মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনের কৌশল

মঙ্গলবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১০:১০ পিএম

মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন-
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় সৃজনশীলতার ছোঁয়া লাগতে শুরু করেছে বেশিদিন হয়নি। অথচ এর পেছনে উদ্যোগ ছিল বহু আগের। বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পরপরই বঙ্গবন্ধুর উদ্যোগে গঠিত ড. কুদরত-ই-খুদা শিক্ষাকমিশনের উদ্দেশ্যেই ছিল একটি গণমুখী আধুনিক ও বিজ্ঞান সম্মত শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তন।

কিন্তু বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে জাতীয় উন্নয়নের অনেক কিছুর মতো ড. কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনও মুখ থুবড়ে পড়ে। দীর্ঘ একুশ বছর পর ১৯৯৬ সালে আবারও একটি শিক্ষানীতি প্রণয়নে পদক্ষেপ নেয়া হয়। ২০০৮ সালে বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে বিষয়টিকে সামনে নিয়ে আসা হয় এবং ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পরপরই স্বল্পতম সময়ের মধ্যে শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও বাসত্মবায়নের পথে অগ্রসর হয়।

এ সংক্রান্ত গঠিত কমিটি মাত্র ৪ মাসের মধ্যে একটি খসড়া শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে। সমাজের প্রায় সকল শ্রেণির পেশার মানুষের ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদগণের মতামতের ভিত্তিতে এটি চূড়ান্ত করা হয়। শিক্ষাকে ভীতিকর বিষয়ের বাতাবরণ থেকে মুক্ত করে এর মাঝে আনন্দ ছড়িয়ে দিতে এই প্রচেষ্টা নেয়া হয়।

সর্বোপরি শিক্ষার্থীদের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, ইতিহাসমূখীতা ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ‘‘বিজ্ঞান মনস্ক মন’’ তৈরিতে প্রণীত হয় জাতীয় শিক্ষানীতি। জাতীয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের প্রথম ধাপেই আসে প্রাথমিক শিক্ষার বিষয়াদি। মূলতঃ অগ্রসর দেশ সমূহ প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে।

এশিয়ার দেশ জাপান এক্ষেত্রে একটি উদাহরণ হতে পারে। তারা প্রাথমিক শিক্ষাকে চুড়ান্ত অর্থেই ‘‘মানসম্মত’’ করতে পেরেছে। একটি জাতির উন্নতি ও উন্নয়নের মূলে রয়েছে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা। বাংলাদেশও এখন এপথে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রত্যেক শিশুর জন্য সমান সুযোগ তৈরি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। প্রতিটি শিশুকে বিদ্যালয়ে টেনে আনা, ঝরে পড়া শুণ্যের কোটায় নিয়ে আসা এই শিক্ষানীতির অন্যতম লক্ষ্য।

এছাড়া অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিদ্যালয়বিহীন এলাকায় নতুন বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, অন্যান্য সুবিধাদি বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষার গুণমান অর্জনে জাতীয় শিক্ষানীতিতে যে সকল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করছে সেগুলো একবার মোটাদাগে বলে নিতে চাই:

এক দেশজ আবহ ও উপাদান ভিত্তিক শিক্ষাক্রম ও আনন্দময় পাঠদানের ব্যবস্থা করা। দুই মৌলিক বিষয়সমূহে এক ও অভিন্ন পাঠ্যসূচি প্রণয়ন। তিন শিশুকে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক গুনাবলী অর্জনের পাশাপাশি বিজ্ঞানসম্মত ও সংস্কৃতিবান হিসেবে গড়ে তোলা। চার দেশ গঠনমূলক কাজে উদ্বুদ্ধ করতে শিশুকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত করা। পাঁচ শিশুদের নিজ স্তরের দক্ষতাসমূহ অর্জনের পর তাকে পরবর্তী ধাপের শিক্ষার প্রতি উৎসাহিত করে তোলা। ছয় শিক্ষার্থীর সামাজিকীরণ, জীবনবোধ ও মৌলিক জীবন-দক্ষতা সৃষ্টিতে সহায়তা করা। সাতশিক্ষার্থীদের মধ্যে কায়িক পরিশ্রমের প্রতি আগ্রহ তৈরি করা। আট সকল জাতি সত্তার নিজস্ব বর্ণমালায় শিক্ষা প্রদান করা। নয় পশ্চাৎপদ এলাকা সমূহের জন্য বিশেষ নজর দেয়া এবং বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের জন্য সমান সুযোগ তৈরির ব্যবস্থা করা।

উপরে উল্লেখিত বিষয়সমূহ বাস্তবায়নের পথে চ্যালেঞ্জও কম নয়। প্রাথমিক শিক্ষায় ব্যবস্থাপনা যেহেতু রাষ্ট্রের মৌলিক সাংবিধানিক দায়িত্ব, তাই এটিকে প্রাইভেট সেক্টরে ছেড়ে দেওয়াও সম্ভব নয়। অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের মানসিকতার উন্নয়ন ঘটানোর জন্যেও এ ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার কাজ করছে । আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় বয়ে গেছে অনেকগুলো ধারা,

যেমন: সরকারি-বেসরকারি, প্রাথমিক-কিন্ডারগার্টেন, বাংলা-ইংরেজী মাধ্যম, ইবতেদায়ী ও বিভিন্ন মাদ্রাসা এসবধারা গুলো একসাথে সমন্বয় করাটাই একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ। এছাড়া আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর পরিবেশ আকর্ষণীয় ও শিশুদের কোমল মতি মনকে আকৃষ্ট করতে পারে এরকম আকর্ষণীয় ও নিরাপদ পরিবেশের উন্নয়নে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে। বাহ্যিক পরিবেশের উন্নয়ন বৃদ্ধির পাশাপাশি সম্পূরক ও সঠিক শিক্ষা সামগ্রীর ব্যবহারও বাড়াতে হবে।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে, ঝরে পড়া শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা। ঝরে পড়া রোধে বহুমাত্রিক পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ শিক্ষানীতিতে রয়েছে প্রতিটি স্কুলের জন্য খেলার মাঠ নিশ্চিতকরণ, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের ক্ষেত্র তৈরি করা, ছেলে-মেয়েদের জন্য আলাদা স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট নিশ্চিতকরণ এবং শারিরীক শাসিত্মর বিধান সম্পূর্ণ বিলোপ করার জন্য ‘‘মাইন্ডসেট’’ তৈরি করতে সকল ক্ষেত্রেই জেলা প্রশাসক, চট্টগ্রাম সরকারের নিরলসভাবে কাজ করছে । প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘‘মিড ডে মিলের’ প্রচলন ঘটালে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ে এবং ঝরে পড়ার হার অনেক কমে যায় বলে দেখা গিয়েছে।

প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছাত্র ছাত্রীদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা এবং ছাত্রীদের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপত্তা বিধান নিশ্চিত করার জন্য সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের নিজ নিজ ভাষায় শিক্ষা গ্রহণের অধিকার রয়েছে। এবিষয়ে প্রতিটি শিশুর নিজস্ব লিখিত বর্ণমালা তৈরি এবং সেই বর্ণমালায় পাঠ্যপুস্তক রচনা গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া প্রাথমিক পর্যায়ে শিশুদের মধ্যে প্রতিবন্ধী কিংবা বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের কথা মাথায় রাখতে হবে। ব্রেইল ও অন্যান্য পদ্ধতির যথাযথ প্রয়োগ বাড়াতে এবং এ বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ সম্পন্ন শিক্ষকের ব্যবস্থা করতে সরকার আন্তরিক। সমাজের অবহেলিত পথশিশুদের শিক্ষাব্যবস্থা মূলধারায় নিয়ে আসতে হবে। প্

রত্যন্ত এবং অপেক্ষাকৃত উন্নত এলাকাসমূহের প্রাথমিক বিদ্যালয়সূহের মধ্যকার বৈষম্যের ব্যবধান দূর করাটাও অত্যন্ত গুরম্নত্বপূর্ণ। শিক্ষা পদ্ধতির ভেতর সৃজনশীলতার যথাযথ প্রয়োগ ঘটানো একটি সত্যিকারের কঠিন কাজ। একাজে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত দক্ষ শিক্ষক তৈরি এবং মুখস্ত পদ্ধতি থেকে সৃজনশীল পদ্ধতিতে রূপান্তরের প্রয়োজনীয় মানসিকতা তৈরি করতে জাতীয় শিক্ষানীতির আলোকে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বিদ্যালয়গুলোর ব্যবস্থাপনা কমিটিগুলোকে সক্রিয় করাটাও সমান গুরম্নত্বপূর্ণ। ব্যবস্থাপনা কমিটি সমূহের দায়বদ্ধতা ও জবাদিহিতা নিশ্চিতের পাশাপাশি শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতার উন্নয়ন, তাদের বেতন স্কেলের উপযুক্ত বিন্যাস, পদোন্নতির সুযোগ সৃষ্টি, শিক্ষকগণের দেশে বিদেশে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের বিষয়গুলোতে সরকার জোর দিয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করতে চাই একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান হিসেবে জেলা প্রশাসন প্রাথমিক শিক্ষাসহ সবগুলো দপ্তরের সমন্বয় সাধন করে থাকে।

একাজ করতে যেয়ে জেলা প্রশাসনকে রুটিন কাজের বাইরেও নানান উদ্যেগ হাতে নিতে হয়। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং প্রাথমিক শিক্ষার মনোন্নয়নে জেলা প্রশাসন নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ইতোমধ্যেই চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বিগত ৩১ শে আগস্ট ২০১৯ খ্রি. তারিখে ১১:৩০ মিনিটে চট্টগ্রাম জেলায় ও সবগুলো উপজেলার প্রায় ২৬০৫ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একযোগে প্রায় ৩০,৬১৫টি গাছের চারা রোপন করা হয়। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এই বৃক্ষরোপন কর্মসূচীতে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষকমন্ডলী, ছাত্র-ছাত্রী, স্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও সদস্যগণসহ অভিভাবক ও সুধী সমাজের ব্যাপক অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা যায়।

পরিবেশ রক্ষায় এবং বৃক্ষরোপনের প্রয়োজনীয়তা ছাত্রছাত্রীদের কোমলমতি মনে ছড়িয়ে দিতে এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে চলমান থাকবে। চট্টগ্রাম জেলার সকল উপজেলার প্রতিটি প্রাথমিক স্কুলে ‘‘মিড ডে মিল’’ চালুর বিষয়ে একটি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলায় ২০১৭ সাল থেকেই প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ২০,০০০ হাজার ছাত্রছাত্রী প্রতিদিনি মিড-ডে-মিল পেয়ে আসছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সমাজের স্বচ্ছল ব্যক্তিদের সহায়তায় উপজেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে এ কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। স্থানীয় ধনাঢ্য ব্যক্তিবর্গের কাঙ্খিত সহায়তা পেলে জেলা প্রশাসন জেলার প্রতিটি উপজেলায় প্রতিটি প্রাথমিক স্কুলে এই কার্যক্রম বাস্তবায়নের নেতৃত্ব দিবে।

জেলা প্রশাসনের নিয়মিত কার্যক্রমের বাইরে প্রাথমিক শিক্ষায় মনোন্নয়ন ও জাতীয় শিক্ষানীতি বাসত্মবায়নের লক্ষ্য প্রাথমিক বিদ্যালয় সমূহের সামগ্রিক পরিবেশে উন্নয়ন ঘটাতে এবং ছাত্রাছাত্রীদের মধ্যে স্কুলে আসার ইচ্ছা তৈরি করতে চট্টগ্রাম জেলার সকল উপজেলা সমূহে জেলা প্রশাসনের পক্ষে নিয়মিত তদারকি, খেলনা ও শিক্ষা সামগ্রী, হারমোনিয়াম, স্কুল ড্রেস বিতরণ, স্কুলের নিরাপত্তায় বাউন্ডারী ওয়াল নির্মাণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। নৈতিকতা প্রসারে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের আরেকটি উদ্যোগ প্রতিটি উপজেলায় প্রত্যেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘‘নৈতিকতা শিক্ষা ডায়েরি’’ চালু করা। প্রতিদিন প্রতিটি শিক্ষার্থীদের এই ডায়েরীতে সংযোজিত নৈতিকতা সংবলিত কিছু প্রশ্নের উত্তর লিখতে হবে। যেমন: গতকাল কোন মিথ্যা বলেছি কীনা?

এরকম সাধারণ অথচ গভীর নৈতিকতা বোধ সম্পন্ন ১০টি প্রশ্নের প্রতিদিনকার উত্তর লিখতে লিখতে এ সংক্রান্ত সাধারন নৈতিক অপরাধজনিত ত্রুটি সমূহ শুণ্যের কোঠায় নামিয়ে আনার প্রচেষ্ঠা নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপনের দোড় গোড়ায় দাঁড়িয়ে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের ঈর্ষনীয় অগ্রগতি রয়েছে। মানসম্মত শিক্ষা এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহের সার্বিক পরিবেশ উন্নয়ন ঘটাতে জেলা প্রশাসনের মনিটরিং এবং সচেষ্ট অবস্থান অব্যাহত রয়েছে। ভবিষ্যতের সুনাগরিকদের গড়ে তুলতে শিক্ষানীতি-২০১০ এর যথাযথ বাস্তবানের কোন বিকল্প নেই।