্রে সজ্জিত যান আছে ৪ হাজার ১০০টি, বড় কামান ৪ হাজার ৩০০টি, রকেটলঞ্চার ২ হাজার ৪০০টি। কিমের আছে ৭ লাখ সক্রিয় সৈন্য।

নৌবাহিনীতে আছে তিনটি রণতরি জাহাজ। দেশটির কাছে যুদ্ধজাহাজ দুটি। সাবমেরিন ৭০টি।
বিমানবাহিনীতে আছে বিমানবাহী ৫৭২টি জাহাজ, যুদ্ধ জাহাজ ৪৫৮টি, ট্রান্সপোর্ট এয়ারক্রাফট ১০০টি, হেলিকপ্টার ২০২টি, আক্রমণকারী হেলিকপ্টার আছে ২০টি।

পিয়ংইয়ংয়ে বিশাল সামরিক কুচকাওয়াজে সামরিক অস্ত্র প্রদর্শনের সময় দুই সৈন্য। ছবি: এএফপিপিয়ংইয়ংয়ে বিশাল সামরিক কুচকাওয়াজে সামরিক অস্ত্র প্রদর্শনের সময় দুই সৈন্য।

ইউএস সেন্টার ফর ননপ্রোলিফারেশন স্টাডিজের তথ্যমতে, উত্তর কোরিয়ার হুয়াসং-৫ ও হুয়াসং-৬ স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র। এগুলো স্কাড-বি ও স্কাড-সি নামেও পরিচিত। ৩০০ থেকে ৫০০ কিলোমিটার পাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো প্রতিবেশী দক্ষিণ কোরিয়ায় আঘাত হানতে সক্ষম।

ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের তথ্য অনুযায়ী, পিয়ংইয়ংয়ের মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর মধ্যে নডং অন্যতম। এগুলোর পাল্লা এক হাজার কিলোমিটার বা তার বেশি। ২০০৬, ২০০৯, ২০১৪ ও ২০১৬ সালে এই ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে উত্তর কোরিয়া।

গত বছর উত্তর কোরিয়া একাধিকবার তাদের মুসুদান ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের দাবি, এই ক্ষেপণাস্ত্র আড়াই হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিতে সক্ষম। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সংস্থার হিসাবমতে, মুসুদানের পাল্লা ৩ হাজার ২০০ কিলোমিটার। অন্য সূত্রগুলোর দাবি, এই ক্ষেপণাস্ত্র চার হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিতে পারে। তথ্যসূত্র: বিবিসি ও ইকনোমিকটাইমস।

সিটিজিসান.কম/রবি

Print This Post Print This Post