চট্টগ্রাম ::
৬ আগস্ট নগর বিএনপির আংশিক কমিটি ডা. শাহাদাত হোসেনকে সভাপতি করে গত বছরের ঘোষণার পর ডিসেম্বরের মধ্যেই দলকে ঘুরে দাঁড় করানোর কথা বলেছিলেন উজ্জীবিত এ নেতা। চার মাস পেরিয়ে গেছে, কিন্তু ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি চট্টগ্রাম বিএনপি। তবে দল কিছুটা গুছিয়ে এনেছেন নতুন সভাপতি।
এই দাবি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও অনেকে ৫ জানুয়ারির সমাবেশের উদাহরণ দেন। ওই দিন ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ পালন করে চট্টগ্রাম বিএনপি, আর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ করে ‘গণতন্ত্র রক্ষা দিবস’-এর কর্মসূচি। চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের লালদীঘি ময়দানের সমাবেশের চেয়ে বিএনপির কার্যালয়ের সামনের সমাবেশে নেতাকর্মীর উপস্থিতি ছিল অনেক বেশি।
সমাবেশের এই উপস্থিতিকে ঘুরে দাঁড়ানো কিংবা দল গোছানো মানতে নারাজ নতুন কমিটির বিরোধী পক্ষের নেতারা। এমন এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ডা. শাহাদাত হোসেন চট্টগ্রামে বিএনপিকে গুছিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর যে স্বপ্ন দেখেছেন, তাতে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। তিনি এখনো নগর থেকে ওয়ার্ড পর্যন্ত একটি কমিটি গঠনের কাজও করতে পারেননি।’ এ জন্য অবশ্য তিনজনের কমিটিও একটি কারণ বলে মনে করেন ওই বিরোধী নেতা। বলেন, ‘এ কমিটি দিয়ে বিএনপি আর কত দিন পার করবে?’
এর আগে ছয়জনের নগর কমিটি দিয়ে সাত বছর পার করে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি। এখন চলছে তিনজনের কমিটি দিয়ে, যার সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন। তারা ভেঙে দেওয়া ওয়ার্ড কমিটি গঠন শেষ করতে পারেননি এখনো। এমনকি মহানগরের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের প্রস্তাব কেন্দ্রে পাঠালেও তার অনুমোদন মেলেনি।
এর কারণ কেন্দ্রের নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ‘এক নেতার এক পদ’ নীতি অনুসরণ করা হয়নি এ কমিটি গঠনে। ফলে কেন্দ্র থেকে ফেরত পাঠানো হয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব। এতে হতাশ হয়ে পড়েন ডা. শাহাদাত হোসেন নিজেও।
ঘুরে দাঁড়াতে না পারা কিংবা বিভিন্ন কমিটি গঠন না হওয়া সম্পর্কে ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘দলে নেতাকর্মীদের বিভক্তি এবং সরকারদলীয়দের হামলা-মামলার কারণে ওয়ার্ড পর্যায়ের কমিটি গঠন পুরোপুরি শেষ করতে পারিনি। তবে ওয়ার্ড কমিটি গঠনের শেষ পর্যায়ে রয়েছি। এর মধ্যে নগর কমিটি গঠন করে পাঠালেও তা ‘এক নেতার এক পদ’ নীতি অনুসরণের শর্ত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সেটি অনুমোদন দেয়নি কেন্দ্র। ফলে আমরা পিছিয়ে পড়েছি।’
এ অবস্থায় করণীয় সম্পর্কে নগর সভাপতি বলেন, ‘এক নেতার এক পদ অনুসরণের শর্ত বাস্তবায়ন করে কমিটি গঠন করতে হলে আগে ওয়ার্ড পর্যায়ের সব কমিটি গঠন শেষ করতে হবে। তাতে আমাদের আরও বেশ কিছুদিন সময় লাগতে পারে। এরপর নগর কমিটি ও উত্তর-দক্ষিণ জেলা কমিটি গঠন সম্পন্ন হলে চট্টগ্রামে বিএনপি অবশ্যই ঘুরে দাঁড়াবে।’
চট্টগ্রাম বিএনপির অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে নেতাকর্মীরা জানান, বিএনপি ক্ষমতা ছড়ার পর থেকে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপি মৃতপ্রায়। দক্ষিণেও বিরোধ কাটছে না প্রতিষ্ঠার পর থেকে। যুবদলের গ্রুপিং-অস্থিরতা তো আছেই। ছাত্রদলের রাজত্ব দখল করে আছে বুড়ো অছাত্ররা। সব মিলিয়ে শনির রাহু ভর করেছে চট্টগ্রাম বিএনপিতে।
এদিকে কেন্দ্রীয় কমিটিতে আশানুরূপ পদ না পেয়ে ক্ষোভ বয়ে বেড়াচ্ছেন চট্টগ্রামের দুই নেতা আবদল্লাহ আল নোমান ও খন্দকার গোলাম আকবর। এ নিয়ে দিকহারা চট্টগ্রাম বিএনপি তৃণমূল পর্যায়ের নেতারাও।
তৃণমূল নেতাদের অভিমত, সিনিয়র নেতাদের পদ নিয়ে যদি এ রকম টালবাহানা হয় তাহলে জুনিয়ররা যাবে কোথায়। শুধু তা-ই নয়, তিনজনের নগর কমিটিতেও রয়েছে বিরোধ। এ তিনজনের মধ্যে নগর কমিটির সহসভাপতি আবু সুফিয়ানও আশানুরূপ পদ না পেয়ে দলীয় কার্যক্রম থেকে দূরে সরে আছেন।
এক সময়ের ‘বিএনপির ঘাঁটি’ হিসেবে খ্যাত চট্টগ্রামের ডজন খানেক কেন্দ্রীয় বিএনপি শীর্ষপর্যায়ে ছিলেন। বর্তমানে দু-একজন ছাড়া কেন্দ্রে চট্টগ্রামের নেতারা অনেকটা কোণঠাসা। চট্টগ্রাম বিষয়ে বেগম খালেদা জিয়ার সবচেয়ে আস্থাভাজন ছিলেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও আবদুল্লাহ আল নোমান।
চট্টগ্রামের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত এলে এ দুই নেতার পরামর্শের মাধ্যমে হতো। কিন্তু এবার চট্টগ্রাম নগর কমিটি ঘোষণার সময় সেটি অনুসরণ করা হয়নি। এটি মানতে পারেননি আবদুল্লাহ আল নোমান। তিনি নিজের ব্যাপারে যতটুকু হতাশ হয়েছেন, তার চেয়ে বেশি হতাশ নগর কমিটি নিয়ে।
এর আগে ২০১০ সালে সাত সদস্যের কমিটি গঠন করা হলেও ২০১১ সালে দস্তগীর চৌধুরী মারা গেলে ছয়জনের কমিটি দিয়ে সাত বছর পার হয়। এবারের তিনজনের কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় বিএনপি ভুল করেছে বলে দাবি করেন আবদুল্লাহ আল নোমান।
তবে কমিটির ব্যাপারে সভাপতি ডা. শাহদাত হোসেন জানান, ‘গত কমিটি সাত বছর পার করলেও এবারের কমিটি খুব শিগগির হবে। আমরা চেষ্টা করব মিলেমিশে কাজ করতে। তবে বিএনপি বড় দল, কিছুটা সমস্যা তো থাকবেই।’
ঘুরে দাঁড়াতে না পারার আরো কারণ :
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি জাফরুল ইসলাম চৌধুরী ও সাধারণ স¤পাদক গাজী শাহজাহান জুয়েলকে কেন্দ্রীয় কমিটিতে কোনো পদ দেয়া হয়নি। এ দুজনের মধ্যে বিরোধ চলছে চার বছর ধরে। এ কারণে বিপর্যস্ত দক্ষিণ জেলা বিএনপি।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপিতে আরো বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা রয়েছেন- সাবেক সভাপতি আহমদ খলিল খান, বর্তমান সহ-সভাপতি ও সাবেক সাংসদ সরওয়ার জামাল নিজাম। কেন্দ্রীয় বিএনপিতে মূল্যায়ন করা হয়নি বলে চাপা ক্ষোভ আছে তাদের মধ্যে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জাফরুল ইসলাম চৌধুরী জানান, ‘দলের চেয়ারপারসন যা ভালো মনে করেছেন, সেভাবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এখানে আমার কিছু বলার নেই। আমি জিয়ার সৈনিক। দলের কাজ করে যাব। তবে দক্ষিণ জেলা বিএনপিকে ঢেলে সাজাতে কেন্দ্রের উদ্যোগ নেয়া উচিত।’
চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপি একসময় সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর পরিবারের নিয়ন্ত্রণ থাকলেও পরে আসলাম চৌধুরীকে দায়িত্ব দেয়া হয়। কিন্তু ভারতে কথিত মোসাদ নেতার সঙ্গে বৈঠকের অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার ও জেলে পাঠালে আরো বিপর্যস্ত হয়ে পরে উত্তর জেলা বিএনপি।
সিটিজিসান.কম/রবি
Print This Post

