নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে নিশ্চিত করতে হবে সাম্য-সুবিচার

full_171185518_1448429467

মুহাম্মদ আনোয়ার শাহাদাত হোসেন ::
আজ ‘International day for the elimination of violence against women’ বা আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস। একই সঙ্গে আজ থেকে শুরু হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষও। ১৯৬০ সালের ২৫ নভেম্বর ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রে তিনজন নারী নির্যাতনের ঘটনা স্মরণে ১৯৮১ সালের জুলাই মাসে লাতিন আমেরিকায় নারী অধিকার সম্মেলনে ২৫ নভেম্বরকে নারী নির্যাতন বিরোধী দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং প্রতিবছর ২৫ নভেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর বিশ্ব মানবাধিকার দিবস পর্যন্ত নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

১৯৯৩ সালে ভিয়েনায় বিশ্ব মানবাধিকার সম্মেলনে দিবসটিকে স্বীকৃতি দেয়া হয়। জাতিসংঘ দিবসটি পালনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয় ১৯৯৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর। বাংলাদেশে ১৯৯৭ সাল থেকে দিবসটি পালন করে আসছে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রতিবাদ দিবস উদযাপন কমিটি সহ বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠন।

বিকশিত সভ্যতা ও পরিবর্তিত সমাজ কাঠামো নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বিশ্ব। দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে মানুষের জীবনযাত্রা। সময়ের সাথে মানুষ প্রতিনিয়ত এগিয়ে যাচ্ছে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলেও সত্য যে আমরা নারীদের জন্য নিরাপদ সমাজ ব্যবস্থা এখনও নিশ্চিত করতে পারিনি।

অথচ এই নারীর মাধ্যমেই একটি সন্তান পৃথিবীর আলো দেখে এবং সুন্দর আগামীর সূচনা করে। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। অথচ শতকারা ৩৫ ভাগ নারী ও মেয়ে তাদের জীবদ্দশায় কোন না কোন শারিরীক বা যৌন সহিংসতার শিকার। কিছু কিছু দেশে প্রতি দশজনে সাতজন নারী এই সহিংসতার শিকার। আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের ২৯টি দেশে আনুমানিক ১৩৩ মিলিয়ন নারী বিশেষ অঙ্গ হানির মতো সহিংসতার শিকার। জাতিসংঘের তথ্য মতে বিশ্বব্যাপী ৭০০ মিলিয়ন নারী রয়েছে যাদের বিয়ে হয়েছে শিশু বয়সে, ২৫০ মিলিয়ন নারী যাদের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছর বয়সের আগে। অথচ ১৮ বছর বয়সের আগে যাদের বিয়ে হয় তারাই বেশি নির্যাতনের শিকার হয় এবং শিক্ষাজীবন শেষ করার সুযোগ পায়না।

শুধু তাই নয় এসমস্ত নারীরা প্রসবকালীন নানান জটিলতায় পতিত হয় এবং পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়। বাংলাদেশে নারী নির্যাতন বা নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে ১৯৮৫ সালের পারিবারিক আদালত, ১৯৯৫ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন আইন, ২০০০ ও ২০০৩ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, সিটিজেনশিপ অ্যাক্ট-২০০৮, হাইকোর্ট নির্দেশিত যৌন নিপীড়নবিরোধী নীতিমালা-২০০৮ পাস হয়েছে। এত আইন বা নীতিমালা পাস হওয়ার পরও উল্লেখযোগ্য ভাবে নারীর প্রতি সহিংসতা বা নারী নির্যাতন কমেনি।

জানুয়ারী’২০১৬ হতে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে দেশে ধর্ষণ ও গণধর্ষনের শিকার হয়েচে ৪২৮ জন নারী। এসিডে ঝলসে গেছে ৩৩ নারী-শিশুর মুখ। এদেশে এখনো শতকারা ৪১ ভাগ কিশোরীকে বাল্যবিবাহের কারনে স্কুল ত্যাগ করতে হয়।

ইউনিসেফের তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশে প্রতি দুইজন নারীর মধ্যে একজন নিজ পরিবারে কোন না কোন ভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক জরিপে নারীর প্রতি সহিংসতায় বাংলাদেশ পৃথিবীর চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে। দেশে শতকরা ৪৭ ভাগ নারী বিবাহিত জীবনে স্বামী অথবা স্বামীর নিকটাত্মীয় দ্বারা শারীরিকভাবে নির্যাতনের শিকার হয়। জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন রিপোর্ট ২০০৯ অনুযায়ী জেন্ডার উন্নয়ন সূচকে ১৫৫ টি দেশের মধ্যে আমাদের অবস্থান ১২৩ তম। এর অর্থ পুরুষের তুলনায় নারীরা দ্বিগুনভাবে বঞ্চিত হচ্ছে।

সাম্প্রতীক সময়ে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া চাঞ্চল্যকর নারী নির্যাতনের ঘটনায় বুঝা যায় নারীর প্রতি সহিংসতার মাত্রা ও ভয়াবহতা বেড়েছে। গত ৩ অক্টোবর, সিলেট মহিলা কলেজের ছাত্রী খাদিজা আকতার নার্গিসকে যেভাবে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে রক্তাক্ত করেছে তা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে।

এর আগে ১৭ সেপ্টেম্বর মাগুরা সদর উপজেলার সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী হ্যাপী(১২) গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে বখাটেদের অত্যচারে অতীষ্ঠ হয়ে। ১৮ সেপ্টেম্বর মাদারীপুরের মিতু মন্ডল (১৫) কে চুরিকাঘাত করে হত্যা করে মিলন মন্ডল নামে এক বখাটে। ২৪ আগস্ট ঢাকার উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী সুরাইয়া আকতার রিশাকে ছুরিকাঘাতে মারাত্নক ভাবে জখম করে ওবাইদুল খান নামক আরেক বখাটে।

রিশা দুই দিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে মৃত্যুবরণ করে। এর আগে কুমিল্লায় ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় মেধাবী ছাত্রী সোহাগী জাহান তনুকে। প্রতিনিয়ত ঘরে বাইরে নির্যাতিত হচ্ছে এদেশের নারীরা। অনেক সময় নারী-ই নারীদের নির্যাতন করে। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে সকলের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন খুবই জরুরি। নারীকে শুধু নারী হিসেবে বা পুরুষের অধস্তন হিসেবে না দেখে মানুষ হিসেবে দেখতে হবে এবং উপযুক্ত সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। সমাজ বা রাষ্ট্রে একজন পুরুষ যেমন মাথা উঁচু করে তার স্বকীয়তা বজায় রেখে চলতে চায় তেমনি একজন নারীরও সেই অধিকার আছে। যে কোন কর্মকাণ্ডে নারীকে দমিয়ে রাখার বা দূর্বল ভাবার হীনমানসিকতা পরিহার করতে হবে এবং রাষ্ট্টীয় আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার হওয়ার কথা থাকলেও দেখা যায় এক একটি বিচার হতে ৫-১০ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায় যা অপরাধ প্রবণতাকে আশকারা দেয়ার শামিল।

নারী নির্যাতনকারীদের উপর থেকে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় তুলে নিতে হবে, বদলাতে হবে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে নারীদেরকেও পুরুষ বিদ্বেষী মনোভাবের পরিবর্তন করতে হবে।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনানুযায়ী ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী নারী ও পুরুষ সকলের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার, রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত করতে হবে।

সিটিজিসান.কম/রবি