দলীয় পরিচয় মুখ্য নয়, ৫ বছর আমরা নিরপেক্ষ থাকবো: মাহাবুবুর রহমান

অনলাইন | সিটিজিসান.কম

চট্টগ্রাম | ২৮ জানুয়ারি ২০১৯, সোমবার ০৪:৪৫ পিএম|

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার মাহাবুবুর রহমান বলেছেন, আমি সবাইকে বলতে চাই, দলীয় পরিচয় আমাদের কাছে মুখ্য নয়। আগামী ৫ বছর আমরা নিরপেক্ষ থাকবো। অন্ততপক্ষে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিপক্ষে নিরপেক্ষ অবস্থান থাকবে। সাংবাদিক, জনপ্রতিনিধি, জনগণ, পুলিশ সবাই মিলে একটি সুন্দর সমাজ গঠন করতে চাই।

সোমবার সকাল ১১টায় নগরের প্রবর্তক মোড়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সংলগ্ন এলাকার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিসিটিভি ক্যামেরার কার্যক্রম উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।

পুলিশ সেবা সপ্তাহ-২০১৯ এর দ্বিতীয় দিনে পাঁচলাইশ থানা কমিউনিটি পুলিশিং কমিটি এ অনুষ্ঠান আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সংলগ্ন এলাকায় মোট ১৬টি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন কার্যক্রম উদ্বোধন করেন পুলিশ কমিশনার।

সিএমপি কমিশনার বলেন, নতুন সরকার হবে অনেক অনেক ‘অ্যাডভান্সড’। গত ১০ বছরের মতো সামনের ৫ বছর হবে, যদি কেউ মনে করে থাকেন, এটা হবে না। এই ৫ বছর গত ১০ বছরের তুলনায় ভিন্ন হবে। এটা আমাদের পুলিশের জন্য যেমন প্রযোজ্য। তেমনি সকলের জন্য প্রযোজ্য। মাদক ব্যবসায়ীর জন্য প্রযোজ্য। এবং যারা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে থাকেন তাদের জন্যও প্রযোজ্য।

তিনি বলেন, জনপ্রতিনিধি মানুষের কথা বলবেন, মানুষের ভালোর জন্য এগিয়ে আসবেন। যে জনপ্রতিনিধি মানুষের কথা বলবেন না, সন্ত্রাসীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেবেন, তিনি জনপ্রতিনিধি হতে পারবেন না। আপনারা গত ১৫-২০ দিনে দেখেছেন, সারা বাংলাদেশে কোন অপরাধ হলে সে সরকারি দলের হোক, বিরোধী দলের হোক, সমানভাবে ‘ট্রিটমেন্ট’ পাচ্ছে।

তিনি বলেন, পুলিশে সব ভালো মানুষ- এমনটা কখনোই না। আমাদের পুলিশের মধ্যেও খারাপ মানুষ আছে। ভালো পুলিশকে পুরস্কৃত করতে চাই। খারাপ পুলিশকে তিরস্কৃত করতে চাই।

নগরবাসীকে থানায় গিয়ে প্রয়োজনীয় সেবা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে পুলিশ কমিশনার বলেন, আপনারা মহানগর এলাকার প্রতিটি থানায় যাবেন। দেখবেন, বিভিন্ন বুথ সাজিয়ে, স্টল সাজিয়ে পুলিশ অফিসারবৃন্দ সেবা দেওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে বসে আছেন আপনাদের অপেক্ষায়।

‘পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট নিতে, আপনি সে স্টলে যাবেন। নিজের হাতে পূরণ করবেন আবেদন। আপনার পাসপোর্টের ভেরিফিকেশন কি পর্যায়ে আছে, আপনি নিজে বসে দেখবেন। মন চাইলে, কোন সমস্যা হলে ওই বুথে বসে আপনি জিডি করবেন। সেখানে নারী ও শিশুর জন্য আলাদা ডেস্ক আছে, আলাদা অফিসার আছেন। সেখানে অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নিজে বসে থেকে আপনাদেরকে সেবা দিচ্ছেন।’ যোগ করেন সিএমপি কমিশনার।

তিনি বলেন, এই সেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে হচ্ছে আমরা চাই, থানা হবে ভালো মানুষের আবাসস্থল। থানায় শুধু টাউট-বাটপার, পুলিশের দালাল, যাবে না, থানায় যাবেন বিজ্ঞজন, সুধীজন, জ্ঞানীজন। আমরা চাই শিক্ষিত লোক, জনপ্রতিনিধি, যাদের কোনো দুর্নাম নেই, যাদের কোনো বাজে রেকর্ড নেই। তারা থানায় যাবেন। এই উদ্দেশ্যেই আমাদের সেবা সপ্তাহের প্রচারণা হয়েছে। আশা করি, সেবা সপ্তাহের প্রতিটি দিন আমরা যে শিক্ষা নেবো, বছরের বাকি ৫১ সপ্তাহ সে আলোকে পথচলার চেষ্টা করবো আমরা।

আমরা সবাইকে আহ্বান জানাচ্ছি, থানায় আসুন। থানায় এসে আপনাদের অভাব, অভিযোগ বলুন। কোন পুলিশ অফিসার যদি আপনাদের পক্ষে না দাঁড়ায়, আপনার সমস্যা সমাধানে যদি ভালো উদ্যোগ না নেয়, আমাদেরকে জানাবেন। কথা দিতে পারি, আমরা ভালো পুলিশের পক্ষে, খারাপ পুলিশের পক্ষে আমাদের অবস্থান নেই।

সিএমপি কমিশনার মো. মাহাবুবুর রহমান বলেন, ভালো মানুষ যেমন সমাজে আছে, পরিবারে আছে। তেমনি আমার পরিবারেও ভালো পুলিশ আছে। পাশাপাশি খারাপ পুলিশের সংখ্যাও কম নয়। আমরা চাই এ ধরনের পুলিশকে শনাক্ত করার জন্য। আপনারা থানায় যদি না যান, ভালো মানুষ যদি থানায় না যায়, তাহলে আমরা ভালো কথা শুনতে পারবো না, ভালো উপদেশ পাবো না। আমরা আশা করি, আপনারা থানায় আসবেন। থানার সেবা নেবেন। থানা ধন্য হবে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ সংলগ্ন এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনে সহযোগিতা করায় ৩২ নম্বর বিট কমিউনিটি পুলিশিং সভাপতি জসিমুল আনোয়ার খানকে ধন্যবাদ জানিয়ে পুলিশ কমিশনার বলেন, এই শহরে লক্ষ লক্ষ জসিমুল আনোয়ার খান আছেন। একটু এগিয়ে আসলে তাঁর এলাকা, পরিবার, বাসা নিরাপদ থাকে। মাত্র ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা ব্যয় হয় একটি সিসিটিভি ক্যামেরায়। সুতরাং এরকম ১০০ ক্যামেরা লাগানোর মত ১ হাজার লোক আছে চট্টগ্রাম মহানগরীতে।

আমরা আশা করবো, সেই সব বিত্তবান লোকজন তাদের নিজেদের নিরাপত্তা, বাসার, মহল্লার নিরাপত্তার জন্য এগিয়ে আসবেন। আশা করি, সারা শহর সিসিটিভি ক্যামেরার আওতার মধ্যে আসবে।

সিসিটিভি ক্যামেরা সন্ত্রাসী, ছিনতাইকারীদের জন্য সতর্কবার্তা উল্লেখ করে সিএমপি কমিশনার বলেন, যে সব ছিনতাইকারী মোটর সাইকেলে উঠে কারো মোবাইলে হাত দেয়, গলার চেইন নিয়ে যায়, তাদের জন্য সিসিটিভি ক্যামেরা সতর্কবার্তা। আমাদের উদ্যোগ থাকবে, সারা শহর সিসিটিভির মধ্যে নিয়ে আসবো। উন্নত দেশে, ইউরোপে শহরের প্রতিটি ইঞ্চি সিসিটিভির আওতার মধ্যে। এজন্য সেখানে অপরাধ হলে দ্রুত উদঘাটন হয়। অপরাধী দ্রুত গ্রেফতার হয়।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) আমেনা বেগম বলেন, চীনে সিসিটিভি ক্যামেরার সংখ্যা ২২ মিলিয়ন। আমরা সেখানে ১৬টি দিয়ে শুরু করেছি। আমরাও ইনশাআল্লাহ তার কাছাকাছি যাব। কারণ আমরা একটা নিরাপদ, সুশৃঙ্খল জীবন চাই। আমরা চাই, মানুষ নিরাপদে ঘুমাক।

তিনি বলেন, ভালো মানুষের সংখ্যা ৯৯ ভাগ। বাকি একভাগ খারাপ মানুষ। সেই খারাপ মানুষদেরকে আমরা বার্তা পৌছিয়ে দিতে চাই, সিসিটিভি ক্যামেরা দিয়ে আমরা সবসময় সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছি, সব হাতের মুঠোয়। যদি কোন ঘটনা ঘটে, অপরাধীকে শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনা হবে।

অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) বিজয় বসাক বলেন, উত্তর জোনের প্রতিটি এলাকা আমরা সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনতে চাই। যে কোন মানুষ ঘরের দরজা থেকে বের হওয়ার পরই তিনি যেন সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় থাকেন, একইভাবে যিনি ঘরে ফিরে যাবেন তিনিও যেন সুস্থভাবে ফিরে যেতে পারেন, সেই চিন্তা থেকেই আমরা সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের কার্যক্রম শুরু করেছি।

পাঁচলাইশ থানা কমিউনিটি পুলিশিংয়ের আহ্বায়ক শামছুল আলম শামীমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন চকবাজার ওয়ার্ড কাউন্সিলর সাইয়েদ গোলাম হায়দার মিন্টু, বাগমনিরাম ওয়ার্ড কাউন্সিলর গিয়াস উদ্দিন, শুলকবহর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোরশেদ আলম, সংরক্ষিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর আঞ্জুমান আরা ও ৩২ নম্বর বিট কমিউনিটি পুলিশিং সভাপতি জসিমুল আনোয়ার খান।

এ সময় নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (উত্তর) মিজানুর রহমান, সহকারী পুলিশ কমিশনার (পাঁচলাইশ) দেবদূত মজুমদার, পাঁচলাইশ থানার ওসি আবুল কাশেম ভুঁইয়া ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক জহিরুল হক ভুঁইয়া প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠান শেষে পাঁচলাইশ থানা প্রাঙ্গণে পুলিশ সেবা সপ্তাহ উপলক্ষে স্থাপিত বুথ পরিদর্শন করেন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার মো. মাহাবুবর রহমান।

সিএস/সিএম/এসআইজে