বান্দরবান প্রতিনিধি | আপডেট : ১ অক্টোবর, ২০২০ বৃহস্পতিবার ১২:০০ পিএম
বান্দরবানের লামা পৌরসভার ৪ নং ওয়ার্ডের স্থানীয়রা চাঁদা তুলে সামাজিক কবর স্থানের জন্য কিছু জায়গা কিনেছেন। তবে ওই কবরের জায়গা রেজিস্ট্রি করতে লামা ভূমি রেজিষ্ট্রেশন শাখায় গিয়ে কবর কমিটি পড়েছেন বিপাকে।
কবর কমিটির অভিযোগ, ওই অফিসের রেজিষ্ট্রেশন সহকারী সুমন কর্মকার দলিল সম্পাদনে সরকার নির্ধারিত ফির বাহিরেও দলিল মূল্যের অতিরিক্ত ৩শতাংশ টাকা (ঘুষ) দিতে হবে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। এরমধ্যে প্রথম কিস্তিতে বায়না নামা দলিল সম্পাদনকালিন ১.৫ শতাংশ এবং সাফ কবলা দলিল সম্পাদনের সময় অবশিষ্ট ১.৫শতাংশ টাকা প্রদান করতে হবে। এছাড়াও দলিল প্রতি আরো এক হাজার টাকা অফিস খরচ।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে সুমন কর্মকার বলেন, ‘অনেক আগ থেকে জেলা অফিসে এরকম হয়ে আসছে। অতিরিক্ত ৩ শতাংশ টাকা দিতেই হবে। আর এই টাকা জনতা ব্যাংক’র হিসাব নং -০৬৩৩০০২০৩৩০৯৪-এ জমা করে জমার স্লিপ রেজিষ্ট্রি আবেদনের সাথে দিলেই কেবল বায়না নামা বা সাফ কবলা দলিল সম্পাদন করা হবে।’ এর বাহিরে কিছু জানার থাকলে বান্দরবানের জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।
লামা পৌর সদরের একটি মসজিদ কমিটিও একই অভিযোগ তুলে ধরেন। ওই মসজিদ কমিটির অভিযোগ মসজিদের জায়গার দলিল সম্পাদন করতে গেলে সুমন কর্মকার একইভাবে অর্থ দাবি করেছেন।
মুহুরী (দলিল লিখক) মিরন কান্তি চৌধুরী জানান, গত ১০ আগষ্ট রেজিষ্ট্রেশনের দায়িত্ব প্রাপ্ত সহকারী কমিশনার মো. কায়েসুর রহমান দলিল লেখকদের নিয়ে একটি মিটিং করেছেন। সেখানে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন সপ্তাহে দুই দিন দলিল রেজিষ্ট্রেশন করা হবে। দলিল রেজিষ্ট্রি কার্যক্রমে বায়না নামায় ১.৫ শতাংশ এবং সাফ কবলায় ১.৫ শতাংশ টাকা অবশ্যই দিতে হবে।
এছাড়া আলীকদম উপজেলার একাধিক জনপ্রতিনিধি ও দলিল লেখক জানান, সেখানেও বায়না নামায় ১শতাংশ এবং সাফ কবলায় ১শতাংশ টাকা নগদ আদায় করা হচ্ছে। লামা উপজেলায় দলিলের টাকা জমা দেয়ার জন্য জনতা ব্যাংক’র একটি হিসাব নম্বার ০৬৩৩০০২০৩৩০৯৪ কম্পিউটারে টাইপ করে রেজিষ্ট্রি অফিসের দরজায় ও দেয়ালে সেটে দেয়া হয়েছে।
নারী নেত্রী ও সমাজকর্মী জাহানারা আরজু জানান, সরকারি বিধি বিধানের বাহিরে গিয়ে দলিল মূল্যের ৩শতাংশ টাকা আদায় করায় ভূমি ক্রেতা ও বিক্রেতা ক্ষতিগ্রস্থ এবং হয়রানির শিকার হচ্ছে। তাছাড়া লামা বান্দরবানের সবচেয়ে জনবহুল উপজেলা। এই উপজেলায় সপ্তাহে মাত্র দুই দিন রেজিষ্ট্রি করলে জনদূর্ভোগ দিন-দিন বৃদ্ধিই পাবে, কমবে না।
সার্ক মানবাধিকার ফাউডেশন বান্দরবান জেলার সাধারণ সম্পাদক এম. রুহুর আলিম জানান, লামা উপজেলায় সরকারি নিয়মের বাহিরে গিয়ে ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে আদায়কৃত ৩শতাংশ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হয় না। এবং এই টাকা সরকারি কোনো অডিটেও নেই। বিধিবহির্ভুতভাবে ভূমি হস্তান্তরে এই টাকা আদায়ের ব্যাপারে ভূমি মন্ত্রনালয় ও দূর্নীতি দমন কমিশনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তিনি।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবি মামুন মিয়া জানান, সরকার নির্ধারিত নিয়মের বাহিরে গিয়ে চাপ প্রয়োগ ও বাধ্য করে যে কোনো নামে টাকা আদায় দূনীর্তি এবং অনিয়মের পর্যায় ভুক্ত।
লামা পৌরসভার মেয়র জহিরুল ইসলাম জানান, ভূমি রেজিষ্ট্রেশন কার্যক্রমে জনগণের ভোগান্তি ও আর্থিক হয়রানির অনেক অভিযোগ পেয়েছি। ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে কৌশলে সরকার নির্ধারিত দলিল মূল্যের বাহিরে টাকা আদায় দুঃখজনক। এটি বন্ধ করা আবশ্যক।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে লামা উপজেলায় ভূমি রেজিষ্ট্রেশনের দায়িত্ব প্রাপ্ত সহকারী কমিশনার মো. কায়েসুর রহমান বলেন, ‘জেলা প্রশাসক মহোদয়ের নির্দেশেই এই টাকা আদায় করা হচ্ছে।’
লামা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. রেজা রশিদ জানান, ভূমি রেজিষ্ট্রেশন অফিসে কি হচ্ছে সে বিষয়ে আমার জানা নেই।
জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. শফিউল আলমও বলেন একই কথা। শফিউল আলম বলেন, লামায় ভূমি হস্তান্তর রেজিষ্ট্রেশনে এইভাবে টাকা আদায় আমার জানা নেই।
এই বিষয়ে জানতে বান্দরবানের জেলা প্রসাশক মো. দাউদুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন করেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সিএস/আরএইচ
