ঘরে থেকেই করোনামুক্ত

চট্টগ্রামে এবি ব্যাংক কর্মকর্তার করোনাজয়ের গল্প

তানভীর রশীদ আবীর | আপডেট : ০৬ জুলাই, ২০২০ সোমবার ০১:০২ পিএম

আমি একজন ব্যাংকার। আমি একজন কোভিট-১৯ পজিটিভ সার্ভাইভার। পরিবারের সদস্য পাঁচজন। আমার স্ত্রীসহ দুই ছেলে, এক মেয়ে। ছোট দুটো বাচ্চা থাকার কারণে আমারা শুরু থেকেই প্রচন্ড সাবধানে ছিলাম করোনার ব্যাপারে। করোনা প্রতিরোধক সরঞ্জমার নিয়ে আমি ব্যাংকে অফিস করেছি। মাঝে মধ্যে বের হয়েছিলাম বাসার জিনিসপত্র কেনাকাটার জন্য। ওইসময় হঠাৎ আমার গা গরম ও শরীর ব্যাথা অনুভব করাই তথন প্রাথমিকভাবে মাথায় ছিলোনা।

গত মে মাসের ২৮ তারিখে টেস্ট করাতে যাই চট্রগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে। ওইদিন সকাল ৯ টার দিকে সিরিয়াল নম্বর নিয়ে দুপুর ১ টার দিকে সেম্পল দেয়ার পর পরে বাসায় চলে আসি।

গত জুন মাসের ১ তারিখ কোতোয়ালি থানার এক পুলিশ কর্মকর্তা (এসআই) দুপুর ১ টার দিকে ফোন দিয়ে বলেন, আপনি কি কোভিট-১৯ টেস্ট করিয়েছেন। আমি বললাম, জি করিয়েছি। উনি বললেন, আপনার রিপোর্ট পজিটিভ এসেছে। ওইদিন থেকে আমি বাসায় মধ্যে ১৫ দিন হোম কোয়রেনটাইনে ছিলাম।

করোনা মোকাবিলায় বাসায় বসে যেভাবে যুদ্ধ শুরু

আমি বাসার পাশে আলাদা এক রুমে ঔষধ, চশমা, ২/৩ সেট কাপড়, টুথব্রাশসহ মোবাইল ফোনের চার্জার নিয়ে শিফট হই। সবই প্রচন্ড ভয় পাচ্ছিল আমাকে নিয়ে। কিন্ত আমি ভয় না পেয়ে মহান আল্লাহ উপর ভরসা রেখে সাহস নিয়ে কোয়রেনটাইনে পালন শুরু করলাম। ওই সময় সঙ্গে করে অক্সিমিটার কিনে বাসায় রেখেছিলাম। এন্টিবায়োটিক খেয়ে আমার জ্বর কমে গেছে আমি আশাবাদী হয়ে উঠছিলাম। কিন্ত তার কিছুই হলো না।

আমি ৫ দিন এন্টিবায়োটিক খেয়ে বহু কষ্টে জ্বরকে নিজের নাগালে নিয়ে এসেছি। খেতে পারতাম না, সবকিছু তিতকুটে আর লবনাক্ত লাগতো। আমি গরম পানি দিয়ে কুলি করতে গেলে বমি করে ফেলতাম, তাই গরম পানি খেয়ে নেয়া বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। মশলা চা (আদা তেজপাতা লং ফোটানো পানিতে চা দিয়ে খেতাম বেশি করে)। ভিটামিন সি (লেবু, মাল্টার রস নিয়মিত খেয়েছি)।

আপনার লক্ষন নেই মানেই যে আপনি স্বাধীন ও গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াবেন, এটা একটা মারাত্মক ভুল ধারণা। আপনি নিজেও জানবেন না কখন আপনি আরেকজনকে ভাইরাস দিয়ে বসছেন। নিজের শরীরকে বুঝুন, ফিল করুন। কোন রকম অস্বস্তি বা পরিবর্তন অনুভব করার সঙ্গে সঙ্গে আলাদা করে নিন নিজেকে। কোভিডকে হেলাফেলা করার মত ভুল করবেন না।

এছাড়া সুগার যদি আগে থেকে কমিয়ে না রাখতাম আর ওজন যদি কমিয়ে নিয়ে না আসতাম কোভিড জার্নিটা জিতে যাওয়া ডিফিকাল্ট হত আমার জন্য, হয়তো ধুঁকে ধুঁকে কষ্ট পেতাম আরো বেশি, মরে যাওয়াও অস্বাভাবিক হতো না।

এই ক্ষেত্রে আমার ছোট্ট একটা সাজেশন হলো— মাথা কিছুটা উঁচু রেখে ঘুমানো বা রেস্ট করবেন। দম আটকে আসার অনুভূতি হবে না, হাতের কাছে পানি/জুস/স্যুপ যা পাবেন তাই রাখবেন, গলা কোন অবস্থায় ড্রাই হতে দেয়া যাবে না। এইভাবে ১৫ই জুন আমি ধীরে ধীরে সুস্থ্য হয়ে উঠেছি।

আলহামদুলিল্লাহ আমার রিপোর্ট নিগেটিভ আসে।পরবরর্তিতে আবার ১৮ই জুন টেস্ট করাই। তাও রিপোর্ট নিগেটিভ আসে। ব্যাংকে জয়েন করার জন্য দুইবার নিগেটিভ আসতে হয়।

সবার প্রতি পরামর্শ—

কোভিড পজেটিভের স্ট্রেস যতটা না শারীরিক, তার চাইতে অনেক বেশি মানসিক। আমি আমার লেখার মাধ্যমে সবাইকে সচেতন করতে চাই। সবাই খুব সাবধানে থাকুন। কিভাবে ইনফেক্টেড হলেন এটা নিয়ে কূল-কিনারা না খুঁজে নিজেকে সেভ করুন। ফ্যামিলির বাকি সবার টেক কেয়ার করুন। হাত ধোয়া, স্যানিটাইজ করা, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার কোনো বিকল্প নেই। গরম পানি খান সারাদিনে গোটা দশেকবার, এটা একটা রেগুলার ফ্যামিলি ইভেন্ট ক্রিয়েট করুন। সবাই একসাথে বসে গরম পানি খান। আমি এই জীবনে আর কখনো ঠান্ডা পানি ছুঁয়ে দেখব না বলে শপথ করেছি। গরম পানি ভালো না লাগলে মধু অ্যাড করেন। আদা কুচি অ্যাড করেন।

আমি সর্বোপরি শোকরগুজার করি আল্লাহতালার, কারন আমি এরকম একটা অসুখে ভুগব, এটা নিশ্চয়ই তার প্ল্যানের অংশ ছিল। এবং আমি সব অবস্থায় আলহামদুলিল্লাহ বলার সাহস রাখি৷ শুধু বলবো, করোনারোগীর সাথে এমন কোন ব্যবহার আপনারা করবেন না, যেন মনুষ্যত্বের ওপর থেকেই তার ভরসা উঠে যায়।

আমার জন্য আপনারা দোয়া করবেন, যেন হাই পাওয়ার এন্টিবায়োটিকের ধকল আমি কাটিয়ে উঠতে পারি, আগের মত সুস্থ সবল হয়ে চলা ফেরা করতে পারি।

লেখক : সহকারী ভাইস প্রেসিডেন্ট, এবি ব্যাংক লিমিটেড, আন্দরকিল্লা শাখা, চট্টগ্রাম।

সিটিজিসান ডটকম/সিএস

Print This Post