অসহায় নারীদের পাশে রাউজানের ইউপি মেম্বার!

রাউজানের ইউপি মেম্বার লাকী চৌধুরী

চট্টগ্রাম : পাঁচবছর আগে রাউজান উপজেলার সাপলঙ্গা এলাকার লাকী আকতারকে স্বামী তালাক দিলে একসন্তান নিয়ে তিনি নিরুপায় হয়ে পড়েন। বাবার বাড়িতে বসে বুকভরা কষ্টে দিনগুলো পার করা ছাড়া তার আর কোন উপায় ছিল না। নিরুপায় হয়ে তখন তিনি দ্বারস্থ হন রাউজান লাকী বিউটি পার্লার এন্ড বুটিকসের স্বত্ত্বাধিকারী লাকী চৌধুরীর কাছে। তিনি লাকীকে ভরণপোষণ দিয়ে নিজ বাসায় রেখে রূপচর্চা, সাজসজ্জার প্রশিক্ষণ দেন। তিনবছর প্রশিক্ষণশেষে ওই বিউটি পার্লারেই চাকুরির সুযোগ করে দেয়া হয় তাকে। লাকী চৌধুরীর এই আশ্রয়ে স্বামী পরিত্যক্তা লাকী আকতারের ভাগ্য খুলেছে। তার মনে এখন আর কোন দুঃখ নেই। আর্থিক সমস্যাও কেটেছে তার। এক ছেলে সন্তান নিয়ে লাকী এখন স্বপ্ন দেখছেন নতুন ভবিষ্যতের।

কক্সবাজারের মা-বাবাহীন এতিম নিপা আকতারকেও ছোটবেলা থেকে নিজের বাড়িতে রেখে বিউটি পার্লারে কাজ শেখানো হচ্ছে। সেই নিপাকে লাকী চৌধুরী তার নিজ খরচে বিয়ে দেবেন। শুধু লাকী, নিপায়ই নয়, প্রায় দেড়’শ স্বামী পরিত্যক্ত নারী, গরীব, অসহায়, দুস্থ তরুণীর পাশে দাঁড়ানো যেন লাকী চৌধুরীর কাজ। বিউটি পার্লারের রূপচর্চা, সাজসজ্জা, ব্লক, বাটিক, সেলাই, শো-পিচসহ বিভিন্ন হাতের কাজ প্রশিক্ষণ দিয়ে এ পর্যন্ত দেড়-দুইশ নারীকে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখিয়েছেন লাকী চৌধুরী। তার কাছ থেকে হাতের কাজ শিখে এবং প্রত্যক্ষ সহযোগিতা নিয়ে একশ’র বেশি নারী মধ্যেপ্রাচ্য কয়েকটি দেশে, চট্টগ্রাম, ঢাকা শহর, হাটহাজারীসহ বিভিন্ন এলাকায় দোকান খুলে এবং চাকুরি করে আত্মনির্ভর হয়েছে।

লাকী চৌধুরী শুধু একজন বিউটিশিয়ান কিংবা রমণীদের হাতের কাজের প্রশিক্ষকই নয়, তিনি ইউনিয়ন পরিষদের মহিলা মেম্বারও। ২০১৬ সালে উপজেলার ৭নং রাউজান ইউনিয়নের সংরক্ষিত ১.২.৩ নম্বর ওয়ার্ড থেকে তিনি ইউপি সদস্য নির্বাচিত হন। এছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে উপজেলা পরিষদের মহিলা সদস্যও নির্বাচিত হন। নারী-পুরুষের সুখে দুঃখে তিনি রাতদিন ছুটে যান । লাকী চৌধুরী ৭নং রাউজান ইউনিয়নের মোহাম্মদপুর এলাকার জালাল আহমদের মেয়ে। তার স্বামীর বাড়িও একই এলাকায়। স্বামীর নাম মো. রুস্তমগীর । সমাজসেবায় স্ত্রীর পাশে থেকে সহযোগিতা ও উদ্ভুদ্ধ করেন রুস্তমগীর। তারা এক ছেলে সন্তানের জনক-জননী।

কথা বলে জানা যায়, ২০০৪ সাল থেকে নারীদের স্বাবলম্বী করে তোলার কাজ শুরু করেন লাকী চৌধুরী। এর আগে তিনি ঢাকা রেনেসাঁ ও চট্টগ্রাম শহরের দিশারী ট্রেনিং সেন্টার থেকে ব্লক, বাটিক, সেলাই, শো-পিচ, পার্লারসহ বিভিন্ন হাতের কাজের প্রশিক্ষণ নেন। সাম্প্রতিক সময়ে ভারত থেকে ফেসিয়ালের উপরও প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছেন। একসময় গড়ে তোলেন কয়েকটি বিউটি পার্লার। তিনি প্রতিবছর তিনজন গরীব অসহায় মহিলাকে নিজের ঘরে রেখে ভরণপোষণ করে তার রাউজান পৌরসভা সদরের লাকী বিউটি পার্লারে রূপচর্চার কাজ শেখান। পরে তাদের প্রত্যককে ৫০ হাজার টাকা করে সম্মানী দেন।

এরপর প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা কেউ বিভিন্ন এলাকায় দোকান বা রূপচর্চার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দেন, কিংবা শহর-বন্দরে চাকুরি নেন। ২০০৭ সাল থেকে এরকম প্রশিক্ষণ নিয়ে ৪০ নারী এখন দেশ-বিদেশে রূপ চর্চার নিজস্ব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে এবং চাকুরি করে আর্থিক সচ্ছলতা এনেছেন। এরমধ্যে রাউজানের গহিরার ইমু, হাটহাজারীর দুই বোন শারমিন, জেসমিন, চাক্তাইয়ের সেলিনা আকতার, কদলপুরের ঝর্ণা, রাঙ্গামাটি জেলার ঘাঘড়ার পম্পি নাথ চট্টগ্রাম শহরে কাজ করেন। এছাড়া রাঙ্গুনিয়ার টান্ডাছড়ির রুমা আকতার সৌদি আরবে, কদলপুরের উর্মি আকতার আবুধাবিতে রূপ চর্চার চাকুরি নিয়ে গমন করেন। পূর্ব রাউজানের কুসুম আকতার হাটহাজারীতে, মোহাম্মদপুরের জেসমিন আকতার মনি, বেরুলিয়ার মানু ঢাকায় ও রাউজানে নিজস্ব প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন।

এছাড়াও বর্তমানে পাঁচজন অসহায় নারীকে রাউজান লাকী বিউটি পার্লার এন্ড বুটিকসে রেখে রূপচর্চা, সাজসজ্জার কাজ শেখানো হচ্ছে। এদিকে মোহাম্মদপুর স্কুল, হাজী আবুল খায়েরের বাড়িসহ বিভিন্নস্থানে গ্রুপিং করে শিক্ষার্থী, স্বামী পরিত্যক্তা মহিলা, অসহায় তরুণী ও আগ্রহী বিভিন্ন বয়সী মহিলাদের ব্লক, বুটিকস, পার্লার, শো-পিচ, সেলাই, ফেসিয়ালসহ বিভিন্ন হাতের কাজের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন একশ জনককে। এ প্রশিক্ষণ নিয়ে তারাও বিভিন্ন এলাকায় কর্মজীবন নিয়ে স্বচ্ছলভাবে জীবন যাপন করছেন।

এছাড়াও যারা ইতিমধ্যে নানা প্রশিক্ষণ নিয়ে গেছেন, তাদের বিয়ে ও আর্থিক সমস্যায় সহযোগিতার হাত বাড়ান লাকী চৌধুরী। নিজের এলাকার গরীব অসহায় মানুষের পাশেও আর্থিক, মানসিক সহযোগিতা করেন তিনি। মাসে দু’তিনটা গরীবের মেয়ের বিয়ে হলে তাদের কোন অর্থ ছাড়াই তার বিউটি পার্লার থেকে সাজিয়ে দেন। মোহাম্মদপুর স্কুলকে কলেজে রূপান্তরের সময় প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নে তিনি নিজের তহবিল ছাড়াও বিত্তশালীদের কাছ থেকে আর্থিক অনুদান এনে দেন। লাকী চৌধুরী তার কর্ম ও সামাজিক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন লিজেন্ড হারবাল বিউটি প্রোডাক্ট’র পক্ষ থেকে শ্রেষ্ঠ বিউটিশিয়ান হিসেবে পুরস্কার।

এছাড়াও ২০১৪ সালে শেরে বাংলা একেএম ফজলুল হক, তারুণ্য সংসদ, স্মার্ট চ্যালেঞ্জার, প্রতিশ্রুতি সংসদসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে পেয়েছেন সম্মাননা। এবছর নারী দিবস উপলক্ষে চট্টগ্রাম শহরের একটি সংগঠনও তাকে সম্মাননা প্রদানের জন্য মনোনীত করেন। গহিরা জে.কে. মেমোরিয়াল হাসপাতাল, আলিকো, জেনারেল হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চাকুরি করে জীবনের স্বচ্ছলতা পাননি পটিয়া উপজেলার রতনপুর গ্রামের পম্পি শীল।

সর্বশেষ তিনবছর আগে তিনি লাকী বিউটি পার্লার এন্ড বুটিকসে এসে কাজ শিখেন। এখনও আছেন। এখন তিনি নিজেই বলছেন রূপচর্চা, সাজসজ্জার কাজটি শিখতে পেরে তার ভালোই লাগছে। অন্য যেসব পেশা ছেড়ে এসেছি, তার মধ্যে এ পেশায় কাজ করে ভবিষ্যত সুন্দর বলে মনে হচ্ছে, যোগ করেন পম্পি। আশ্রয় পাওয়া লাকী আকতার বলেন, লাকী চৌধুরীর কাছে এসে তার প্রশিক্ষণ পেয়ে আমি এখন নিজের পায়ে দাঁড়াড়ে পেরেছি।’

নারী উন্নয়নে দায়িত্ববোধ ও সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখা বিউটিশিয়ান তথা সমাজসেবিকা লাকী চৌধুরী বলেন, ‘গরীব, দুস্থ, অসহায়, সমাজের সুবিধাবঞ্চিত নারীদের স্বচ্ছল ও স্বাবলম্বী করে তোলার উদ্যোশে আমি হাতের কাজের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি সকল বয়সী নারীদের। ভেবেছি সাজসজ্জা ও হাতের কাজের মূল্য এখন খুবই বেশি এবং জনপ্রিয়। তাই মনে করলাম এসব কাজের প্রশিক্ষণ দিলে নারীরা আত্মনির্ভর হবে। কারো মুখাপেক্ষি হয়ে থাকতে হবেনা তাদের। যারা এ পর্যন্ত আমার কাছ থেকে সাজসজ্জা ও অন্যান্য হাতের কাজ শিখেছে, তাদের কেউ ব্যর্থ হয়নি। তারা এখন নিজে কিছু করে সংসার চালাতে পারছে। কর্মজীবন শুরু করেছে। কেউ নিজে প্রতিষ্ঠান করেছে। কেউ বিদেশে গেছে। এটা আমার বড় পাওনা। তবে এমনকাজে আমাকে খুবই সহযোগিতা দিয়ে গেছেন আমার স্বামী রুস্তমগীর। সুত্র : জাগো চট্টগ্রাম