ধরাছোঁয়ার বাইরে ৬ ‘জঙ্গি’, খুঁজছে পুলিশ

আপডেট: ৭ জানুয়ারী ২০১৭ ২:৪৯ অপরাহ্ন

image-15284

অনলাইন ডেস্ক :: গুলশানের হলি আর্টিজান হামলার পর পুলিশের জঙ্গিবিরোধী অভিযানে এখন পর্যন্ত সন্দেহভাজন ৩১ জঙ্গি নিহত হয়েছে। পুলিশ বলছে, নেতৃত্বে থাকা ‘জঙ্গি’রা নিহত হওয়ার পর ভেঙে গেছে জঙ্গিদের আতুড়ঘর। তবে নির্মূল হয়নি জঙ্গিরা। খোঁজা হচ্ছে আরো ছয় শীর্ষ জঙ্গিকে।

পুলিশের গত ছয় মাসের অভিযানে নিহত জঙ্গিদের মধ্যে কমান্ডিং ও প্রশিক্ষক পর্যায়ের বেশ কজন রয়েছেন। তাদের মধ্যে আছেন তামিম চৌধুরী, মেজর মুরাদ, সারোয়ার জাহান, তানভীর। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার রাতে পুলিশের অভিযানে মারা যান নুরুল ইসলাম মারজান ও তার সহযোগী সাদ্দাম হোসেন।

পুলিশের ভাষ্য, একের পর এক অভিযানে জঙ্গিদের নিহত ও গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনায় তাদের মনোবল অনেকটাই ভেঙে গেছে। নেতৃত্ব পর্যায়ের আরো যে ছয়জন এখনো পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে, তাদের ধরতে পারলে জঙ্গি নির্মূল অনেকটাই এগিয়ে যাবে। পুলিশের তালিকার এই ছয়জন হলেন- মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক, মাইনুল ইসলাম মুসা, রাজীব গান্ধী ওরফে সুভাষ গান্ধী, বাশারুজ্জামান চকলেট, রিপন ও খালেদ। ইতিমধ্যে তাদের বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেছে পুলিশ।

‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ মুসা
‘বাংলা ভাই’ নামে পরিচিত জেএমবি নেতা সিদ্দিকুল ইসলামের হাত ধরে এক যুগের বেশি সময় আগে জঙ্গিবাদে জড়ান নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতা মাঈনুল ইসলাম ওরফে মুসা। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারে আসার পর ২০০৪ সালে পুরনো জেএমবি রাজশাহীর বাগমারা, নওগাঁর আত্রাই, রানীনগর ও নাটোরের নলডাঙ্গার বিস্তৃত অঞ্চলে ত্রাস ছড়িয়ে জঙ্গি নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করে।

ওই সময়ের মাঈনুলই এখনকার মুসা। তাহেরপুর ডিগ্রি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময় জেএমজেবির সঙ্গে জড়ান বাগমারার গণিপুর ইউনিয়নের বজ্রকোলা গ্রামের মসজিদের সদ্যপ্রয়াত মুয়াজ্জিন আবুল কালাম মোল্লার ছেলে মাঈনুল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান শুরু হলে বাংলা ভাইয়ের মতো আত্মগোপনে চলে যান মাঈনুলও। আত্মগোপনে থেকে পরে রাজশাহী কলেজে ভর্তি হন তিনি। তারপর সেখান থেকে ঢাকা কলেজে পড়াশোনা করেন। চলতি বছরের শুরুতে উত্তরার একটি স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন নব্য জেএমবির এই নেতা।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে ঢাকার মিরপুরের রূপনগরে পুলিশের অভিযানে নিহত নব্য জেএমবির শীর্ষপর্যায়ের নেতা সেনাবাহিনী থেকে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জাহিদুল ইসলাম। তার মেয়ে ওই স্কুলেই পড়ত। মাঈনুল ইসলাম মুসার স্ত্রী তৃষ্ণামনি ওরফে উম্মে আয়েশা পুলিশকে বলেছেন, মুসা এখন ঢাকার আশপাশেই অবস্থান করছেন।

মেজর জিয়া

রাজধানীর গুলশান, কল্যাণপুর ও শোলাকিয়া হামলার ‘মাস্টারমাইন্ড’ তামিম চৌধুরী এবং সেনাবাহিনীর চাকরিচ্যুত মেজর জিয়াউল হককে ধরিয়ে দিলে ২০ লাখ টাকা পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছিল পুলিশ। নারায়ণগঞ্জে এক অভিযানে মারা যান তামিম। মেজর জিয়াউল হক এখনো অধরা।

জিয়াউলের হকের পুরো নাম সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হক। তার বাবার নাম সৈয়দ মোহাম্মদ জিল্লুল হক। বাড়ি মৌলভীবাজারের মোস্তফাপুরে। সর্বশেষ ব্যবহৃত বর্তমান ঠিকানা পলাশ, মিরপুর সেনানিবাস, ঢাকা।

মূলত সেনাবাহিনীতে একটি ব্যর্থ অভ্যুত্থানচেষ্টার পর ২০১২ সালে আলোচনায় আসেন মেজর সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হক। অভ্যুত্থানচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর জিয়ার আর কোনো সন্ধান মেলেনি। তাকে ধরতে সে সময় পটুয়াখালী শহরের সবুজবাগ এলাকায় তার শ্বশুর মোখলেছুর রহমানের বাসায় দফায় দফায় অভিযান চালায় পুলিশ। রাজধানীর কয়েকটি স্থানেও জিয়ার খোঁজে চলে অভিযান। সব কটি অভিযান ব্যর্থ হয়। আজও জিয়া রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি সেনা সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সেনাবাহিনীর সাবেক ও বর্তমান কিছু সদস্য দেশের গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত এবং সেনাবাহিনীতে অভ্যুত্থানের চেষ্টা করেছিলেন। ২০১১ সালের ১৩ ডিসেম্বর এই চক্রান্ত সেনাবাহিনী জানতে পারে। ১৯ জানুয়ারি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আরো বলা হয়েছিল, এ ঘটনার সঙ্গে সেনাবাহিনীর মধ্যম পর্যায়ের ১৪ থেকে ১৬ কর্মকর্তা জড়িত থাকতে পারেন। মেজর জিয়া হিযবুত তাহরীরের সঙ্গে জড়িত বলে জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে।

রাজীব গান্ধী
রাজীব গান্ধী ওরফে সুভাষ গান্ধী ওরফে গান্ধী নব্য জেএমবির উত্তরবঙ্গের কমান্ডার ছিলেন। গুলশান ও শোলাকিয়ার হামলায় তিনি লোকবল জোগান দিয়েছিলেন পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে।

বাশারুজ্জামান চকলেট
বাশারুজ্জামান চকলেট নব্য জেএমবির শীর্ষ কমান্ডারদের অন্যমত। সর্বশেষ র‌্যাবের প্রকাশিত নিখোঁজের তালিকার ১৮ নম্বরে ছিল বাশারুজ্জামান ওরফে চকলেট বাশার ওরফে চকলেটের নাম। তার গ্রামের বাড়ি রাজশাহীর তানোর উপজেলার লালপুরে। তিনি ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার নিখোঁজের ঘটনায় কলাবাগান থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) রয়েছে। গত বছরের ৫ জানুয়ারি থেকে তিনি নিখোঁজ। চকলেট দেশেই আছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।

রিপন ও খালেদ
রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক রেজাউল করিম হত্যার পর গত বছরের এপ্রিলের শেষ দিকে ভারত পালিয়ে যান রিপন ও খালিদ। তারা আর দেশে আসেনি। রেজাউল করিম হত্যার সঙ্গে এ দুজন জড়িত বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের বিশেষ শাখা কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ইউনিটের অতিরিক্ত উপকমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, এখন বাশারুজ্জামান চকলেটসহ পাঁচ-ছয়জন জঙ্গি বাইরে রয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার ঘটনাটি একটি লার্জার পিকচার। হলি আর্টিজানে যারা ঢুকেছিল এবং যারা পেছনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে তাদের পরিচয় নিশ্চিত হয়েছি। কেউ কেউ ধরা পড়েছে। অভিযানে নিহত হচ্ছে। কেউ গ্রেপ্তার হচ্ছে।

মনিরুল বলেন, গুলশান ও শোলাকিয়ার ঘটনার পর চারটি অভিযানে আবু রায়হান তারেক কল্যাণপুরে নিহত হয়েছে। সে গুলশানের হামলাকারীদের প্রশিক্ষক ছিল। রিগ্যান নামে একজনকে আমরা জীবিত ধরেছি। সে কোরআনের শিক্ষা দিত। এ ছাড়া মিরপুরের রূপনগরে কথিত মেজর মুরাদ পুলিশি অভিযানে মারা গেছে। সেও প্রশিক্ষক ছিল। মূলত গুলশান ও শোলাকিয়ার প্রশিক্ষক ছিল মুরাদ ও তানভীর। সবকিছুর সমন্বয়ক ছিল তামীম চৌধুরী। সেও নারায়ণগঞ্জে মারা গেছে। আরেকজন বসুন্ধরায় বাসা ভাড়া নিয়েছিল আবদুল করীম নামে। সেও আজিমপুরে মারা গেছে। আরও কিছু নাম আসছে।

নব্য জেএমবির ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ শক্তি খর্ব করা হয়েছে উল্লেখ করে মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘ইতোমধ্যে চারটি ঘটনায় নব্য জেএমবির কমান্ডিং পর্যায়ের নেতা, সমন্বয়কারী এবং প্রশিক্ষক নিহত হয়েছে। এর মধ্যে কল্যাণপুরের অভিযানে চারজন কমান্ডিং পর্যায়ের নেতা, মিরপুরের রূপনগরে প্রশিক্ষক জাহিদুল ইসলাম (মেজর মুরাদ), জঙ্গিদের জন্য বিভিন্ন জায়গায় বাসা ভাড়া করে দেওয়ার সমন্বয়কারী জঙ্গি তানভীর (করিম) এবং মূল সমন্বয়কারী তামিম চৌধুরী নারায়ণগঞ্জে নিহত হয়েছে।’

এখনো এই জঙ্গি সংগঠনের কমান্ডিং পর্যায়ের বেশ কয়েকজন বাইরে রয়েছে জানিয়ে মনিরুল ইসলাম বলেন, তাদের ধরতে অভিযান চলতে থাকবে। খবর ঢাকাটাইমসের।

সিটিজিসান.কম/রবি

Print This Post Print This Post