চট্টগ্রাম :: মিয়ানমার থেকে এনে রোজিয়া নামে এক নারীকে বাংলাদেশি সাজিয়ে সৌদিআরবে পাচারের চেষ্টা করেছিল চট্টগ্রাম আদালতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট জামাল হোসেন ও তার স্ত্রী। কিন্তু ইমিগ্রেশন পুলিশের হাতে ওই নারী ধরা পড়ে যাওয়ায় আইনজীবী দম্পতির চেষ্টা ভেস্তে যায়। এক পর্যায়ে সস্ত্রীক আইনজীবীও গ্রেফতার হয়।
আর সেই আইনজীবী দম্পতিকে জামিন না দেয়ায় ১৮ জানুয়ারি চট্টগ্রাম আদালতে নজিরবিহীন ভাংচুরের ঘটনা ঘটে।
গ্রেফতার হওয়া মিয়ানমারের রোজিয়া নামে ওই নারী শুক্রবার চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম নাজমুল হোসেন চৌধুরীর আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। এতে ওই আইনজীবী এবং তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে এসব তথ্য দিয়েছেন রোজিয়া। এই বিষয়ে কথা বলার জন্য সেই আইনজীবী জামাল হোসেনকে বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেও মোবাইল বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (প্রসিকিউশন) নির্মলেন্দু বিকাশ চক্রবর্তী বলেন, পতেঙ্গা থানার মানবপাচার আইনের যে মামলায় জামিন না দেয়া নিয়ে ভাংচুর হয়েছে সেই একই মামলায় একজন জবানবন্দি দিয়েছেন। বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত জবানবন্দি গ্রহণের পর ওই আসামিকে আবারও কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত।
আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে রোজিয়া জানায়, তার আসল নাম রোজিয়া। তাদের বাড়ি মিয়ানমারের মংডু উপজেলার কাউয়ার বিলে। রোজিয়া রোহিঙ্গা মুসলিম।
উকিল জামাল হোসেন বিদেশে পাঠানোর জন্য রোজিয়া নাম পাল্টে আক্তার বানু নাম দেন বলে জানায় রোজিয়া। গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশের পাসপোর্ট বানানোর জন্য রোজিয়া একবার বাংলাদেশে এসেছিল এবং জাল পাসপোর্ট বানিয়ে আবারও মিয়ানমারে ফেরত যায় বলে জবানবন্দিতে জানায় রোজিয়া।
সাত পৃষ্ঠার জবানবন্দিতে রোজিয়া জানায়, ১৬ জানুয়ারি রাতে দুজন দালালের মাধ্যমে রোজিয়া মিয়ানমার থেকে টেকনাফ দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। দুই দালালের নাম জানে না রোজিয়া। তার সঙ্গে ভাই এনায়েতও মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসে। উখিয়ায় এসে এক দালালের বাড়িতে থাকে রোজিয়া, ভাই এনায়েত এবং সঙ্গে আসা দুই দালাল।
পরদিন (১৭ জানুয়ারি) সকালে রোজিয়া ও এনায়েত এবং দুই দালাল উখিয়া থেকে বাসে চড়ে চট্টগ্রাম শহরের নগরীর পৌঁছে। এক দালাল রোজিয়াকে জানায়, চট্টগ্রাম শহরের এক উকিলের মাধ্যমে তাকে সৌদিআরব পাঠিয়ে তাকে চাকুরি দেবে। শহরে প্রবেশের পর বাস থেকে নেমে তারা একটি সিএনজি অটোরিকশায় উঠে এবং এক দালাল একজনকে ফোন করে তাদের অবস্থান জানায়। কিছুদূর যাওয়ার পর ওই দালালের নির্দেশে অটোরিক্সা রাস্তার একপাশে দাঁড়ায় এবং একজন লোক এসে চালকের পাশে বসে।
জবানবন্দিতে রোজিয়া আরও জানায়, অটোরিকশায় বসে দালাল রোজিয়ার সঙ্গে চালকের পাশে থাকা লোকের পরিচয় করিয়ে দেয়। দালাল বলে, উনার নাম জামাল হোসেন। উনি চট্টগ্রামের একজন উকিল এবং শহরের প্রভাবশালী ব্যক্তি। তার বিভিন্ন পর্যায়ের লোকদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। বিদেশে লোক পাঠানোর লোকদের সঙ্গেও তার হাত আছে।
‘দালাল আরও বলে, খুব সহজে উকিল জামাল হোসেন আমাকে সৌদিআরবে পাঠিয়ে কাজের ব্যবস্থা করে দেবে। আমরা দালালের কথা বিশ্বাস করি। দালাল আমাকে উকিলের কাছে বুঝিয়ে দিয়ে আবারও কক্সবাজারে চলে যায়। উকিল জামাল হোসেন টেক্সি ড্রাইভারকে নিউমার্কেটের জলসা মার্কেটে যেতে বলে। উকিলের কথামত কিছুদূর যাওয়ার পর টেক্সি থামায়। উকিল জামাল আমাকে ও ভাই এনায়েতকে একটি বিল্ডিংয়ের কক্ষে নিয়ে যায়।’
জবানবন্দিতে রোজিয়া আরও জানায়, ওই কক্ষে উকিল জামাল হোসেন, কক্সবাজারের দুজন লোক, ভাই এনায়েত এবং আরও দুজন লোক ছিল। বিকেল ৪টার দিকে পাশের হোটেল থেকে এনে তারা ভাত খায়। এসময় ফজলুল কাদের নামে এক লোক তাদের রুমে আসে। কিছুক্ষণ উকিল জামালের স্ত্রী ইয়াছমিন আক্তার আসে। ওই মহিলা লম্বা আকৃতির এবং গায়ের রঙ শ্যামলা। উকিল জামাল ওই মহিলাকে তার স্ত্রী বলে পরিচয় করিয়ে দেয়। এরপর উকিল জামাল ও তার স্ত্রী এবং এনায়েত ছাড়া বাকি সবাই কক্ষ থেকে চলে যায়।
‘এরপর উকিল জামাল হোসেন ওমরাহ ভিসা লাগানো একটি সৌদি আরবের একটি পাসপোর্ট আমাকে দেখিয়ে বলে, এখানে তোমার ভিসা-পাসপোর্ট সব আছে। এটা নিয়ে তুমি বিদেশ যাবে। সে আরও বলে আমার নাম যেন আক্তার বানু বলি এবং পিতার নাম বাদশা মিয়া বলি। ফজলুল কাদেরকে শিখিয়ে দেয়া হয় তিনি যেন আমাকে খালা বলেন। আমাকে নিজের নাম, বাবার নাম এবং ফজলুল কাদেরকে বিষগুলো ভালভাবে মুখস্ত করার জন্য বলেন উকিল জামাল।’
জবানবন্দিতে রোজিয়া আরও জানায়, বিকেল ৫টার দিকে উকিল জামাল ফজলুল কাদেরকে পাসপোর্ট দিয়ে তাকে এয়ারপোর্ট চলে যেতে বলে। ফজলুল কাদের পাসপোর্ট নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে যায় এবং এয়ারপোর্টে দেখা হবে বলে জানায়। কিছুক্ষণ পর উকিল জামাল ও তার স্ত্রী এবং রোজিয়া ও তার ভাই এনায়েত রুম থেকে বের হয়ে রাস্তায় একটি সিএনজি অটোরিকশা ঠিক করে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। উকিল চালকের পাশে এবং বাকি তিনজন পেছনের সিটে বসে। ঘণ্টখানেক পর এয়ারপোর্টে পৌঁছে উকিল জামাল ফজলুল কাদেরের মোবাইলে ফোন দেয়। কিছুক্ষণের মধ্যে এয়ারপোর্টের বাইরে ফজলুল কাদেরের সঙ্গে তাদের দেখা হয়।
‘এরপর উকিল জামাল আমাকে ও ফজলুল কাদেরকে দুটি ভিজিটিং কার্ড দিয়ে তার স্ত্রীসহ মিলে আমাদের দুজনকে এয়ারপোর্টে ঢুকিয়ে দেয়। বলে, বিমান ছাড়লে আমাকে কনফার্ম করিও। আমি ও ফজলুল কাদের ভেতরে ঢুকি। উকিল জামাল তার স্ত্রীকে নিয়ে বাইরে অপেক্ষায় থাকে। আমি ফজলুল কাদেরের পেছনে লাইনে দাঁড়াই এবং দুজনের বোর্ডিং পাস নিয়ে রাত ১০টার ফ্লাইটের জন্য ইমিগ্রেশনে আসি।’
জবানবন্দিতে রোজিয়া জানায়, ইমিগ্রেশনের লোকজন তাদের সন্দেহ করে আটক করে। রোজিয়া উকিল জামালকে ফোন করে আটক হওয়ার বিষয়টি জানায়। এসময় উকিল জামাল রোজিয়াকে কি যেন জানাবে বলে ফোন কেটে দেয়। এরপর উকিল জামাল আর ফোন ধরেনি। ঘণ্টাখানেক পর পুলিশ এয়ারপোর্টে গিয়ে রোজিয়া ও ফজলুল কাদেরকে থানায় (পতেঙ্গা) নিয়ে যায়। থানায় নেয়ার পর পুলিশ মামলা লিখে ফেলে।
ইমিগ্রেশন ও থানা থেকে র্যাবকে বিষয়টি জানাতে শুনেন রোজিয়া। এর ঘণ্টা দুয়েক পর উকিল জামাল ও তার স্ত্রী ইয়াসমিনকে আটক করে র্যাব থানায় নিয়ে যায় বলে তথ্য দিয়ে জবানবন্দি শেষ করেন রোজিয়া।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, জবানবন্দি দেয়ার এক পর্যায়ে রোজিয়া কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে এবং দালাল ও উকিল জামালের মাধ্যমে সে প্রতারিত হয়েছে বলে আদালতকে জানান।
গত ১৭ জানুয়ারি রাতে ইমিগ্রেশন পুলিশের এসআই মো.শহীদুল ইসলাম বাদি হয়ে নগরীর পতেঙ্গা থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। পরদিন উকিল ও তার স্ত্রী এবং রোজিয়া ও ফজলুল কাদেরকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। তাদের পাঁচদিনের রিমান্ডে নেয়ার আবেদন জানান তদন্তকারী কর্মকর্তা পতেঙ্গা থানার এসআই প্রকাশ প্রণয় দে।
চট্টগ্রামের অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম সাহাদাৎ হোসেন ভূঁইয়া তাদের রিমান্ড ও জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন। জামিন নামঞ্জুরের সঙ্গে সঙ্গেই বিক্ষোভে নামেন আইনজীবীরা। এসময় বিচারকের এজলাস এবং খাস কামরার জানালায় ভাংচুর হয়। কয়েকজন আইনজীবী বাংলানিউজের সিনিয়র ফটোকরেসপন্ডেন্ট উজ্জ্বল কান্তি ধরকে লাঞ্চিত করে ক্যামেরা কেড়ে নেয়। আইনজীবীদের নজিরবিহীন এই বিক্ষোভের মুখে আরেকটি আদালতে শুনানি করে একইদিন সন্ধ্যায় ওই আইনজীবী এবং তার স্ত্রীকে জামিন দেয়া হয়।
২৩ জানুয়ারি আদালতে ভাংচুরের ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলকে চিঠি দেয় সুপ্রিম কোর্ট। সেই চিঠিতে ভাংচুরের ঘটনায় দায়ী হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের চিঠিতে যাদের নাম এসেছে তারা হলেন, আইনজীবী জান্নাতুল ফেরদৌস মুক্তা, চন্দন বিশ্বাস, সাকিল, আউয়াল খান, টি আর খান, প্রদীপ দাশ, শিবলী, মাসুদ পারভেজ, মুস্তাফিজ।-বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম।
সিটিজিসান.কম/রবি
Print This Post

