রহস্যজনক বিস্ফোরণে মা-শিশুসহ নিহত ৭, আহত ২০

সুজা উদ্দিন তালুকদার :: চট্টগ্রামের পাথার ঘাটায় এব ভবনের নিচতলায় ‘রহস্যজনক’ ও ভয়াবহ বিস্ফোরণে মা ও ছেলেশিশুসহ সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। এতে আহত হলেন অন্তত ২০জন। এরধ্যে ১০জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। রোববার সকাল ৮ টা ৪০ মিনিটে কোতোয়ালী থানার ব্রিক ফিল্ড লেন এলাকার ‘বড়–য়া’ ভবনে এ ঘটনা ঘটে।

নিহতরা হলেন, কক্সবাজারের উখিয়ার নুরুল ইসলাম (৩১), পটিয়ার মেহের আটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা অ্যানি বড়ুয়া (৪০), রাঙ্গুনিয়ার কাজল নাথের মেয়ে কৃষ্ণকুমারী স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী অর্পিতা নাথ (১৬), নতুন ব্রিজ এলাকার শ্রমিক নুরুল ইসলাম (৩০), ভ্যান চালক মোহাম্মদ সেলিম (৪০), পাথরঘাটার জুলেখা খানম ফরজানা (৩০) ও তার ছেলে আতিকুর রহমান (৮)। নিহত অপর দুইজনের পরিচয় সনাক্ত করা যায়নি।

এদের মধ্যে অ্যানি বড়–য়া পেশায় শিক্ষিকা। পটিয়া উপজেলায়। নুরুল ইসলাম পেশায় রংমেস্ত্রী। তার বাড়ি কক্সবাজারের উখিয়া এলাকায়। বিস্ফোরণের প্রথম দিকে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিজিএল) এর রাইজার বিস্ফোরণে এ ঘটনা ঘটার কথা বলা হলেও রাষ্ট্রীয় গ্যাস কোম্পানি কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছে-গ্যাসের রাইজারে কোন ধরণের বিস্ফোরণ ঘটেনি। তাদের রাইজারটি অক্ষত অবস্থায় রয়েছে। কী কারণে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে সর্বশেষ এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। ভবনটি মালিক ছিলেন ধর্মপাল বড়–য়া। তিনি মারা যাওয়ার পর ভবনটির বর্তমান মালিক ধর্মপালের দুই ছেলে অমল বড়–য়া ও টিটু বড়–য়া।

পুুলিশ ও অগ্নিনির্বাপক সদস্যরা জানান, সকাল পৌনে নয়টার দিকে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এরপর আশপাশের লোকজন জরুরি সেবা ৯৯৯ ফোন দিয়ে পুলিশের সহযোগিতা যান। এরপর কোতোয়ালী থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। এরপর ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেয়া হয়। ছুটে আসেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারাও। পাঁচতলা ভবনের নিচতলায় বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ওই ভবনের দু’টি দেয়াল ধসে পড়ে। এ সময় আহতাবস্থায় বেশ কয়েকজনকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ফায়ার সার্ভিস ১৬ জনকে উদ্ধার করে চমেক হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে ৭ জন মারা যান। নন্দনকানন, চন্দনপুরা ও আগ্রাবাদ তিন স্টেশনের ১০ গাড়ি উদ্ধার কাজ শুরু করে।

বিস্ফোরিত ঘরের গৃহিনী সন্ধ্যা নাথ (৪০) বলেন, সকালে পূজার ঘরে গিয়ে মোমবাতি জ্বালানোর জন্য ম্যাচের কাঠি জ্বালাতেই সাথে সাথে বিস্ফোরণ হয়। কীভাবে কী হয়েছে বুঝতেও পারিনি। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন পাথরঘাটা সেইন্ট জোন্সেফ স্কুলের সহকারী শিক্ষিকা ডরিন তৃষা গোমেজ (২৩)। তার অবস্থাও শঙ্কাটাপন্ন। তিনি পেটে মারাত্মকভাবে আঘাত পেয়েছেন। তাকে ক্যাজুয়ালিটি ইউনিট থেকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে। এছাড়া ইউসুফ (৪০), ইসমাইল (৩০) ও আবদুল হামিদ (৪২), নজির আহমদ ও আরিফ (২৪) নামের রিকশা আরোহী আহত হয়েছেন। তাদের মাথায় আঘাত লেগেছে।

ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি : কোতোয়ালী থানার ব্রিকফিল্ড লেইনের ৪ নম্বর গলিতে অবস্থিত ‘বড়–য়া’ ভবনটি। ভবনটি পঞ্চম তলা বিশিষ্ট। ভবনটির সামনে অংশ পুরোপুরো বিধ্বস্ত হয়ে প্রায় ২০ গজের মতে দূরে ছিটকে গেছে। ভবনটির দেয়াল আঘাত করে সীমানা দেয়ালকে। সীমানা দেয়ালসহ ছিটকে পাশের ভবনে আঘাত করে। বড়–য়া ভবনের বিস্ফোরণের ঘটনে পূর্বে পাশের ভবনটিতেও আঘাত করে। একইভাবে পশ্চিম পাশের ভবনটিতেও আঘাত করে। ভবনটিতে বিষ্ফোরণের ভয়াবহতা এতটা ক্ষিপ্র ছিল যে পাশের ভবনের ওয়াল পর্যন্ত ধসে পড়েছে। ভবনটির প্রধান গেইটটি ঢুকে পড়ে পাশের মেসার্স জনতা ফার্মেসী নামে ওষুধের দোকানে। নিহত ও আহতরা বেশির ভাগই পথচারি। কয়েকটি ভবনের জানালার কাচ ভেঙ্গে গেছে। ঘটনার পর পরই ব্রিকফিল্ড সড়কটি বন্ধ হয়েছে। পুরো এলাকা লোকেলোকারণ্য হয়ে পড়ে। উৎসুক জনতাকে সামলাতে পুলিশকে হিমশিম খেতে হয়।

ঘটনার পর পরই ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন, চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ইলিয়াস হোসেন ও সিডিএ চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষ।

ঘটনাস্থল পরির্দশন শেষে চসিক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। আহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসার ব্যবস্থা করবো। তাদের যাবতীয় খরচ সিটি করপোরেশন বহন করবে।৭ জনের প্রাণহানি হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস, আমাদের দুজন কাউন্সিলর যথেষ্ট কষ্ট করেছেন। জনগণকে সচেতন হতে হবে। একটি দুর্ঘটনা অপূরণীয় ক্ষতি। সব কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি ভবন মালিক ও ভাড়াটিয়াদের গ্যাস, বিদ্যুতের লাইনে লিকেজ আছে কিনা নিয়মিত তদারকি করতে হবে। ব্যবহারকারীরা সচেতন হলে দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। তিনি আরও বলেন, সিডিএ নকশা অনুমোদন করে। নকশা অনুযায়ী ভবন হচ্ছে না। নজরদারির জন্য প্রয়োজনীয় জনবল সেবা সংস্থার নেই। চসিক, ফায়ার সার্ভিস, সিডিএ, জেলা প্রশাসন, কর্ণফুলী গ্যাসের প্রতিনিধি নিয়ে কমিটি গঠন করা হবে। কারো গাফেলতি ছিল তা খুজে বের করা হবে।

ঘটনাস্থল ঘুরে দেখে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াস হোসেন বলেন, বিস্ফোরণের কারণ খতিয়ে দেখতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এ জেএম শরিফুল হাসানকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন। বড়–য়া ভবনের পাশে পান দোকান করতেন স্থানীয় বাসিন্দা মনজুর আলম।

তিনি বলেন, আমি ৭টায় দোকান খুলি। ৮টা ৪০ মিনিটের দিকে হঠাৎ বিকট আওয়াজ। আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে ভবনটির দেয়াল মাঝখানের রাস্তা ফেরিয়ে আমার দোকানে আঘাত করে। আমি শো-কেস তছনছ করে দেয়। আমি আহত হই। পরে আশপাশের কয়েকজন আমাকে উদ্ধার করে। রাস্তায় বেবিয়ে ৬-৭ জনের লাশ দেখি।

বড়–য়া ভবনের পাশের ভবনের বাসিন্দা আবুল কালাম যুগান্তরকে জানান, সকাল সাড়ে ৮ টার পর বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। প্রথমে আমরা বিকট শব্দ শুনতে পাই। শব্দ শুনতে পেয়ে বাইরে বেরিয়ে আসি। নিচে এসে দেখি বড়–য়া ভবনের নিচতলা বিধ্বস্ত হয়েছে। আশেপাশে ভাঙা আসবাবপত্র ও কাচের টুকরো ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। নিচে নেমে দেখি কয়েকটা লাশ পড়ে আছে। পরে গাড়ি করে তাদের হাসপাতালে পাঠাই।

পুলিশের ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন : বিস্ফোরণের ঘটনায় পুলিশের পক্ষে ৩ সদস্য তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আহত রোগীদের দেখতে এসে সিএমপি কমিশনার মাহবুবর রহমান এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, আগামী ৩ দিনের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট দেয়া হবে। দক্ষিণের ডিসি মেহেদী হাসানকে কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (সিটিএসবি) মঞ্জুর মোরশেদ ও কোতোয়ালি থানার সহকারি কমিশনার নোবেল চাকমা।

পরীক্ষার হলে দায়িত্ব পালন করা হলো না অ্যানির : বিস্ফোরণে নিহতদের মধ্যে একজন পটিয়ার সরকারি মেহেরআটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা অ্যানি বড়ুয়া (৪০)। তিনি পাথরঘাটা ব্রিকফিল্ড রোডে সহকর্মীর জন্য অপেক্ষা করছিলেন। হঠাৎ দেয়ালের একটি অংশ এসে পড়ে তাঁর ওপর। আর এতে ঘটনাস্থলেই মৃত্যুু হয় তাঁর। পিএসসি পরীক্ষাকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করতে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন।

অ্যানির স্বামী প্রকৌশলী পলাশ বড়–য়া জানান, তিনি (অ্যানি বড়–য়া) শিক্ষকতা করতেন নগরীর বাসা থেকে গিয়ে। তারা ফিরিঙ্গি বাজারের কাছে। রোববার সকালে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন। কোনো দিন কোতোয়ালি মোড় দিয়ে যায় না সে। আরেক সহকর্মীর সাথে যাওয়ার জন্য আজকে কোতোয়ালি গিয়েছেন। এ যাওয়া যে শেষ যাওয়া জানতাম না। আজকের পিএসসি পরীক্ষার প্রথম ডিউটিতে তাকে শাড়িও ঠিক করে দিয়েছি। পছন্দের শাড়ি পড়ে এ্যানি ডিউটিতে যাচ্ছিল। ও আগে বের হয়, আমি পরে বের হচ্ছিলাম। এর মধ্যে শুনি এ দুর্ঘটনা। আমাদের সাজানো গোছানো সংসার এক নিমিষেই শেষ। আমি ছেলেদের কি জবাব দেবো? নিহত এ্যানি বড়ুয়ার এক ছেলে এবার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জেএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। আরেকজন নগরীর একটি স্কুলে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে। দুই ছেলের কাছে আমি কি জবাব দেবো। আমার পুরো সংসার তছনছ হয়ে গেছে।