চট্টগ্রাম :: ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ। যুদ্ধরত বাঙালি সৈনিকদের জন্য রসদ নিয়ে যাচ্ছিলেন চার তরুণ। তাদের জিপ চট্টগ্রাম নগরীর চেরাগী পাহাড় মোড় পার হওয়ার সময় ওত পেতে থাকা পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের মুখে পড়ে। অতর্কিত আক্রমণে ঘটনাস্থলে প্রাণ হারান তিনজন। আহত অন্যজন মারা যান চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ‘মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম’ বইয়ের তথ্যমতে, তারাই মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রামে প্রথম শহীদ।
একাত্তরের প্রতিরোধ যুদ্ধের সক্রিয় কর্মী চার তরুণ হলেন- বশরুজ্জামান চৌধুরী, জাফর আহমদ, দীপক বড়ুয়া ও মাহবুবুল আলম চৌধুরী।
তারাই চট্টগ্রামের প্রথম শহীদ। কিন্তু মাহবুবুল আলম ছাড়া অন্য তিনজনের লাশ কোথায় নেওয়া হয়েছে, কেউ জানে না।
মাহবুবুল আলম চৌধুরীসহ সেদিন নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে আহত হয়ে আসা ইপিআরের (বর্তমান বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) সদস্য ও মুক্তিযোদ্ধাদের ২০-২৫ জনকে মাটিচাপা দেওয়া হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের দক্ষিণ-পূর্ব পাশের ঘন পাহাড়ি জঙ্গলে (বর্তমানে খেলার মাঠের দক্ষিণ-পূর্ব পাশ)। কিন্তু বিজয়ের ৪৬ বছর পরও বধ্যভূমিটি চিহ্নিত হয়নি।
বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ চট্টগ্রাম জেলা ইউনিটের প্রকাশিত ‘মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম’ প্রথম খ- বইয়ে উল্লেখ করা হয়, ২৮ মার্চ পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে প্রথম শহীদ হন চট্টগ্রাম সিটি কলেজের ছাত্র বশরুজ্জামান চৌধুরী, জাফর আহমদ, দীপক বড়–য়া ও ওমরগণি এম ই এস কলেজের নৈশ বিভাগের ছাত্র মাহবুবুল আলম চৌধুরী। চারজনই ছিলেন ছাত্রলীগ ও স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা।
মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একাত্তরের ২৭ মার্চ থেকে চট্টগ্রামে পাকিস্তানি বাহিনী বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেয়। ২৮ মার্চ ডিসি হিলে ওত পেতে ছিল হানাদার বাহিনীর একটি দল। ওই চার তরুণকে বহনকারী গাড়িটি চেরাগী মোড় পার হওয়ার সময় হানাদার বাহিনীর সৈন্যরা গুলি ছুড়ে গাড়িটি থামায়। সেনাদের ইপিআরের সদস্য মনে করে জয় বাংলা স্লোগান দিতে থাকেন চার তরুণ। স্লোগান শুনেই হানাদার বাহিনী ছুড়তে থাকে মুহুর্মুহু গুলি। চার তরুণের রক্তে রক্তাক্ত হয় চেরাগী পাহাড় মোড়।
শহীদ মাহবুবুল আলম চৌধুরীর ছোট ভাই রফিকুল আলম চৌধুরী বলেন, ‘২০০৮ সালে গণমাধ্যমের খবরে আমরা জানতে পারি আমার ভাইসহ চারজন মুক্তিযোদ্ধা পাক হানাদার বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে শহীদ হন। পরে তাদেরসহ আরও ২১ শহীদকে গণকবর দেওয়া হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের খেলার মাঠের দক্ষিণ-পূর্ব পাশে। আমরা চাই এ গণকবর সংরক্ষণের মাধ্যমে আমার ভাইসহ সব শহীদের স্মৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হবে।’
চমেক কর্তৃপক্ষ, শহীদ পরিবার এবং বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্র ট্রাস্ট সূত্রে জানা যায়, ২০০৮ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে দশম ব্যাচের শিক্ষার্থী ওমর ফারুক প্রথম এ গণকবরের ইতিহাস জানান। এরপর একই বছরের ২৭ জুলাই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের দুজন মুক্তিযোদ্ধা চিকিৎসক গণকবরটি দেখতে যান। তারা মেডিকেল কলেজের পশ্চিম পাশে অবস্থিত দুজন কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলেন এবং অনুসন্ধান চালিয়ে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হন। সর্বশেষ ২০১৫ সালের ৬ ডিসেম্বর মুক্তিসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষণাকেন্দ্র ট্রাস্ট ও শহীদদের স্বজনরা গণকবরটি পরিদর্শনকালে এটি সংরক্ষণের দাবি জানান।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ৫২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মো. ইমদাদ হোসাইন বলেন, ‘চট্টগ্রামের প্রথম চার শহীদের ইতিহাস স¤পর্কে আমরাও শুনেছি। আমরা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা চাই গণকবরটি সংরক্ষণ করে চার শহীদের প্রতি সম্মান দেখানো হোক।’
বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষণাকেন্দ্র ট্রাস্ট চট্টগ্রামের চেয়ারম্যান ও চিকিৎসক মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘২০০৮ সাল থেকে আমরা অনুসন্ধান চালিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের দক্ষিণ-পূর্ব পাশে থাকা গণকবরটির বিষয়ে নিশ্চিত হই। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৬ বছর পার হলেও সংরক্ষণ করা হয়নি এ গণকবর।’
ইতিমধ্যে ওই গণকবরের ওপর নির্মাণ করা হয়েছে মার্কেট, দোকান-ঘরবাড়িসহ নানা স্থাপনা। মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘নানা মহলের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গণকবরটিতে স্মৃতিফলক নির্মাণের সম্মতি দিয়েছেন চট্টগ্রামের মেয়র। কিন্তু এখনো কেন কাজ হচ্ছে না তা বোধগম্য নয়।’
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ সেলিম জাহাঙ্গীর এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘গণকবরটি সঠিক কোন জায়গায় এখনো চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত হয়নি। আমরাও এটি সংরক্ষণ করতে চাই।’
সিটিজিসান.কম/রবি
Print This Post

