রাঙ্গুনিয়ায় পাহাড় কেটে সাবাড় করছে চট্টগ্রাম ওয়াসা

আপডেট: ১৫ ডিসেম্বর ২০১৬ ৬:২৪ অপরাহ্ন

6

জগলুল হুদা, রাঙ্গুনিয়া করেসপন্ডেন্ট :: চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার উপজেলার চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কের পাশে গোডাউন এলাকায় সরকারি মালিকানাধীন একটি পাহাড়ের বুক কেটে সাবাড় করছে চট্টগ্রাম ওয়াসা কর্তৃপক্ষ। কর্ণফুলি পানি সরবরাহ প্রকল্পের পেইজ-২ এর সার্স ট্যাংক স্থাপনের জন্য বিশাল একটি পাহাড় কেটে সমতলে পরিণত করলেও পরিবেশ অধিদপ্তর কিংবা প্রশাসনের কোন ধরণের অনুমতি নেননি ওয়াসা কর্তৃপক্ষ।

স্থানীয় প্রশাসন পাহাড় কাটতে নিষেধ করে বাঁধা দিলেও তোয়াক্কা না করে দিনেরাতে সমানতালে পাহাড়টির বুকে স্কেবেটরের কোপ থামানো যায়নি। চায়না ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কোবতা কোলন ওয়াসার হয়ে পাহাড়টি কাটছেন বলে স্থানীয়রা জানান।

ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়ক সংলগ্ন সরকারি মালিকানাধীন এই পাহাড়টির এক তৃতীয়াংশ স্কেবেটর দিয়ে কেটে ফেলা হয়েছে। কাপ্তাই সড়কের পাশে পলিথিনের ঘেরা দিয়ে ভেতরে দিনেরাতে সমান তালে পাহাড় কাটলেও দেখার যেন কেউ নেই।

স্থানীয় প্রভাবশালী একটি গ্রুপকে ম্যানেজ করে দিনেরাতে পাহাড়টি কেটে সাবাড় করছে ওয়াসার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানটি। পাহাড়টির কোলে বসবাসকারী কয়েকটি দরিদ্র পরিবারও আতঙ্কের মধ্যে দিনাতিপাত করছেন। সরকারি এসব পাহাড়ে বসবাসকারী নিম্ম আয়ের একটি পরিবারের বসত ঘরের দুই পাশ ইতিমধ্যেই কেটে ফেলা হয়েছে। তাদেরকে বসতঘর ফেলে অন্যত্র চলে যেতেও চাপ সৃষ্টি করছেন প্রভাবশালী চক্রটি। বসতঘরটির দুই পাশে খাড়া করে স্কেবেটর দিয়ে এমনভাবে পাহাড়টি কাটা হয়েছে যাতে যেকোন সময় পাহাড়ের মাটি ধ্বসে পড়ে বসতঘরটি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ভয়ের মধ্যেই পরিবারটি রাত কাটান বলে বাসিন্দা নুরজাহান বেগম জানান।

পাহাড়টির একাংশ সরকারি ১ নং খাস খতিয়ান ভুক্ত হলেও বাকিটা বনবিভাগের জমি বলে জানা গেছে। স্থানীয় প্রশাসনের বাঁধা উপেক্ষা করে পাহাড় কেটে সাবাড় করায় গতকাল বুধবার পাহাড় কাটার কাজে ব্যবহৃত স্কেবেটরটি জব্দ করা হয়েছে। রাঙ্গুনিয়া উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভুমি) উম্মে কুলসুম পাহাড় কাটা বন্ধ করে দিয়ে স্কেবেটরটি জব্দ করেছেন।

চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়ক সংলগ্ন রাঙ্গুনিয়ার গোডাউন এলাকায় পাহাড়ের যেই স্থানটি স্কেবেটর দিয়ে কাটছেন সেটা ওয়াসার জমি নয় এবং পাহাড়টি কাটার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরে আবেদন করা হলেও অনুমোদন নেননি বলে স্বীকার করেছেন কোবতা কোলনের প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ার হাছান জাহেদ।

উপজেলা ভুমি অফিস সুত্র জানায়, জেলা প্রশাসনের বন্দোবস্ত মামলা নং- ৬/ ০৯-১০ সাল মূলে রাঙ্গুনিয়া উপজেলার নোয়াগাঁও মৌজার চট্টগ্রাম কাপ্তাই সড়কের গোডাউন পাহাড় সংলগ্ন ১ নং খাস খতিয়ানের বিএস ৪৭০৫ দাগের সাড়ে ৭ শতক অকৃষি শ্রেণীর জমি ৫ লাখ ৬২ হাজার ৫’শ টাকার সেলামিতে ওয়াসা কতৃপক্ষ বন্দোবস্ত নেন। সেখানে তারা কর্ণফুলি পানি সরবরাহ প্রকল্প-১ এর একটি সার্স ট্যাংক স্থাপন করেন। মোট আঠার শতকের এই বিএস খাস খতিয়ানের দাগটির বাকি অংশসহ পাশে রয়েছে বিশাল এক পাহাড়। পাহাড়টির সিংহভাগ জায়গা বনবিভাগের। ওয়াসা কর্তৃপক্ষ তাদের বন্দোবস্ত নেয়া জমির বাইরে গিয়ে কর্ণফুলি পানি সরবরাহ প্রকল্প পেইজ-২ এর আরেকটি সার্স ট্যাংক স্থাপনের জন্য নতুন ভাবে পাহাড় কেটে সমতল করছেন।

গত এক সপ্তাহ ধরে রাঙ্গুনিয়ার গোডাউন এলাকায় প্রকাশ্যে পাহাড় কাটার দৃশ্য দেখে স্থানীয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানালে তিনি পাহাড় কাটার সাথে জড়িত ওয়াসার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের ডেকে পাঠান।

প্রথমে তারা পাহাড়টির বন্দোবস্ত ও পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন নেয়া হয়েছে জানালেও তারা কোন কাগজ পত্রই দেখাতে পারেননি। তারা বন্দোবস্ত নেয়ার যে কাগজটি উপস্থাপন করেন সেটা সরেজমিনে মেপে দেখা যায় তাদের জমি তাদের দখলেই আছে। পাশের পাহাড়ি জায়গাটি অবৈধ ভাবে কেটে সাবাড় করছেন।

রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামাল হোসেন সিটিজিসান.কমকে জানান, খবর পেয়ে পাহাড় কাটার সাথে জড়িতদের ডাকা হয়েছিল। পর্যালোচনা করে দেখা যায় তাদের বন্দোবস্তি নেয়া সাড়ে সাত শতক জমি আগেই তারা ব্যবহার করেছেন। এখন যেখানে পাহাড় কাটছেন সেখানে তাদের কোন জমি নেই। তাছাড়া জমি ওয়াসার হলেও পাহাড় কাটার কোন সুযোগ নেই। তাই এসিল্যান্ডকে পাঠিয়ে কাজ বন্ধ করে দেয়া হয়।

চায়না ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কোবতা কোলন এর প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ার হাছান জাহেদ পাহাড় কাটার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, বন্দোবস্ত নেয়া সাড়ে সাত শতক জায়গায় একটা সার্স ট্যাংক স্থাপন করা হয়েছে। কর্ণফুলি পানি সরবরাহ প্রকল্পের পেইজ-২ এর জন্য একই স্থানে আরো একটা সার্স ট্যাংক স্থাপন করতে হবে। সেজন্য আমাদেরকে বন্দোবস্ত নেয়া জমির এরিয়ার বাইরে যেতে হয়েছে। পাহাড়টির মাটি পরীক্ষা করে দেখা যায় অত্যন্ত নাজুক অবস্থা। যেকোন সময় পাহাড়টি ধ্বসে পড়তে পারে। পাহাড়ের মাটি ধ্বসে পড়লে সার্স ট্যাংক ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে দাবী করে তিনি বলেন, আমরা পাহাড়টি ড্রেসিং করছি।

তবে পরিবেশ অধিদপ্তরে আবেদন করলেও তারা এখনো অনুমতি দেননি। বর্ষার আগে কাজ শেষ করার জন্য পাহাড়টি কাটা শেস করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।

রাঙ্গুনিয়া উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভুমি) উম্মে কুলসুম সিটিজিসান.কমকে জানান, পাহাড়টির যেখানে কাট হচ্ছে সেটা সরকারি জায়গা। পাহাড় কাটা বন্ধ রাখতে দুইদিন আগেও তাদের বাঁধা দেয়া হয়েছে। কিন্তু তারা বাঁধা ডিঙ্গিয়ে সমানতালে পাহাড় কাটছিল। তাই আজ পাহাড় কাটার কাজে ব্যবহৃত স্কেবেটরটি জব্দ করা হয়। এবিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে তিনি জানান।

সিটিজিসান.কম/তানিন

Print This Post Print This Post