হেলাল হুমায়ুন আছেন হৃদয় জুড়ে

helal-humaon

মাসুদ মজুমদার ::
প্রীতি ও স্নেহভাজন হেলাল হুমায়ুন আর নেই। ৩০ অক্টোবর রোববার সন্ধ্যা ৭টায় তিনি ইন্তেকাল করেছেন। মাগরিবের পর সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে অফিস থেকে বাসায় ফিরছিলাম। আমাদের চট্টগ্রাম অফিসের নূরুল মোস্তফা কাজী ফোনে জানালেন, হাসপাতালে তার লাইফ সাপোর্ট দেয়ার কথা বলেছেন ডাক্তারেরা। সাথে এটাও জানালেন, তার পালস পাওয়া যাচ্ছে না।

মাত্র ১০ মিনিট পর খবর পেলাম, তিনি আর নেই। মৃত্যুর দিন সকালবেলায় ‘খারাপ লাগছে’ বলায় তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়। মাগরিব অবধি অক্সিজেন সাপোর্ট নিচ্ছিলেন। এক সময় তিনি আর অক্সিজেন নিতে পারছিলেন না। তখনই সম্ভবত তার জীবনাবসান ঘটে। এ যেন চলতে চলতে থেমে যাওয়া।

ততক্ষণে স্মৃতিতে জেগে উঠেছে তার সাথে সম্পর্ক ও যোগাযোগের দীর্ঘ সময়ের নানা কথা। ১৯৭৩ সাল, তখন আমরা চট্টগ্রাম কলেজের ডিগ্রির ছাত্র। ’৭৪-এর শুরুর দিকে একঝাঁক মেধাবী তরুণ চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হলেন। হেলাল হুমায়ুন তাদের মধ্যে অন্যতম চৌকস তরুণ। ১৯৭৪ সালেই আমার চট্টগ্রাম জীবন শেষ হয়ে যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেও হেলাল হুমায়ুন ছিলেন সান্নিধ্যে এবং হৃদয়ের কাছাকাছি। চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার বনেদি পরিবারের এই কৃতী সন্তান স্বভাবগত বৈশিষ্ট্যের কারণেই ছিলেন বন্ধুবৎসল, সদালাপি ও সজ্জন প্রকৃতির।

তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যই ছিল সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সেভাবেই জীবন অতিবাহিত করে গেছেন। ব্যক্তিজীবনে তার একটি নিজস্ব আদর্শিক বলয় থাকলেও তার বিচরণ ছিল বৃহত্তম চট্টগ্রাম ও মহানগরী জুড়ে, দল-মত নির্বিশেষে সবার সাথে।

এক দিকে পেশাগত দায়িত্ব, অন্য দিকে সামাজিক দায়বদ্ধতা- কোনোটি মরহুম হেলাল হুমায়ুনের কাছে কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে পেশাগত দায়িত্ব পালন করলেও শেষ পর্যন্ত তার স্থিতি হয়েছিল নয়া দিগন্তে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে চট্টগ্রাম ব্যুরো চিফ হিসেবে তিনি একই সাথে নিউজ ও বাণিজ্যিক-উভয় দিকই সক্ষমতার সাথে দেখভাল করতেন।

এক দিকে সংগঠক, অন্য দিকে অনুসন্ধিৎসু পাঠক হিসেবে তার জানার পরিধি ছিল বিস্তৃত। ইকবাল ও রুমি চর্চায় তার অবস্থান জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি পেয়েছিল। সব ব্যস্ততার সাথে তিনি ঐতিহ্যগতভাবে বাবার হাকিমি চিকিৎসা ধারা রপ্ত করেছিলেন। এ বিষয়ে তার প্রাতিষ্ঠানিক সনদও ছিল।

বাংলাদেশের চিকিৎসা ধারায় হাকিমি ও হাকিমের স্থান আজকের অবস্থানে আসার নেপথ্যে প্রতিষ্ঠান হিসেবে হামদর্দের ভূমিকা যতটা গৌরবময়, ব্যক্তি উদ্যোগের ক্ষেত্রে অন্যদের সাথে হেলাল হুমায়ুনের অবদানও ততটা সমুজ্জ্বল।

কাব্যরসিক হেলাল হুমায়ুন কথায় কথায় ইকবাল ও রুমির উর্দু-ফারসি কবিতা ও শ্লোক আবৃত্তি করতে পারতেন। যেমন তিনি লিখতে পারতেন, তেমনি বলার ক্ষেত্রেও আসর মাত করতে সক্ষম ছিলেন। ছাত্রনেতা হিসেবে তার উত্থান হলেও তিনি রাজনীতির ছায়া কমই মাড়িয়েছেন। সাংবাদিক ইউনিয়ন ও চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব-কেন্দ্রিক তার তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো।

সম্ভবত ২০১০ কি ২০১১ সালে চট্টগ্রাম কলেজ অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য করার জন্য ঢাকায় চলে এলেন। তার অনুরোধে এর জীবন সদস্য হলাম। তার সিনিয়র হয়ে আমরা বেঁচে আছি। আজ হেলাল হুমায়ুন নেই। এটা ভাবতে গিয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলি। জীবন-মৃত্যুর বাগডোর কতটা অনিশ্চিত ও সীমিত, সেটা ভেবে অসহায় বোধ করি খুবই। মাত্র ক’দিন আগে ফোন করে সুখ-দুঃখের খবর জানালেন। আশাবাদী থাকার ভরসা জুগিয়ে তিনিই বিদায় নিলেন।

প্রায় একযুগ ধরে তিনি ফুসফুসের অসুখ নিয়েও পেশাগত ও সামাজিক জীবনে দাপটের সাথে বিচরণ করেছেন। সম্ভবত আরশের মহান প্রভু তার জন্য অসহায় জীবনযাপনের গ্লানি বরাদ্দ না করে চলার পথেই হঠাৎ করে থামিয়ে দিয়ে তার সন্নিধ্যে নিয়ে গেলেন। এ ধরনের মৃত্যু আমরা ও স্বজনদের জন্য কষ্টের, কিন্তু মরহুমের জন্য ছিল রহমতের এবং বিশ্বাসী মানুষের প্রত্যাশার।

আল্লাহ তার সমস্ত সুকৃতির পুরস্কার সম্ভবত মৃত্যুর মাধ্যমে দেয়া শুরু করেছেন। মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে আমাদের হৃদয় উজাড় করা আকুতি- হে প্রভু, তুমি হেলাল হুমায়ুনকে আলমে বরজখে, আদালতে আখেরাতে উত্তম মর্যাদা দাও। তার সব ভালো কাজ কবুল করো। হেলাল হুমায়ুন স্বজন-প্রিয়জনদের কাছে বেঁচে থাকবেন যুগ যুগ ধরে। তিনি আছেন আমাদের হৃদয়জুড়ে।
masud2151@gmail.com

সিটিজিসান.কম/শিশির