মুজিব চেয়ারম্যানের প্রত্যয়নে ২০০ রোহিঙ্গা হয়েছে ভোটার

‘রোহিঙ্গা নেতা’ লড়তে চান ইউপি নির্বাচনে, সঙ্গ দিচ্ছেন মেয়র মুজিব

নিজস্ব প্রতিবেদক | আপডেট : ২৮ আগস্ট, ২০২১ শনিবার ১০:০০ এএম

রোহিঙ্গা নাগরিক নাঈমুল ইসলাম। মিয়ানমারের অধিবাসী তিনি। বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির অভিযোগে দুদকের মামলা খেয়ে ‘পলাতক’ রয়েছেন তিনি। এর পরেও দৌঁড়ঝাপ চালাচ্ছেন ইউপি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য। আর এই রোহিঙ্গা নেতাকে সঙ্গ দিচ্ছেন কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পৌর মেয়র মুজিবুর রহমান।

রোহিঙ্গা নেতা নাঈমুল ইসলাম কক্সবাজার জেলার সদর থানার ইসলামাবাদ এলাকার বাসিন্দা জালাল আহমদের ছেলে। সম্প্রতি ইসলামাবাদ এলাকার ৮ নম্বর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য দৌঁড়ঝাপ চালাচ্ছেন তিনি।

গত একমাস আগের কথা। ২৯ জুলাই ইসলামাবাদ এলাকায় বন্যাকবলিত মানুষের খোঁজ নিতে যান কক্সবাজার পৌরসভার মেয়র মুজিবুর রহমান। সেখানে এলাকার লোকজন নিয়ে আগে থেকে উপস্থিত ছিলেন রোহিঙ্গা নেতা নাঈমুল ইসলাম ও তার ভাই তৈয়ব জালাল। তারা দুজনই এনআইডি জালিয়াতির দায়ে দুদকের মামলায় অভিযুক্ত। তাদের সঙ্গে ছিলেন বর্তমানে ৮ নম্বর ইউনিয়নের মেম্বার শুক্কুরও। সেখানে যাওয়ার পরই মেয়র মুজিবের সঙ্গে করর্মদন করেন নাঈমুল ইসলাম। শুধু তাই নয়, বিশাল এ গণউপস্থিতিতে রোহিঙ্গা নেতা নাঈমুল ইসলামকে সামনের ইউপি নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে পরিচয় করানো চেষ্টা করেন মেয়র মুজিব।

এর আগে ২০১৮ সালের ৭ এপ্রিল সাতজন রোহিঙ্গাকে ‘আওয়ামী লীগের কর্মী’ দেখিয়ে প্রত্যয়নপত্র দেন কক্সবাজার জেলার পৌরসভার মেয়র মুজিবুর রহমান। কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের প্যাডেই দেওয়া হয়েছে সেই সনদ। এই সাত রোহিঙ্গাকে ‘আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত’ বলে ওই প্রত্যয়নপত্রে উল্লেখ করা হয়। এর মাধ্যমে প্রত্যেকে পেয়েছেন বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও স্মার্ট কার্ড। পরে ওই সাতজনের জাতীয় পরিচয়পত্র দেখিয়ে ভোটার হয়েছেন আরও ২০০ রোহিঙ্গা। একই সঙ্গে পাসপোর্টও বানিয়ে নিয়েছেন অনেকে।— এমনটাই জানা গেছে দূদক সূত্রে৷

প্রত্যয়নপত্র পাওয়া সাত রোহিঙ্গা নাগরিক হলেন— কক্সবাজার সদর থানার আউলিয়াবাদ এলাকায় অবস্থানরত মৃত আহম্মদ হোসেনের পুত্র জালাল আহমদ, জালাল আহমদের পুত্র মোহাম্মদ ইয়াহিয়া, জালাল আহমদের পুত্র মোহাম্মদ ওয়ারেস, জালাল আহমদের পুত্র মোহাম্মদ তৈয়ব, জালাল আহমদের মোহাম্মদ রহিম, জালাল আহমদের পুত্র মোহাম্মদ নাঈম এবং একই এলাকার মৃত মোহাম্মদ সোয়াইবের পুত্র নুরুল আলম।

এরপরই ২০২১ সালের ১৭ জুন দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-২ এর উপসহকারী পরিচালক মো. শরীফ উদ্দিন বাদি হয়ে ১৩ রোহিঙ্গাকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন। ১৩ আসামির মধ্যে মো. নাঈমুল ইসলাম ও তৈয়ব জালালের নাম এজাহারে উল্লেখ রয়েছে। তারা দুই ভাই।

দূদক সূত্রে আরও জানা গেছে, কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পৌর মেয়র মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা গেছে, এনআইডি জালিয়াতির ঘটনায় হয়েছে মোটা অংকের আর্থিক লেনদেন। এ ঘটনায় মুজিবুর রহমান, কক্সবাজার জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অঢেল সম্পদের খোঁজে তদন্ত শুরু করেছে দুদক।

এলাকাবাসীর অভিযোগ— সামনের নির্বাচনে দল ভারী করতে রোহিঙ্গা নেতার সঙ্গে আঁতাত করছেন পৌর মেয়র মুজিবুর রহমান। এছাড়া নিজের পকেট ভরতে রোহিঙ্গাদের বানিয়েছেন এ দেশের নাগরিক।

কক্সবাজার জেলার ১৫ ইউনিয়নসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের মোট ৩২৩ ইউনিয়ন পরিষদে (ইউপি) প্রথম ধাপের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে। এ নির্বাচনে কক্সবাজার সদর থানার ইসলামাবাদ ৮ নম্বর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন রোহিঙ্গা নাগরিক নাঈমুল ইসলাম।

এসব বিষয়ে জানতে এই প্রতিবেদক কক্সবাজার পৌরসভার মেয়র মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একাধিকবার কল দিয়ে যোগাযোগ করেও মুঠোফোনের সংযোগ পায়নি।

দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-২ এর উপসহকারী পরিচালক মো. শরীফ উদ্দিন বলেন, ‘অভিযুক্ত রোহিঙ্গা নেতা নাঈমুল ইসলাম ও তৈয়ব জালাল দুই ভাই। মামলার আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে প্রথমে সাতজন থেকে পর্যায়ক্রমে আরও ২০০ রোহিঙ্গা নাগরিককে এনআইডি দিয়েছেন। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

একই সঙ্গে মেয়রসহ নির্বাচন কমিশন কর্মকর্তা ও জেলা বিশেষ শাখার তিন পুলিশ পরিদর্শকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সম্পদের তদন্ত চলমান রয়েছে বলেও জানান দুদকের এই কর্মকর্তা।

রবিউল হোসেন রবি/এমএ/সিএস

Print This Post