চট্টগ্রাম :: চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার আলোচিত মাহাবুব আলম হত্যা মামলার অধিকতর তদন্তে সিআইডি চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়ার আশঙ্কায় গুমরে মরছেন বাদী মোরশেদ বেগম।
এর আগে হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্ত্রাসীদের বিপক্ষে মামলার ১৫ সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য-প্রমাণ দিলেও চাঁদাবাজি করতে গিয়ে মাহবুব খুন হন বলে প্রতিবেদন দিয়েছিল পুলিশ।
তবে এ তদন্ত প্রতিবেদনে আপত্তি জানিয়ে নারাজি পিটিশন দাখিল করলে আদালত অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য মামলাটি সিআইডির কাছে ন্যস্ত করেন। প্রায় এক বছর পার হলেও প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি সিআইডি।
বরং তাদের বিরুদ্ধেও আসামিপক্ষের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ বাদীপক্ষের। তারা আশঙ্কা করছেন, মামলা নিষ্পত্তির চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার পাঁয়তারা করছে সিআইডির সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তা।
মামলার বাদী মোরশেদ বেগম জানান, ২০১৪ সালের ১৬ নভেম্বর দুপুরে তার স্বামী মাহবুব আলম ও চাচাতো দেবর মো. আমিনকে উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের মৌলানা কবির আহমদ পাড়ার বাড়ির সামনে থেকে অপহরণ করে সন্ত্রাসীরা। বিকেল পাচটার দিকে পাশের রাজানগর ইউনিয়নের ঠান্ডাছড়ি চা-বাগানের পাহাড়ে সন্ত্রাসীরা ছুরি, হাতুড়ি, হকিস্টিক দিয়ে আঘাত করে এবং পিস্তল দিয়ে গুলি করে ক্ষতবিক্ষত করে তাদের।
একপর্যায়ে পুলিশের উপস্থিতিটের পেয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় মাহবুব ও আমিনকে ফেলে যায় সন্ত্রাসীরা। পুলিশ তাদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠালে মাহবুবকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। আর আমিন দীর্ঘদিনের চিকিৎসায় বেঁচে থাকলেও এখন পঙ্গু জীবন যাপন করছেন।
এ ঘটনায় ২০ নভেম্বর থানায় মামলা করেন মোরশেদ বেগম। মামলায় আসামি করা হয় ১৩ জনকে-রাঙ্গুনিয়া উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের পেয়ার মোহাম্মদ চৌধুরীবাড়ির আব্দুল মান্নান চৌধুরীর ছেলে জাশেদুল ইসলাম প্রকাশ সন্ত্রাসী জাশেদ, একই বাড়ির মৃত এখলাস চৌধুরীর ছেলে মোদাচ্ছের ওরফে সন্ত্রাসী মোদাচ্ছের, আবদুল মান্নান চৌধুরীর ছেলে কামাল চৌধুরী ওরফে পেন্টু কামাল, আনোয়ার চৌধুরীর ছেলে তৌহিদুল ইসলাম ওরফে সন্ত্রাসী তৌহিদ, গোলাম আকবর চৌধুরী ওরফে খোকাইয়্যার ছেলে আয়াত চৌধুরী, গোলাম আকবর চৌধুরীর ছেলে আজিজুল ইসলাম চৌধুরী, ইউনিয়নের নেজাম শাহ পাড়ার আবুল কাশেমের ছেলে সহিদুল ইসলাম প্রকাশ সন্ত্রাসী খোকন, মাইগ্যার মার টিলার আবু তাহের ওরফে আবুইয়্যার ছেলে বখতেয়ার হোসেন ওরফে সন্ত্রাসী বখতেয়ার, শাহের মোহাম্মদ পাড়ার মৃত তাজুল ইসলাম ওরফে তাইজ্যার ছেলে এরশাদ ওরফে সন্ত্রাসী এরশাদ, খলিফা পাড়ার নুরুল আলম চৌধুরী ওরফে ভোলাইয়্যার ছেলে ওমর ফারুক ওরফে সন্ত্রাসী ফারুক, লালানগর ইউনিয়নের ফকিরপাড়া ইউনিয়নের আবুল কাশেমের ছেলে মো. কাঞ্চন ওরফে ডাকাত কাঞ্চন, দক্ষিণ রাজানগরের আবদুর রহমানের ছেলে আবদুল আজিজ, দক্ষিণ রাজানগরের রাজভুবন এলাকার মৃত নুর আহমদ সিকদারের ছেলে মো. আলমগীর সিকদার।
মামলার বিবরণে জানা যায়, জাশেদুল ইসলামের সঙ্গে মাহবুব আলমের দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। এ জের ধরে বহুবার মাহবুব আলমকে প্রাণনাশের হুমকি দেন জাশেদ।
সন্ত্রাসীদের নির্মম নির্যাতনে পঙ্গু হওয়া মো. আমিন এ হত্যা মামলার রাজসাক্ষী হিসেবে আদালতে সাক্ষ্য দেন। ১৬৪ ধারায় তার জবানবন্দি রেকর্ড করেন আদালত।
আমিন জানান, অপহরণ থেকে শুরু করে রাজানগর ইউনিয়নের ঠান্ডাছড়ি চা-বাগানের পাহাড়ে নিয়ে নির্মম নির্যাতনের ঘটনার অনেক প্রত্যক্ষদর্শী থাকলেও সন্ত্রাসীদের ভয়ে কেউ তাদের বাঁচাতে এগিয়ে যায়নি। তাদের অনেকে অবশ্য পরে আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন।
মোরশেদ বেগম জানান, হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্ত্রাসীদের বিপক্ষে আদালতে ১৫ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। কিন্তু মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রাঙ্গুনিয়া থানার এসআই শুভ রঞ্জন চাকমা প্রতিবেদন দেন চাদাঁবাজি করতে গিয়ে মাহবুব আলম গণপিটুনিতে নিহত হন। এ প্রতিবেদনের ওপর নারাজি আবেদন করলে আদালত মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য সিআইডিতে ন্যাস্ত করেন।
মোরশেদ বেগম জানান, শুরুতে সিআইডির এসআই জসিম উদ্দিন এ মামলার তদন্তভার পান। পরে তার স্থলাভিষিক্ত জাহাঙ্গীর আলম মামলা নিষ্পত্তির জন্য চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার কথা বলেন। ফলে এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে গুমরে মরছেন মোরশেদ বেগম।
নিহত মাহবুবের স্ত্রী বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ ১৩ আসামির দুয়েকজনকে ধরলেও আইনের ফাঁক গলে এক-দু মাস পর জেল থেকে জামিনে বেরিয়ে আসে। তারা এ হত্যা মামলা তুলে নেওয়ার জন্য আমাকে এবং আমার পরিবারের সদস্যদের এখন প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে।’
মামলা সম্পর্কে জানতে সিআইডির এসআই জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ‘মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। আগের তদন্ত কর্মকর্তার স্থলাভিষিক্ত হওয়ায় এখনো এ মামলা সম্পর্কে আমি তেমন জ্ঞাত নয়।’ তবে উর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করে এ তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
মাহবুব হত্যা মামলার প্রধান সাক্ষী ইসলামপুর ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান সিরাজদ্দৌলা দুলাল বলেন, মাহবুব হত্যা মামলার আসামি এই ১৩ সন্ত্রাসী উত্তর রাঙ্গুনিয়ার মুক্তিযোদ্ধা সোবহান হত্যা, গফুর হত্যা, ইসমাইল হত্যা, ননাইয়া হত্যা, ফকির জিল্লুর রহমান ভান্ডারী হত্যা, পারুয়া ইউনিয়নের নুরুল ইসলাম হত্যা, মেহেরুজ্জামানসহ ৮-৯টি হত্যা মামলার আসামি।
এছাড়া, ছিনতাই, ডাকাতি, অপহরণ, ধর্ষণসহ একাধিক মামলা রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে কিছু কিছু মামলায় জামিনে থাকলেও সোবহান হত্যা মামলার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি তারা। এরপরও তারা মুক্ত। এলাকায় চালিয়ে যাচ্ছে খুন, গুম, অপহরণসহ নানা সন্ত্রাসী কর্মকা-।’
সিরাজদ্দৌলা দুলাল বলেন, এ হত্যা মামলার অন্যতম আসামি মোদাচ্ছের ৬-৭ মাস আসে অস্ত্রসহ রাঙামাটি ঘাগড়া জোনের সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে জেলে গেলেও দুই মাস পর উচ্চ আদালতের জামিনে বেরিয়ে আসে। একইভাবে বখতেয়ারও পুলিশের হাতে ধরা পড়লে দুই মাস পর জেল থেকে বেরিয়ে আসে।
সিটিজিসান.কম/রবি

