ইপিজেডে ২৫ কোটি টাকার ওয়াকফ এস্টেট নিয়ে নাটকীয়তা

3333

চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম ইপিজেড এলাকায় ফকির মোহাম্মদ সওদাগর ওয়াকফ এস্টেটের ২৫ কোটি টাকার সম্পত্তি ভোগ দখলে রেখেছে একটি চক্র।

জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে নগরীর ইপিজেড থানার এয়ারপোর্ট রুটে অবস্থিত ফকির মোহাম্মদ সওদাগর ওয়াকফ এস্টেটের ২৫ কোটি টাকার সম্পত্তি ভোগ দখলে রেখেছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র।

মসজিদের নামে দেয়া ওয়াকফ করা ওই সম্পত্তি আত্মসাতের জন্য দীর্ঘ ১৭ বছর থেকে নানা জালিয়াতির মাধ্যমে আশ্রয় নিয়েছেন তারা। এর মাধ্যমে গুটি কয়েক ব্যক্তি লাভবান হলেও মসজিদ ফান্ডে নাম মাত্র টাকা জমা হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

ওয়াক্ফ এস্টেটের মোতোয়াল্লী ডা. জামান আহাম্মদ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘মসজিদের নামে লিল্লাহকৃত বিপুল সম্পত্তি একটি প্রভাবশালী চক্রের হাতে দীর্ঘদিন থেকে দখলে রয়েছে। ওয়াক্ফ প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে একাধিকবার আবেদন করা হয়েছে এ ব্যাপারে। কিন্তু প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না। এতে ওয়াক্ফ এস্টেটের বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি হাত ছাড়া হয়ে আর্থিক ক্ষতির শিকার হতে হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, মোতোয়াল্লী হিসেবে আমি এসব সম্পত্তি উদ্ধারের চেষ্টা করলে আত্মসাতকারীরা আমাকে বিভিন্নভাবে হুমকি ধমকি দিচ্ছেন। এমনকি প্রাণে মেরে ফেলার হুমকিও দেয়া হচ্ছে। তাই এখন আমি ও আমার পরিবার পরিজনের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত।

জানতে চাইলে ওয়াক্ফ প্রশাসনের সহকারী প্রশাসক মো. কামরুজ্জামান এ ব্যাপারে বলেন, ‘মোতোয়াল্লীর মাধ্যমে বিষয়টি আমরা জেনেছি। ইতোমধ্যে এ সংক্রান্ত ফাইল উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে কিছু কাগজপত্র চাওয়া হয়েছে। এসব পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে আমাদের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

অনুসন্ধানে জানা যায়, নগরীর ইপিজেড থানা এলাকায় ফকির মোাহাম্মদ সওদাগর ওয়াক্ফ এস্টেটের ১৭ একর জায়গা ছিল। এরমধ্যে অধিকাংশ জায়গা ইপিজেডের অধিগ্রহণে চলে যায়। এখন অবশিষ্ট আছে ২ দশমিক ৭১ একর জায়গা। এরমধ্যে প্রায় (৮২ শতক) জায়গা দীর্ঘদিন থেকে দখলে রেখেছে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল। যার বর্তমান বাজার মূল্য ২০ কোটি টাকার অধিক।

এস্টেটের ৬ গন্ডা (১২ শতক) জায়গা রয়েছে ইপিজেড মোড়েই। ওই জায়গার প্রধান সড়ক লাগোয়া ৫০৪ বর্গফুট জায়গা গত ১৭ বছর ধরে দখল করে রেখেছে চক্রটি। ওই জায়গার বর্তমান মূল্য প্রায় কোটি টাকা। পাশাপাশি আরও ১৫টি দোকান নানা জাল জালিয়াতির মাধ্যমে জোরপূর্বক দখল করে রেখেছে ওই চক্র। যার আনুমানিক মূল্য ৫ কোটি টাকার বেশি।

সেই হিসেবে ফকির মোহাম্মদ ওয়াক্ফ এস্টেটের ২৫ কোটি টাকার বেশি মূল্যের সম্পত্তি দখলে রয়েছে ওই চক্রের হাতে। ওয়াকফ এস্টেটের মোতোয়াল্লী মো. এলেম উদ্দিনকে ব্যবহার করে একটি চক্র বিভিন্ন জালিয়াতির মাধ্যমে ওই জায়গা আত্মসাতের চেষ্টা করে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে আবদুল কুদ্দুস ওই জায়গায় বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। এরই মধ্যে ২০১১ সালে ওই ওয়াক্ফ এস্টেটের মোতোয়াল্লী পরিবর্তন হয়। ফলে বেকায়দায় পড়েন আবদুল কুদ্দুস ও তার সহযোগীরা।

অভিযোগ আছে, আবদুল কুদ্দুস ও তার সহযোগীরা ইপিজেড মোড়ের জায়গাটি নিজের কব্জায় রাখার জন্য নানা বাহানা শুরু করেন। ফলে ২০০২ সালের ওই জায়গার একটি ইজারা চুক্তি তৈরি করে। এতে তৎকালীন মোতোয়াল্লী এলেম উদ্দিনের সাথে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সম্পাদন করেন আবদুল কুদ্দুস।

কিন্তু ১ জুলাই ২০০২ সালে চুক্তি সম্পাদনের সময় ৭৫ টাকা মূল্যমানের দুটি স্ট্যাম্প ব্যবহার করা হয়। যার নম্বর যথাক্রমে ঙ ৮৫০৬৩৯৭ এবং ঙ ৮৫০৬৩৯৮। তবে ওই সিরিয়ালের স্ট্যাম্প চট্টগ্রাম ট্রেজারি থেকে সরবরাহ করা হয় ৩১ মে ২০০৫ সালে।

চুক্তিপত্রের সাক্ষী হিসেবে সই করেছেন মো. মাজহারুল হক। পরবর্তীতে এলেম উদ্দিন ২০০৫ সালের ২ জুলাই আরেকটি ইজারা চুক্তি সম্পাদন করেন আবদুল কুদ্দুসের সঙ্গে। সেই ধারাবাহিকতায় ২০১০ সালের ১ জুলাই আরও একটি ইজারা চুক্তিপত্র সম্পাদন করেন এলেম উদ্দিন। এতে শর্ত রাখা হয়, মাসিক ভাড়া ২ হাজার টাকা। এসব ইজারা চুক্তিতে আইনগত নানা অসঙ্গতি ও শর্ত রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাজহারুল হক বলেন, ‘আমি চুক্তিপত্রে সই করেছি। তবে কখন করেছি মনে নেই।’

এদিকে মোতোয়াল্লী পরিবর্তন হওয়ার পর জাল জালিয়াতির মাধ্যমে এসব চুক্তিপত্র তড়িঘড়ি করে বানানো হয়। পাশাপাশি ওই জায়গার ওপর ওয়াকফ প্রশাসন ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কোনো অনুমতি না নিয়েই স্থায়ী অবকাঠামো তৈরির মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়া দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন এলেম উদ্দিন ও আবদুল কুদ্দছ। ইতিমধ্যে এলেম উদ্দিন তিনবার আবদুল কুদ্দুসের সাথে চুক্তি করলেও একবারও ভাড়া নেননি।

রিলায়েন্স ফুড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ভাড়া নেয়া হচ্ছে রশিদের মাধ্যমে। একই জায়গা আমীর হামজার কাছেও ইজারা দেওয়া হয় ১৯৮৫ সালে। অন্যদিকে জায়গাটি আবদুল কুদ্দুস দখলে রেখে মোটা অংকের টাকা নিয়ে হোটেল জামান অ্যান্ড বিরানী হাউজের কাছে ভাড়া দেন। কিন্তু হোটেল জামান কর্তৃপক্ষের মো. জামসেদ রুবেল আমমোক্তার নামা দেন আবদুল কুদ্দুস। অথচ হোটেল জামান অ্যান্ড বিরানী হাউস ফকির মোহাম্মদ ওয়াক্ফ এস্টেটের ভাড়াটিয়া নয়।

হোটেল জামান কর্তৃপক্ষ আবদুল কুদ্দুসের কাছ থেকে ভাড়া নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। এক্ষেত্রে আবদুল কুদ্দুস আরও একটি জাল জালিয়াতির আশ্রয় নেন ভাড়া নামা চুক্তিপত্রের মাধ্যমে। এতে প্রথম পক্ষ করা হয় এলেম উদ্দিনকে। দ্বিতীয় পক্ষ আবদুল কুদ্দুস, খুরশিদা বেগম ও রোকেয়া বেগমকে। কিন্তু রোটারি করা ওই চুক্তিপত্রের কোথাও তারিখ ও স্বাক্ষীর উল্লেখ নেই। মূলত এ চুক্তিপত্র জমা দিয়েই কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির থেকে গ্যাসের সংযোগ নিয়েছে হোটেল জামান অ্যান্ড বিরানি হাউস।

একইভাবে ওয়াসা থেকে নেয়া হয় পানির সংযোগ। সেখানে দাখিল করা চুক্তিপত্রে যেসব জায়গার দাগ উল্লেখ করা হয় তাও সঠিক নয়। বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে ওয়াসার ভ্রাম্যমান আদালত চলতি মাসের ৩ অক্টোবর হোটেল জামানের পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। ওই সময় হোটেলের মালিক পক্ষের লোকজন পালিয়ে যাওয়ায় জরিমানা করা হয়নি বলে জানান ওয়াসার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কল্লোল বিশ্বাস। বিদ্যুতের সংযোগও নেয়ার ক্ষেত্রেও একেই জালিয়াতি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

তাছাড়া হোটেল কর্তৃপক্ষ এখনো কোনো ভাড়া দেয়নি ওয়াক্ফ এস্টেটকে। সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা গেছে, ওই জায়গায় গড়ে তোলা হয়েছে তিনতলা ভবন। ভবনের নিচ তলায় রয়েছে আল ইদ্রিস ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় হোটেল জামান অ্যান্ড বিরানি হাউস। কথা বলার জন্য হোটেলে গেলে পাওয়া যায়নি তাকে। তবে হোটেলের ম্যানেজার পরিচয় দিয়ে জামশেদুল হক সুমন জানান জামশেদ রুবেল দেশের বাইরে আছেন। তার ছোট ভাই রাসেল এখন হোটেল দেখভাল করেন।

তবে রাসেলের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাবেক মতোয়াল্লী এলেম উদ্দিন বলেন, `আমাকে তারা ব্যবহার করেছে। আমি কখন কি করেছি মনে নেই। আমি কোনো আর্থিক সুবিধা নেইনি। আমি আবদুল কুদ্দুসকে খালি জায়গা ভাড়া দিয়েছি। কুদ্দুস ওখানে কত টাকা খরচ করেছে জানি না।’

বিষয়টি নিয়ে সাথে কথা হয় আবদুল কুদ্দুসের। সঙ্গে। তিনি বলেন, `আমি খালি জায়গা ভাড়া নিয়ে ভবন নির্মাণ করেছি। এতে আমার অনেক টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু বর্তমান মোতোয়াল্লী আমার সাথে আপোষে আসছে না। তাই আমি কোর্টে ভাড়া জমা দিচ্ছি। জাল জালিয়াতির মাধ্যমে প্রথম চুক্তিপত্র সম্পাদন ও দ্বিতীয় ও তৃতীয় চুক্তিপত্রে নানা অযৌক্তিক শর্ত সম্পর্কে তিনি বলেন, ফেইক (ভুয়া) শনাক্ত করবে আদালত। এগুলো কি আপনাদের (সাংবাদিক) কাজ?’

তিনি আরও বলেন, তাছাড়া তৃতীয় চুক্তিপত্র সম্পাদনের পর প্রথম ও দ্বিতীয় চুক্তিপত্রের কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। তাহলে কী প্রথম ও দ্বিতীয় চুক্তিপত্রের ধারাবাহিকতায় তৃতীয় চুক্তিপত্র সম্পাদনের বিষয়টি অস্বীকার করছেন? এমন প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গিয়ে আবদুল কুদ্দুস বলেন, ‘পরে আমি আপনাদের কাগজ দেখাবো। আমি ফোন দিয়ে জানাবো আসার জন্য।’