রুট শাসন করেই অর্ধশত কোটি টাকার মালিক এলডিপি ক্যাডার

শুক্রবার, নভেম্বর ১৫, ২০১৯, ১০:২৫ পিএম

নিজস্ব প্রতিবেদক :: চন্দনাইশ উপজেলার কেশুয়া ইউনিয়নের ধাইয়ার বাড়ির দিনমজুর গুরামিয়ার পুত্র মোহাম্মদ জানে আলম। পাঁচ-ছয় বছর আগেও নগরীর নতুন ব্রিজ থেকে নিউ মার্কেট এলাকায় টেম্পু সার্ভিসে হেলপার হিসেবে কাজ করতেন। পরে টেম্পু চালক হন তিনি। এরআগে তার ছিল না কোন সহায় সম্বল ও চাকরি। এখন কোন পেশার সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও অল্প সময়ের ব্যবধানে তিনি এখন বিলাসবহুল গাড়ি, বাড়ি ও বিপুল সম্পদ ও অর্থবিত্তের মালিক। তার এ অঢেল সম্পদের পেছনে রয়েছে পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি ও ইয়াবা ব্যবসা। অল্প সময়ে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হওয়া জানে আলমের ব্যাপারে তদন্তে নেমেছেন সিআইডি। তাদের মতে, ব্যাংকে জমা টাকাসহ সবমিলিয়ে ২০ কোটি টাকার মালিক জানে আলম।

অনুসন্ধানে জানা যায়, জানে আলম খুব ছোট বেলা থেকে কেশুয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যানের বাসায় কাজের ছেলে হিসেবে কাজ করতো। সেখান থেকে গত ৪/৫ বছর আগে চট্টগ্রাম নগরীর পাথরঘাটা এলাকায় বড় বোনের বাসায় চলে আসে কাজের সন্ধানে। এরপর টেম্পু চালকের হেলপারের কাজ নেয় জানে আলম। এরমধ্যে যুদ্ধপরাধের দ-প্রাপ্ত আসামি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিভিন্ন কাজ কর্ম করার সুবাদে তাকে সে এমটি টমটম গাড়ি উপহার দেয়। ওই গাড়ির সুবাদে সে গাড়ির টেম্পুর চালক বনে যায়। এরপর ধীরে ধীরে পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজ জাহেদ হোসেনের হাত ধরে গড়ে তুলে নগরের আলকরণ, পাথরঘাটা এবং ফিশারীঘাট কেন্দ্রিক বিশাল একটি সন্ত্রাসী বাহিনী। এরপর ইয়াবার বিস্তার ঘটলে কোতোয়ালী ও বাকলিয়া থানার বেশ কয়েকজন

সাব ইন্সপেক্টর, মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা পুলিশের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলে সোর্স হিসেবে জানে আলমের কাজের পরিধি বাড়ায়। সে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের আগে থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গাড়ি আটকিয়ে ইয়াবাসহ ইয়াবা ব্যবসায়ীদের আটক করে। এরপর মোটা অংকের বিনিময়ে আসামীদের ছেড়ে দিয়ে এবং পাওয়া ইয়াবাগুলো বিক্রি করে পুলিশের সাথে ভাগাভাগি করে অর্থ উপার্জন করে এখন কোটিপতি। সোর্সের কাজ করার সময় থেকে মোটরসাইকেল ব্যবহার করে আসছে। নতুন ব্রিজ এলাকার গাড়ি আটকিয়ে এবং অনেক নামিদামি মানুষকে ইয়াবার ফাঁদে পেলেও টাকা আদায় করেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, হঠাৎ করে কোটিপতি বনে যাওয়া জানে আলমের গ্রামের বাড়ি কেশুয়ায় গত তিন বছর আগে একটি মাটির ভাঙ্গা ঘর ছিল। এখন সেখানে ৩ তলা বিশিষ্ট বিলাসবহুল ভবন উঠেছে। আরো দুই তলার কাজ চলছে। ওই ভবনের পুরো টাকার জোগানদার ম্যাক্সিমা চালক জানে আলম। বর্তমানে তার ৮টি গাড়ি রয়েছে। এরমধ্যে চার চাকার ক্যাব ঢাকা-মেট্্েরা গ ১১৭২৭১, ম্যাক্সিমা গাড়ি চট্টমেট্্েরা ১১-২৫৪৭, ১১-২৮৫৭, ১১-২৫৪৮, ১১-২২৯৯, ১১-২৮৪৮, অটোরিকশা চট্টমেট্্েরা-১১-২০৪৬ এবং একটি মোটর সাইকেল চট্টমেট্্েরা-১১-৩৩৩৮ রয়েছে। এসব গাড়ি পরিবহন সেক্টরের চাঁদাবাজির টাকায় কেনা। বেশিরভাগ সম্পত্তি তাঁর স্ত্রীর নামে। চট্টগ্রাম নগরীতে অগ্রণী ব্যাংক ও এনসিসি ব্যাংকে নিজের ও স্ত্রীর নামে রয়েছে বেশ কয়েকটি একাউন্ট। স্বনামে-বেনামে রয়েছে একাধিক প্রতিষ্ঠান।

তার আয়ের উৎস :
এক সময় ইয়াবা ব্যবসা করলেও বর্তমানে সে পরিবহন সেক্টর থেকে চাঁদাবাজি করে অল্প সময়ে প্রচুর অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন। চট্টগ্রাম অটো টেম্পু শ্রমিক ইউনিয়নের (রেজি: ১৩০৯) নাম ব্যবহার করে সে নগরীর বাকলিয়া থানার নতুন ব্রিজ থেকে কোতোয়ালী থানার নিউ মার্কেট পর্যন্ত বিশাল একটি সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তুলে পরিবহন সেক্টর থেকে চাঁদাবাজি করছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, নতুন ব্রিজ টু নিউ মার্কেট সড়কে রুট পারমিটবিহীন প্রায় ২ শতাধিক মাহিন্দ্র, ম্যাক্সিমা ও পিয়াজু গাড়ি চলাচল করে। ওই গাড়িগুলো থেকে চট্টগ্রাম অটো টেম্পু শ্রমিক ইউনিয়নের নামে প্রতিদিন ২৫০ টাকা হারে চাঁদা নেন জানে আলমের নেতৃত্বে সন্ত্রাসীচক্র। ওই চক্রে লিটন, কালু, হিরু, রফিক-(১), রফিক-(২), আবুল হোসেন, জামাল উদ্দিন, মোহাম্মদ কাশেম, রুবেলসহ দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীরা রয়েছে। তারা নিদিষ্ট মোড়ে দাঁড়িয়ে চাঁদাগুলো আদায় করে। প্রতিদিন ওই যানবাহনগুলো থেকে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা উঠে বলে জানা গেছে।

একাধিক গাড়ির চালক নাম প্রকাশ না করা শর্তে জানান, অনেক সময় তেমন ভাড়া পাওয়া না গেলেও জানে আলমদের নিদির্ষ্ট করে দেয়া টাকা পরিশোধ করতে হয়। অন্যথায় মারধরের শিকার হতে হয়। তারা জানান, নগরের কোতোয়ালী থানার জিপিও ভবনের সামনে ফুটপাত দখল করে জানে আলম পেট্টল, ডিজেল ও তেলের খোলা দোকান বসিয়ে ওখান থেকে নিতে চালকদের বাধ্য করে। যারা নেন না তাদেরকে নিউ মার্কেট টু নতুন ব্রিজ লাইনে গাড়ি চালাতে বাধা দেন।

অভিযোগ উঠেছে, নতুন ব্রিজ, ফিশারীঘাট, কোতোয়ালী এলাকার ৬জন ট্্রাফিক সাজেন্ট, পাথরঘাটা ও চাক্তাই বিট পুলিশ এবং বাকলিয়া ও কোতোয়ালী থানার ট্্রাফিক ইন্সেপেক্টর (টিআই) এবং থানা পুলিশ ওই জানে আলম ও জাহেদ হোসেনের সাথে সখ্যতা রেখে তাদের কাছ থেকে মানোহারা নিচ্ছে।

সড়কের পাশে খোলাভাবে দাহ্য পদার্থ বিক্রির প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের পরিদর্শক তোফাজ্জল হোসেন বলেন, বিষ্ফোরক লাইসেন্স ছাড়া কেউ ঝুঁকিপূর্ণভাবে দাহ্য পদার্থ বিক্রি করার নিয়ম নেই। কেউ যদি এধরনের কর্মকা- চালিয়ে থাকে তা দন্ডনীয় অপরাধ। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এসব অবৈধ তেলের দোকান উচ্ছেদ করা হবে।

কর্ণফুলী-নিউমার্কেট সড়কে ৫শতাধিক অবৈধ যানবাহন চলাচলে প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নগর ট্রাফিক পুলিশ প্রশাসন (উত্তর) মো. মহিউদ্দিন বলেন, টারগারপাস হয়ে নতুন ব্রিজ পর্যন্ত চলাচলকারী কিছু গাড়ির রুট পারমিট আছেন। লোকজনের সুবিধার্তে এই গাড়ি চলছে সংগঠনের নামে। টাকা নেয়া বিষয়টি তো আমি জানি না। তবে আমি শ্রমিক সংগঠনের সভাপতি জাহিদ ও জানে আলমকে চিনি। শহরের বেশিভাগ এই ধরনের গাড়ি শ্রমিক সংঘটনের নেতৃত্বে চলে। তারপরও অবৈধ যানবাহন সম্পকে েেখাঁজ খবর নেয়া হচ্ছে বরে তিনি জানান।

এদিকে সিআইডির এক কর্মকর্তা বলেন, জানে আলমের সম্পদের তদন্ত করতে গিয়ে প্রায় ২০ কোটি টাকা অর্থসহ সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। যা প্রতিবেদন আকারে উর্ধতন কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়েছে।

জানে আলমের যত সব মামলা-
পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজিতে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠা জানে আলমের বিরুদ্ধে নারী নির্য়াতন, প্রতারণা ,চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপের বিষয়ে একাধিক মামলা রয়েছে। ২০০৯ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা নম্বর-২১২ তার বিরুদ্ধে দায়ের হয়। এক নারীকে বিয়ে করে অস্বীকার করায় মামলাটি দায়ের করেন ওই নারী। এ মামলায় ১১ মাস জেল কেটে জামিনে মুক্তিপান জানে আলম। তার বিরুদ্ধে পরিবহন শ্রমিক নেতা নুরুল বাশর বাদি হয়ে মামলা করেছেন চাঁদাবাজির। ওই মামলায় সে জামিনে আছেন। মোহাম্মদ দুলাল নামের এক ব্যক্তি জানে আলমের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপের অভিযোগ তুলে মামলা করেছেন। সর্বশেষ বিগত সংসদ নির্বাচনের কালিন পুলিশী কাজে বাধা, নাশকতা অভিযোগে এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেন (অব) অলি আহমদ বীর বিক্রমের সঙ্গে আসামি কওে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ থানায় একাধিক মামলা করে পুলিশ ও আওয়ামীলীগ নেতারা।

জানে আলমের বক্তব্য-
পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে জানে আলম বলেন, আমি পরিবহন শ্রমিকদের গোপন ভোটে নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক। আমারতো প্রতিদ্বন্ধী থাকতে পারে। তারাই এ অপপ্রচার চালাচ্ছে। তিনি চাঁদা নেয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, চাঁদা নিই শ্রমিক সংগঠন চালাতে। পুলিশ প্রশাসনসহ অনেক জায়গায় ম্যানেজ করতে হয়। টাকাগুলো ওখানে খরচ করি। ##