চট্টগ্রাম :: শুল্ক ফাঁকির কারসাজি চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজে কোনোভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না। মিথ্যা ঘোষণায় আনা পণ্যসামগ্রী কারসাজির কারণে শুল্ক ফাঁকিতে পড়ছে কাস্টমস। এই জালিয়াতির সঙ্গে খোদ কাস্টমস কর্মকর্তারা জড়িত বলে অভিযোগ আছে। ফলে একের পর এক পণ্যের চালান আটক হলেও কমছে না শুল্ক ফাঁকি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ডাটা সংরক্ষণ ও আন্তর্জাতিকভাবে শেয়ারিং পদ্ধতি মজবুত না হওয়ায় এ ঘটনা ঘটছে। গত বছর চট্টগ্রাম বন্দরে মিথ্যা ঘোষণায় আমদানি করা ১২টি অবৈধ চালানের বিপরীতে কয়েক কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির অপচেষ্টা ধরা পড়ে।
আমদানি ছাড়াও রপ্তানি চালানের ক্ষেত্রেও ডকুমেন্ট জালিয়াতি ও মিথ্যা ঘোষণার অপকৌশল ধরা পড়েছে শুল্ক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের হাতে। বিশেষ করে শিল্পের যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল, ভোগ্যপণ্য ইত্যাদি আমদানির ক্ষেত্রে ঘোষণা বহির্ভূত অন্য মালামাল আমদানি করা হচ্ছে। এর মধ্য দিয়েই ফাঁকি দেয়া হচ্ছে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব।
আর এ সমস্যা দূর করতে বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক কাস্টমস দিবসে ‘ডাটা অ্যানালাইসিস ফর ইফেক্টিভ বর্ডার ম্যানেজমেন্ট’ শীর্ষক এক সেমিনার আয়োজন করে শুল্ক ও গোয়েন্দা বিভাগ। এর মধ্য দিয়ে জালিয়াতি ও কারসাজির অবসান ঘটবে বলে মনে করছেন শুল্ক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের যুগ্ম কমিশনার মুহাম্মদ রইচ উদ্দিন খান বলেন, ডাটা অ্যানালাইসিস ফর বর্ডার ম্যানেজমেন্ট বাস্তবায়ন হলে জালিয়াতির ঘটনা কমবে। মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানি বা রপ্তানির সুযোগ আর থাকবে না।
যে দেশ থেকে পণ্য আসবে এবং যে দেশে পণ্য যাবে দুটো ক্ষেত্রেই ডাটা সংরক্ষণ পদ্ধতি শক্তিশালী করা হবে জানিয়ে মুহাম্মদ রইচ উদ্দিন খান বলেন, তাতে মনিটরিং সহজ হবে। তাতে কাস্টম ঘিরে জালিয়াতি ও কারসাজির দিন শেষ হয়ে যাবে।
কাস্টম সূত্র জানায়, উচ্চহারের শুল্কায়নযোগ্য পণ্যসামগ্রীকে কম শুল্ক হারের, নিম্নতম স্তরের এমনকি নামমাত্র বা শূন্য শুল্কহারের পণ্য হিসেবে আমদানির আনুষঙ্গিক ডকুমেন্টে ঘোষণা দেয়া হয়ে থাকে। তাছাড়া ডকুমেন্টে এক পণ্যের নামে আরেক ধরনের পণ্যের ঘোষণা দেয়া হয়। গত বছর চট্টগ্রাম বন্দরে এমন ১২টি অবৈধ চালানের বিপরীতে কয়েক কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির অপচেষ্টার ঘটনা ধরা পড়ে।
২৯ ডিসেম্বর বিপি শিট আমদানির মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আনা হয় ২২টি কন্টেইনার বোঝাই চীনামাটি। ক্যাপ ট্রেডিং নামে ঢাকার একটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের নামে আসা দুটি চালানে এসব পণ্য পাওয়া যায়। বন্দরের এনসিটি ইয়ার্ডে খালাসের প্রাক্কালে বিষয়টি ধরা পড়ে বন্দর নিরাপত্তা কর্মীদের হাতে। পরে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা এসে কন্টেইনারগুলো খুলে ঘোষণা বহির্ভূত পণ্য আমদানির বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
এদিকে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে সিঙ্গাপুর থেকে আমদানি করা দুই কন্টেইনার কসমেটিকস সামগ্রী আটক করে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, ওই চালানে আড়াই কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির অপচেষ্টা করা হয়।
এর আগে ২ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুর থেকে পোশাকশিল্পের কাঁচামালের (হ্যাংগার, বোতাম ও সুতা) ঘোষণায় আমদানি নিষিদ্ধ ওষুধ ও প্রসাধনী পণ্য নিয়ে আসে কুমিল্লা ইপিজেড এলাকার প্রতিষ্ঠান ক্যাট গার্মেন্টস লিমিটেড। চালানের আগামপত্র (বিল অব এন্ট্রি-২৩২৯৪৮) জমা দেয় খালাসের দায়িত্বপ্রাপ্ত সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান খলিল ট্রেডার্স। রপ্তানি পণ্যের কাঁচামাল আমদানির ঘোষণা থাকায় শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য দ্রুত খালাসের ছাড়পত্র পায় প্রতিষ্ঠানটি।
কিন্তু গোপন তথ্যের ভিত্তিতে চালানের ছাড়করণ সাময়িকভাবে স্থগিত করে শতভাগ কায়িক পরীক্ষা চালায় চট্টগ্রাম কাস্টমের এআইআর শাখা। এতে দেখা যায়, প্রায় সাড়ে তিন হাজার কেজি ওজনের ২৮ ধরনের আমদানি নিষিদ্ধ ওষুধ ও তিন হাজার ৪৭৩ কেজি প্রসাধনী পণ্য এনেছে প্রতিষ্ঠানটি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কাস্টমের এক কর্মকর্তা জানান, তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে সাধারণত কায়িক পরীক্ষা চালানো হয় না। আমদানিকারকদের দেয়া হয় চালান দ্রুত ছাড়করণের সুবিধা। এসব কাঁচামালে উৎপাদিত পণ্য বিদেশে রপ্তানি হয় বলে এগুলোর ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত আমদানি ছাড়াও অন্যান্য বাড়তি সুবিধা দেয়া হয়। তাই বাড়তি শুল্কযুক্ত পণ্য বা আমদানি নিষিদ্ধ পণ্যের কায়িক পরীক্ষা এড়ানোর জন্যই পোশাকশিল্পের কাঁচামাল আমদানির মিথ্যা ঘোষণা দেয় কিছু প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া শুল্ক ফাঁকি দিতেও এ ধরনের জালিয়াতির আশ্রয় নিচ্ছেন তারা।
কয়েকটি মামলার নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, পোশাকশিল্পের কাঁচামাল ঘোষণায় আমদানিতে রাজস্ব ফাঁকি দিতে চার ধরনের মিথ্যা তথ্য দিচ্ছেন আমদানিকারকরা। এগুলো হলো আমদানি পণ্যের পরিচিতি তালিকা (এইচএস কোড) পরিবর্তন, ঘোষণার অতিরিক্ত পণ্য আমদানি, সিপিসি (কাস্টমস প্রসিডিউর কোড) পরিবর্তন ও নথি জালিয়াতির মাধ্যমে মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন।
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে এইচএস কোড পরিবর্তন বা ঘোষণা বহির্ভূত পণ্য আমদানির ঘটনায়। মামলা হলেও তদন্ত চলছে ধীরগতিতে। অনেক তদন্ত প্রতিবেদন থেকে যাচ্ছে অন্ধকারেই। ফলে শাস্তিও হচ্ছে কম।
সিটিজিসান.কম/রবি

