‘সৎ সাংবাদিকের কোন বন্ধু থাকতে নেই’

ru

মাধব দীপ ::
এখন চলছে মাল্টিমিডিয়ার যুগ। অন্যকথায় বলা যায়- এখন চলছে ‘মাল্টি-প্লাটফর্ম’ প্রকাশনার যুগ। সাংবাদিকতায় এই ‘প্লাটফর্ম’ (টেলিভিশন, সংবাদপত্র, রেডিও এবং এসবের অনলাইন সংস্করণ, সোশ্যাল মিডিয়া ইত্যাদি) এখন অনেক। বিচিত্র শ্রেণির, সকল বয়সী, সকল রুচির পাঠককে ধরার জন্য একই গণমাধ্যম এখন তাদের খবর একাধিক প্লাটফর্মে প্রকাশ কিংবা প্রচার করছেন।

দিন যত যাচ্ছে- সাংবাদিকতার পরিসর তত বিস্তৃত হচ্ছে। আবার রীতিমতো ‘যন্ত্র’ হয়ে ওঠা এর অডিয়েন্সও (পাঠক, শ্রোতা, দর্শক) মুহূর্তেই কোনো ঘটনা সম্পর্কে জানতে চায়। যেকারণে ওই অডিয়েন্স বিশেষ করে আজকের শিক্ষিত তারুণ্যের কাছে এখন আর কাগজের পত্রিকা বা টেলিভিশন তাৎক্ষণিক খবরের একমাত্র ও ‘দ্রুতগতির’ কোনো উৎস নয়।

চলতি পথে প্যান্টের প্যাকেটে থাকা কিংবা হাতের মুঠোয় থাকা ‘স্মার্টফোনই’ এখন বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত দ্রুতগতির ‘সংবাদ উৎস’। আর এই সুযোগে রীতিমতো অনলাইন মিডিয়ার ‘বিস্ফোরণ’ ঘটেছে সারা পৃথিবীতে (অবশ্য, এ বিস্ফোরণের উপর উন্নত দেশগুলোর নিয়ন্ত্রণ থাকলেও আমাদের দেশের অবস্থা তথৈবচ!)। এমনকি পত্রিকা বা টেলিভিশনও তাদের অনলাইন সংস্করণ চালুর মাধ্যমে এই ‘দ্রুতগতির দৌড়ে’ নিজেদের যুক্ত করে নিয়েছে।

যেকারণে, সংবাদের জন্য অনলাইন দুনিয়ায় উপর অডিয়েন্সের নির্ভরতা এখন হুহু করে বাড়ছে। পরিণতিতে, মিডিয়ার সকল ধরনের প্লাটফর্মেই আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বাড়ছে খবর প্রকাশ বা প্রচারের প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু একে-অপরের সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে কি সবসময় সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতা রক্ষা পাচ্ছে?

আমরা জানি, সাংবাদিকতার সাথে নীতি-নৈতিকতার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। বলতে গেলে প্রতিটি মুহূর্তেই এ পেশায় নীতি-নৈতিকতার ব্যাপারটি মাথায় রাখতে হয়। কী লিখতে যাচ্ছি- কী লিখবো- কতোটুকু লিখবো- কাকে কী প্রশ্ন রাখবো- কখন করবো অথবা কাউকে কোনো ‘ফেবার’ করা হচ্ছে কিনা কিংবা কাউকে কোনোভাবে বঞ্চিত করা হচ্ছে কিনা বা কারও ব্যক্তিস্বার্থে গণস্বার্থকে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে কিনা -এসব প্রশ্ন এ পেশায় একবারেই আটপৌরে ব্যাপার।

এককথায়- এই পেশা বৃহৎ জনোগোষ্ঠীকে নীতি-নৈতিকতার সাথে যতোটা সম্পৃক্ত করে ততোটা অন্য কোনো পেশায় সম্ভব কিনা- ভেবে দেখতে হবে!

তাই সাংবাদিকতায় নীতি-নৈতিকতা মেনে চলা মানে হচ্ছে এই পেশার মর্যাদা ও জনকল্যাণমুখী চরিত্রকেই আরও সমৃদ্ধ করা। কিন্তু কখনো-কখনো কর্তৃপক্ষ বা বিজ্ঞাপনদাতা কিংবা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষা করা কোনো কোনো সময় মিডিয়াহাউসের জন্য ‘ফরজ’ কাজ হয়ে যায়।

তবে, এটা অবশ্যই নতুন কিছু নয় বরং বলা ভালো- এসব চাপ ছাড়া কোনো মিডিয়া কাজ করছে- এমন উদাহরণ পৃথিবীতেই বিরল। এবং এ কারণেই বলতে হয়- এখনো যে পরিমাণ স্বচ্ছতা, জবাবাদিহিতা বা প্রশ্ন করার ক্ষমতা সমাজে বা দেশে বিদ্যমান তার অনেকটাই এনে দিয়েছে এই মিডিয়াহাউজগুলোই।
কিছু উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে এক্ষেত্রে।

বলতে গেলে- কিছু-কিছু ক্ষেত্রে নীতি-নৈতিকতার অনুপস্থিতি ম্লান করে দিচ্ছে সাংবাদিকতার মতো মহান পেশার পবিত্রতা আর সৌন্দর্য। ‘রানা প্লাজা ট্রাজেডি’ সংঘটিত হওয়ার পর এর ধ্বংসস্তূপ থেকে ১৭ দিন পর জীবিত উদ্ধার হওয়া রেশমাকে ক্যামেরা-বুম হাতে নিয়ে ‘কেমন ছিলেন’/ ‘কেমন আছেন’/ ‘কীভাবে জীবিত ছিলেন’ জানতে চাওয়া কতোটুকু নৈতিক? অথচ দেশের একটি টিভি চ্যানেল তা-ই করে দেখাল।

আরেকটি ঘটনার কথা মনে পড়ছে। কয়েক বছর আগে- ককটেল হামলায় রক্তাক্ত অবস্থায় ক্ষত-বিক্ষত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়া প্রায় নিথর এক ব্যক্তির দেহের সমান্তরাল হয়ে তাঁর কাছে এক টিভি সাংবাদিক ‘ঘটনার বিবরণ’ জানতে চেয়েছিলেন!

কিংবা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অবরোধ-হরতালের সময় যেভাবে সাংবাদিকদের বলে-কয়ে ‘দাওয়াত’ দিয়ে ডেকে এনে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা পথে-ঘাটে ‘বীভৎসতা’ তৈরি করে মিডিয়ার নৃশংস ‘ডে-ইভেন্ট’ তৈরি করেছে- তা কখনোই ভুলার নয়। একইভাবে- পুলিশ সুপারের স্ত্রী মিতু হতাকাণ্ডের ঘটনায় তাঁর শিশুসন্তানদের ছবি জনসমক্ষে বারবার নিয়ে আসা- আমাদের সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতাকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

এবং এই ধারা এখনো অব্যাহত রয়েছে। উত্তেজনাপূর্ণ ও মানহানিকর প্রবন্ধ, নিবন্ধ ছাপানো, সাক্ষাৎকার না নিয়ে সাক্ষাতকারদাতার নাম ব্যবহার করে কল্পিত সাক্ষাৎকার ছাপানো বা কারও উদ্ধৃতি বিকৃত করে ব্যবহার করা, সংবাদকে প্রাসঙ্গিক করে তোলার জন্য গায়েবি সোর্স ব্যবহার করা, ছবিকৃতজ্ঞতা (ফটোক্রেডিট) স্বীকার না করা, সরকারি এজেন্ডাসমূহকে সিন্ডিকেটেড হয়ে একই সুর ও স্বরে প্রকাশ করা এবং কখনো-কখনো সাংবাদিক নিজে রাজনীতিবিদ হওয়ায় এ সাংবাদিকতায় নৈতিকতার সঙ্কট দেখা দিচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।

অথচ আমরা জািন- সমাজে নীতি-নৈতিকতা প্রতিষ্ঠায় গণমাধ্যম ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। নৈর্ব্যক্তিক মনোভাব, বস্তুনিষ্ঠতা, পরিশ্রম, সততা, সাহস, পেশার প্রতি একাগ্রতা ও নিষ্ঠা ইত্যাদি ‘ওউন’ করা এক্ষেত্রে সাংবাদিকের অন্যতম প্রধান শর্ত। কিন্তু এই নীতি-নৈতিকতার প্রশ্নে নিজেদের মধ্যে চরম অসঙ্গতি রেখে সমাজের অসঙ্গতি তুলে ধরা হলে এর সাংবাদিকতার মান কোথায় থাকে?

বিশেষ করে, অনলাইন মিডিয়ার যে ‘লাগামছাড়া’ দৌড় শুরু হয়েছে আমাদের দেশে- সাংবাদিকতা পেশার সুনাম অক্ষুণ্ন রাখার স্বার্থে ও এ পেশার নীতি-নৈতিকতাকে সমুন্নত রাখতে এ লাগাম টেনে ধরা জরুরি। কারণ আগেই বলেছি- দিন যতো যাচ্ছে প্রিন্ট ও টেলিভিশনের চেয়ে এসব অনলাইন নিউজপোর্টালের পাঠক বানের পানির মতো হুহু করে বাড়ছে।

সবার আগে ‘হিট’ পাওয়ার উদ্দেশ্যে মরিয়া হয়ে থাকা আমাদের ভাষা-ভাষির এই অনলাইন নিউজপোর্টলগুলো ক্রমাগত পছন্দমাফিক সংবাদ পরিবেশন করে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে অবস্থা যেনো ‘কেহ কারে নাহি ছাড়ে সমানে সমান।’

অবশ্য, ইলেকট্রনিক মিডিয়া হিসেবে কোনো কোনো টেলিভিশনও প্রায়সময়ই ব্রেকিং নিউজের নামে এই জটিলতা তৈরি করছে না- এমনটা বলা যাবে না।
আর এভাবে ক্রমাগতভাবে ব্যক্তি-সাংবাদিক বা কোনো-কোনো মিডিয়ার ‘নীতি-নৈতিকতা বিচ্ছিন্ন আচরণ’ ধীরে-ধীরে সাংবাদিকতা পেশায় ‘সাংঘাতিক’রকমের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একারণেই- এনভেলাপ জার্নালিজম নিয়ে বেশ আলোচনা চলছে সারা বিশ্বজুড়ে।

বাংলাদেশসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ যেমন- ফিলিপাইন, চীন, কোরিয়া, ইন্ডিয়া, ইন্দোনেশিয়া এ ধরনের সাংবাদিকতার চর্চা একেবারেই ‘মামুলি’ ব্যাপার হয়ে উঠছে। সাংবাদিকতার জন্যে এ বড়ো বিপজ্জনক প্রবণতা। এ প্রবণতা চলতে দেওয়া মানে সাংবাদিকরা যে সমাজ বা জাতির ‘দর্পণ’- সেই সুনাম হারিয়ে ফেলারই নামান্তর। এ প্রবণতা রোধে ব্যক্তি সাংবাদিকের বা মিডিয়া-হাউজের যেমন আরও বেশি দায়িত্বশীল হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে তেমনি মাল্টি-প্লাটফর্ম বিশেষ করে দেশের অনলাইন নিউজপোর্টালগুলোর ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি।

তবুও শেষ কথা হচ্ছে- সামাজিক কিংবা রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার প্রশ্নে এখনো এ পেশাই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ মাটি ও মানুষের কাছে। মাটিবর্তী সাংবাদিক কাঙাল হরিনাথ বলেছিলেন, ‘সৎ সাংবাদিকের কোন বন্ধু থাকতে নেই।’ নীতি-নৈতিকতার প্রশ্নে বলবো- এই উক্তির মধ্যেই লুকিয়ে আছে এই পেশার সত্যিকারের পেশাদারিত্ব।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

সিটিজিসান.কম/শিশির