এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সংগ্রামী জীবনের ইতিহাস

চট্টগ্রাম : মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী চট্টগ্রামের গণমানুষের উন্নয়নে আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। চট্টগ্রামের স্বার্থবিরোধী যে কোনো পদক্ষেপে শোনা যেত তার সংগ্রামী বক্তব্য। হোক সেটা নিজ দল ও দলীয় নেতার বিরুদ্ধে।

গত ১০ই নভেম্বর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তির একদিন আগেও যুবলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের গৃহকর অ্যাসিসমেন্ট নিয়ে গরম বক্তব্য দেন তিনি। হুঁশিয়ারি দেন সিটি মেয়রকেও। এমন এক নেতা আজ আর নেই সেটা ভাবতে কষ্ট হচ্ছে চট্টগ্রামবাসীর।

মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুর খবরে চট্টগ্রামবাসীর কান্না সেটারই প্রমাণ। গণমানুষের এই ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা তিনি একদিনে অর্জন করেননি। তিলে তিলে জীবন সংগ্রামের মধ্যদিয়ে আদায় করেছেন রাজনৈতিক বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী এ নেতা।

১৯৪৪ সালের ১লা ডিসেম্বর চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার গহিরা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর জন্ম। পিতার নাম মরহুম হোসেন আহমদ চৌধুরী আর মাতা মরহুম বেদৌরা বেগম। আট ভাইবোনের মাঝে মহিউদ্দিন মেজো। পিতা চাকরি করতেন আসাম বেঙ্গল রেলওয়েতে।

পিতার চাকরির সুবাদে মহিউদ্দিন পড়াশোনা করেছেন নোয়াখালীর মাইজদী জেলা স্কুল, কাজেম আলী ইংলিশ হাইস্কুল, আর প্রবর্তক সংঘে। স্কুলজীবনেই জড়িয়ে পড়েন ছাত্রলীগের রাজনীতিতে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শই ছিল তার রাজনীতির মূল অনুপ্রেরণা। মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে বাবার আদেশে তিনি ভর্তি হন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কোর্সে।

সেখানের পাঠ না চুকিয়ে ভর্তি হন চট্টগ্রামের অন্যতম বিদ্যাপিঠ চট্টগ্রাম কলেজে। বছর না ঘুরতেই কমার্স কলেজ, আর শেষমেষ সিটি কলেজ। সিটি কলেজেই তার বিপ্লবী রাজনৈতিক জীবনের হাতেখড়ি। পরবর্তীকালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।

রাজনৈতিক জীবনের শুরতেই সান্নিধ্যে আসেন জননেতা জহুর আহমদ চৌধুরীর। বঙ্গবন্ধুর ডাকে আন্দোলন সংগ্রামে অংশ নিতে গিয়ে পাক বাহিনীর কাছে গ্রেপ্তার হন অসংখ্যবার। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে গিয়ে আইএস আইয়ের চট্টগ্রাম নেভাল একাডেমি সদর দপ্তরের কাছে গ্রেপ্তার হয়ে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হন দীর্ঘ চার মাস।

পাক বাহিনীর নির্যাতনের চিহ্ন কবর পর্যন্ত নিয়ে গেছেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। তার গ্রেপ্তারের খবরে ভারতের একটি মুক্তিযোদ্ধা শিবিরে শহীদ মহিউদ্দিন ক্যাম্পও খোলা হয়েছিল। শহীদ ভেবে তার বাবা ছেলের নামও পাল্টে রেখেছিল ফাতেহা। এর মাঝে মানসিক রোগীর নাটক করে চট্টগ্রাম কারাগার থেকে পালিয়ে যান মহিউদ্দিন। পাড়ি জমান ভারতে। সেখানে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ শেষে সক্রিয়ভাবে সম্মুখসমরে অংশ নেন। ছিলেন ভারত-বাংলা যৌথবাহিনীর মাউন্টেন ডিভিশনের অধীনে।

দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে জহুর আহমদ চৌধুরীর নেতৃত্বে ঝাঁপিয়ে পড়েন নতুন সংগ্রামে। বঙ্গবন্ধুর খুবই কাছের আর আদরের ছাত্রনেতা ছিলেন মহিউদ্দিন। বঙ্গবন্ধু তাকে না দেখলে বলতেন- আমার মহিউদ্দিন কই? তৎকালীন সময়ে প্রবল ক্ষমতাশালী হয়েও ক্ষমতার মোহ এক চুলও স্পর্শ করতে পারেনি সংগ্রামী মহিউদ্দিন চৌধুরীকে।

কিছুদিন না যেতেই ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে নিহত হন বঙ্গবন্ধু। অল্পের জন্য মহিউদ্দিন ধরা পড়া থেকে বেঁচে যান। মৃত্যুবরণ করেন সাথী মৌলভী সৈয়দ। পালিয়ে গিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন। সেখানে ছোট্ট একটি কুটিরে থাকতেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। একজন থাকার মতো একটি খাটে ঘুমাতেন দুজন ঠাসাঠাসি করে। তার সঙ্গে ছিলেন চট্টগ্রামের মদুনাঘাটের মুক্তিযোদ্ধা অমলেন্দু সরকার।

অনাহার-অর্ধাহারে কেটেছে দিনাতিপাত। কখনও রাস্তার কাঁচাবাজারে আলু বিক্রি করেছেন। কখনও টং দোকানে চা বিক্রি করেছেন। তারপর জুটল একটি চাকরি। অস্থায়ী সেই চাকরি কলকাতা সিটি করপোরেশনে। সেই চাকরি ছিল ময়লা আবর্জনাবাহী গাড়ি গণনার কাজ। অর্থাৎ প্রতিদিন কত গাড়ি আবর্জনা ফেলে আসত সেটি গুনে রাখার সাধারণ একটি চাকরি।

এ অস্থায়ী চাকরি করার সময়ই জেদ চেপেছিল তিনি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র হবেন একদিন! কিছুদিন পর দলের নির্দেশে দেশে ফিরে আবার সক্রিয় হন প্রকাশ্য রাজনীতিতে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মহিউদ্দিন চট্টগ্রামে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও শ্রমিক লীগের শীর্ষ পদে ছিলেন। চট্টগ্রামে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, বন্দর রক্ষা আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনেও তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন।

পাঁচ দশকের রাজনৈতিক জীবনে অনেক অর্জন থাকলেও কখনও সংসদ সদস্য হতে পারেননি মহিউদ্দিন। ১৯৮৬ সালে রাউজান থেকে এবং ১৯৯১ সালে নগরীর কোতোয়ালি আসনে ভোট করে তিনি হেরে যান। তবে ১৯৯৪ সালে প্রথমবার চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে প্রার্থী হয়েই মহিউদ্দিন বিজয়ী হন। ২০০০ সালে দ্বিতীয় দফায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং ২০০৫ সালে তৃতীয় দফায় মেয়র নির্বাচিত হন তিনি।

গণমানুষের তথা চট্টগ্রামের উন্নয়নের লক্ষ্যে ক্রমাগত ছুটে চলেছেন। চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষায় ক্রমাগত উপেক্ষা করেছেন রক্তচক্ষু। চালিয়ে গেছেন উন্নয়নের চাকা। উড়িয়ে চলেছেন অসামপ্রদায়িক প্রগতিশীল রাজনীতি আর মূল্যবোধের পতাকা। সর্বশেষ নির্যাতিত হন রাজনীতি পরিশোধনের নামে নেমে আশা ওয়ান ইলেভেনের শাসনামলে। ষাটোর্ধ বয়সে কারান্তরীণ ছিলেন দীর্ঘ দুই বছর।

এর মধ্যেই নির্মমভাবে ইন্তেকাল করেন আদরের মেয়ে ফওজিয়া সুলতানা টুম্পা। নানা টালবাহানা করে টুম্পার মৃত্যু অবধারিত জেনেও দেখতে দেয়া হয়নি তাকে। শত চেষ্টা আর মানসিক নির্যাতন করেও টলাতে পারেনি মহিউদ্দিনকে একটুও। দুর্নীতিবাজদের সঙ্গে এক করেও পারেনি দোষী সাব্যস্ত করতে। বারবার তারা পরাজিত হয়েছে এই সংগ্রামী মানুষের পাহাড়সম ব্যক্তিত্বের কাছে।

জনগণের ভোটে তিনবার মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। তাদের ভালোবাসায় স্নিগ্ধ হয়েছেন বারবার। গণমানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে, নির্যাতন সহ্য করে, এ মানুষটি আজ সবাইকে ছেড়ে চিরবিদায় নিলেন পৃথিবী থেকে। আর বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুতে চট্টগ্রামে নেমে আসে শোকের ছায়া।