পহেলা বৈশাখ বাঙালীর চিরায়ত উৎসব!

ফছিহুল হক ফয়সাল | সিটিজিসান.কম

চট্টগ্রাম | ০৭ এপ্রিল ২০১৯, রবিবার ০৩:০০ পিএম |

চট্টগ্রাম: পুরনো বছরের শোক কাটিয়ে নতুন বছরকে আলিঙ্গনের পরম সুখে জাতি হয়ে পড়ে আনন্দে আটখানা। সর্বত্রই ধুম পড়ে গণজাগরণের। জেগে উঠে সংস্কৃতিমনা জাতি। বাঙালীয়ানার ষোলকলা প‚র্ণতা পায় উৎসবের সমারোহে।

দেশজুড়ে সৃষ্ট উৎসবের মহাপ্লাবণের ঢেউ আছড়ে পড়ে প্রকৃতির স্বর্র্গরাজ্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েও। নব উৎসাহ উদ্দীপনায় নতুন বর্ষকে বরণে চঞ্চল হয়ে উঠে সবুজ ক্যাম্পাস। ভোরের আলো ফুটতেই বেজে উঠে বর্ষবরণ উৎসবের ঢামাঢোল। ঢাকঢোলের তালে তালে শিহরিত ক্যাম্পাস মুখরিত হয়ে উঠে শিক্ষার্থীদের পদচারণায়। রঙতুলির আল্পনায় সাজানো হয় স্বপ্নের ক্যাম্পাস।

প্রতিটি স্পট শিল্পীর শৈল্পিক ছোঁয়ায় নবযৌবন লাভ করে।জিরো পয়েন্ট হয়ে শহীদ মিনার চত্বর, বুদ্ধিজীবী চত্বর , বিবিএ অনুষদ,আইটি ভবন হয়ে চাকসু ভবন অবধি সর্বত্রই যেন নান্দনিকতার ছোঁয়া।বৈশাখী আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিটি স্থাপনায় জেগে ওঠে
বাঙালীয়ানার প্রতিচ্ছবি।

তারণ্যের প্রতি পরতে পরতে গজিয়ে উঠে রোমাঞ্চকর অনুভ‚তি। উৎসবের স্নিগ্ধ আমেজ তারুণ্যের কোমল হৃদয়ে জাগিয়ে তোলে সংস্কৃতিবোধের তীব্র অনুরাগ। গ্রীষ্মের কড়ারৌদ্রের চোখরাঙানিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে রুচিশীল তরুণ তরুণী সামিল হয় বাঙালীর প্রাণের উৎসবে।বর্ষবরণকে উপজীব্য করে ক্যাম্পাসময় নয়নাভিরাম আয়োজন যেন খাঁটি বাঙালিত্বের পরিচায়ক।

আবহমান বাংলার চিরাচরিত সুর ধ্বনিত হয় তরুণ তরুণীর বর্ণাঢ্য সাজসজ্জায়।তরুণদের বসনে নকশাখচিত বর্ণিল ঢঙের বাহারি পাঞ্জাবি শোভা পেতে থাকে। লুঙ্গি পাজামা পরিহিত তরুণরা মাথায় গামছা বেধেঁ হাজির হয় খাঁটি বাঙালী বাবুর বেশে। তরুণদের বাহারি সাজসজ্জা রোমাঞ্চকর আবহের সৃষ্টি করে।

রুপসী তরুণীদের সাজপোশাকেও কোন কমতি নেই।নতুন বর্ষকে বরণ করে নিতে তারাও বর্ণিল সাজপোশাকে নিজেদের সাজিয়ে তুলে। লাল শাড়িতে মোড়ানো অপরুপ রমণী দেহ থেকে যেন স্বর্গীয় সুষমা টিকরে পড়ে। যা কবির মানসপটে ভেসে উঠে কাব্যিক ভাবধরায়: “কপালে স‚র্য টিপ, বিচিত্রতর শাড়ি ;
ঝুম ঝুম বাজে কাঁচের বেলোয়ারী
প্রাণের উল­াসে নৃত্য-গীত-হাস্যে
উদ্বেল ওই বাঙালী নারী”(কবি হুমায়‚ন কবীর)।

কপালে দগদগে লালটিপ, গলায় পুঁতির মালা, পরনে লাল শাড়ি পরিহিতা তরুণীর স্থির স্নিগ্ধ হাসিতে চবি রুপ ন্যায় স্বর্গপুরীতে।

তাইতো কবিকন্ঠে ফুটে ওঠে,”আজ শুধুই ভালবাসার উজানে,বাঙালীর বর্ষবরণ আয়োজনে ; রমণীরা আজ সেজেছে নতুন সাজে পায়ে নুপ‚রঘুঙুর বাজে”(কবি আবু জাফর)। বৈশাখের রঙে রঙিন তরুণতরুণীদের মুখাবয়বে উল্কির আল্পনায় সৌন্দর্যজগতে যুক্ত হয় নতুন মাত্রা।বৈশাখের বর্ষবরণ উৎসবের অংশ হিসেবে আয়োজিত মঙ্গল শোভাযাত্রায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক শিক্ষার্থী মিলিত হয়ে উৎসবকে প্রাণবন্ত করে তুলে।

ঢাকঢোলের তালে তালে ভুভুজেলার গগনবিদারী শব্দে মেতে ওঠে পরিচিত প্রাঙ্গণ। বাতাসে ভেসে আসে নাগরদোলার শোঁ শোঁ শব্দ। চবির ঐতিহ্য শাটল ট্রেনের সাংস্কৃতিক বগিগুলোর উল্লাসিত উদযাপনও বাড়তি আনন্দের খোরাক জোগায়। তাদের অভিন্ন সাজপোশাক সমগ্র ক্যাম্পাসকে বর্ণিলতার চাদরে ঢেকে দেয়।

সম আবেগ আমেজের রসদ নিয়ে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর উদযাপনেও কোন কমতি নেই। দিনভর আবৃত্তি সংগঠনগুলোও আবৃত্তি, ম‚কাভিনয় সহ সাহিত্যচর্চার চাদরে মুড়ে দেয় তাদের পরিচিত প্রাঙ্গণকে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কর্তৃক আয়োজিত মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বর্ষবরণ উৎসবের প্রধান আকর্ষণ। ঐতিহাসিক জারুলতলা এর প্রাণকেন্দ্র। আলোচনা সভার পর শিল্পীদের নাচগান পরিবেশনা দর্শকদের মাঝে উচ্ছ¡াসের ঢেউ বইয়ে দেয়।

বাউল ,ভাটিয়ালি, মাইজভান্ডারি সহ অপরাপর লোকগান উৎসুক দর্শকশ্রোতাদের মাঝে উন্মাদনার সৃষ্টি করে। আবহমান বাংলার লৌকিকতা নির্ভর মঞ্চস্থ হওয়া নাটিকা বিশেষ উৎসবের আমেজকে বহুগুণে বাড়িয়ে তোলে। এছাড়া মুক্তমঞ্চে আয়োজিত বলিখেলা,চাকসুর সম্মুখ প্রাঙ্গণে আয়োজিত বউচি খেলা দর্শনার্থীদের প্রমোদিত করে। হাডুডু খেলা,লাঠি খেলা, পুতুল নাচ ইত্যাদি গ্রামীণ ঐতিহ্যও বিনোদনের উৎস।

শহীদ মিনার চত্বর থেকে আইটি ভবনের সামনের রাস্তার দু’ধারঘিরে গড়ে উঠে জমজমাট মেলা। মেলায় দোকানিরা নানান ধরনের দেশীয় লোকজ পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসে । খৈ মুড়িমুড়কি, খৈমুড়ির মোয়া, জিলাপি বাতাসা পভৃতি গ্রামীণ মিষ্টান্নের দোকানও মেলায় দেখতে পাওয়া যায়। বর্ষবরণের এই উৎসবে সামিল হতে আশেপাশের জনপদ থেকে রীতিমত মানবঢল নামে।

নানান বয়সের নরনারীর সাথে তালমিলিয়ে ছোট সোনামণিরাও তাদের বাবা-মাকে সাথে নিয়ে মেলায় ঘুরে বেড়াতে থাকে।বৈশাখী ক্ষিপ্রউন্মাদনা শিশুকিশোরদের কোমল হৃদয়েও আবেদন তৈরীতে ভুলে না।

এই জনাকীর্ণতা,এই কলরব সন্ধ্যাঅবধি মাতিয়ে রাখে চিরচেনা প্রাঙ্গণকে। ধীরে ধীরে সমস্ত উচ্ছ¡াস, ভাবাবেগ ক্ষীণ হতে শুরু করে। সহজাত যান্ত্রিক ব্যস্ততায় ডুবে যায় জনজীবন।

সিএস/সিএম/এসআইজে