ছোট্ট লেবুও তেতো রস বের করে দিয়ে প্রতিবাদ জানায়

সাইদ রহমান :: অতি কচলালে একটা ছোট্ট লেবুও তেতো রস বের করে দিয়ে প্রতিবাদ জানায়। হালে ক্ষমতার মসনদে থাকা কিংবা হালুয়া রুটির জন্য তার আশপাশে ঘুরঘুর করা লোকজন যেভাবে সকাল-সন্ধ্যা ‘জামায়াত-শিবির’ নামক কোরাস গাইছে তাতে স্বাভাবিকভাবেই এটি অতি কচলানো লেবুর মতো উল্টো ফল দিতে শুরু করেছে। চর্বিত চর্বণ এই ট্যাগ পড়ে যাচ্ছে এমন সব লোকজনের ঘাড়ে যা দেখে জামায়াত-শিবিরের লোকজনও নিশ্চয়ই আড়ালে-আবডালে মুচকি হাসে।

টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া অবধি বর্তমানে এমন কোনো ঘটনা নাকি ঘটছে না যার জন্য জামায়াত-শিবির দায়ী নয়। এই বিস্ময়কর ক্ষমতার বিষয়ে সিআইএ কিংবা মোসাদ জানতে পারলে কপাল খুলে যাবে জামায়াত-শিবির কর্মীদের! ক্ষমতাসীনদের ‘জাবর কাটা’ তাই হিতে বিপরীত হতে পারে। বোধকরি, এ মুহূর্তে সংগঠনটি যদি তাদের কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধও করে দেয় তারপরও তারা বেশ ভালোভাবেই বেঁচে থাকবে ক্ষমতাপন্থিদের ঠোঁটে ঠোঁটে। সবমিলিয়ে ‘জামায়াত-জিকির’ তাদের উপকার বই ক্ষতি কিছু করছে না।

উপকার হার্টের রোগীদেরও হচ্ছে। তারা এই ওসিলায় এক পশলা হেসে নিতে পারেন। কারণ বিষয়টি ইতোমধ্যে কৌতুকের পর্যায়ে পৌঁছেছে। ক্যাম্পাসগুলোতে চলমান আন্দোলনের কথাই ধরা যাক, সবই নাকি চলছে শিবিরের নেতৃত্বে। সর্বশেষ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা ন্যায্য ও স্বতঃফূর্ত দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের সব কৃতিত্ব উপাচার্য তুলে দিয়েছেন শিবিরের হাতে। এই মাগনা স্বীকৃতির জন্য শিবির নিশ্চয়ই তার কাছে আজীবন কৃতজ্ঞ থাকবে।

এই বিশ্ববিদ্যালয়েই উপাচার্যকে উদ্ধার করার ‘গণঅভ্যুত্থানে’র সময় ছাত্রলীগ শিবির ট্যাগ দিয়ে পিটিয়েছে সনাতন ধর্মের তিন ছাত্রকে। তারা হলেন সৌমিক বাগচি, সুদীপ্ত দে ও অমর্ত্য রায়। বলা যেতে পারে, এর মধ্য দিয়ে চলতি শতাব্দীর সবচেয়ে বড় আবিষ্কারটি হয়েছে ছাত্রলীগের হাতে, তা হলো, ‘সনাতন শিবির’।

এই ট্যাগের তালিকা অনেক বড়। ভিপি নুরুল হক নুরকে এ পর্যন্ত কতবার যেন মারা হলো? যন্ত্রের সাহায্য ছাড়া শুধু আঙ্গুলের কর গুনে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া মুশকিল হবে। সে এক সময় ছাত্রলীগের কমিটিতে ছিল, কিন্তু তারপরও প্রত্যেক আক্রমণের আগে তাকে ‘শিবির’ ট্যাগ দেওয়া হয়েছে। এই ট্যাগটা নুর মেনে না নিয়ে বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে বলেই সে বেঁচে গেল (আগামীতে তার কপালে আরও কত মার আছে তা অবশ্য এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না)!

ফ্যাসিবাদের একটা ধর্ম আছে। সেটা হলো, ‘প্রতিপক্ষ’ ছাড়া সে টিকতে পারে না। সম্ভবত নামকাওয়াস্তে আধমরা একটা বিরোধী দল হওয়াতে ক্ষমতাসীনরা প্রতিপক্ষ সংকটে পড়েছে। এই আকাল কাটাতেই যাকে-তাকে রাজাকার বলছে, জামায়াত-শিবির বানাচ্ছে। ‘জামায়াত-শিবিরের পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে’-এমন একটা মনোভঙ্গি তাদের। কিন্তু চাইলেই যেহেতু তাদের হাতের কাছে পাওয়া যাচ্ছে না সুতরাং কারও না কারও ঘাড়ে ট্যাগটা চাপিয়ে দিয়ে হলেও হামলে পড়তে হবে।

ক্ষমতাসীনদের কাছে জামায়াত-শিবির একটা ‘পলিটিক্যাল টয়’। এই খেলনা নাড়াচাড়া করেই দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিতে টিকে আছে বিশাল একটা গোষ্ঠী। ধরুন, ক্ষমতাসীন দলের কোনো একটি অঙ্গ-সংগঠনের কমিটি গঠন করা হবে, এমন সময় দু’একটা জামায়াত-শিবিরকে পেটাতে পারলে তার চেতনার পারদ বেশ খানিকটা উপরের দিকে উঠে। এতে করে ‘পদ’ বাগানোর সম্ভাবনা বেড়ে যায়। আবার ধরুন, কারও কিংবা কোনো একটা গোষ্ঠীর সমালোচনা করে তোপের মুখে পড়েছেন কোনো নেতা। ব্যাস, এবার থুক্কু বলে ‘আমি আসলে জামায়াত-শিবিরকে বুঝিয়েছি’ বলতে হবে। তাহলে সব হালাল। সম্প্রতি ধর্ম প্রতিমন্ত্রী এক বক্তব্য দিয়ে তোপের মুখে পড়ে ঠিক এ কাজটিই করেছেন। ‘ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা’ সেটা গলধঃকরণও করেছেন। মসিউর রহমান রাঙ্গা নূর হোসেনকে ‘ইয়াবাখোর’ না বলে শিবির বললে তাকে এভাবে ক্ষমা চাইতে হতো না। বিষয়টা তখন খানিকটা হাসাহাসির ওপর দিয়েই শেষ হয়ে যেত। রাঙ্গা বিষয়টা বুঝতে পারেননি।

যাকে-তাকে জামায়াত-শিবির ব্লেম দেওয়ার রেওয়াজ মাত্রা ছাড়িয়েছে বেশ আগেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে ছাত্রলীগের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতার বিরুদ্ধেও শিবিরের ব্লেম শুনেছিলাম! জামায়াত ট্যাগের হাত থেকে বাঁচতে পারেননি বীর উত্তম, এমনকি সেক্টর কমান্ডাররাও। এদিক থেকে বীরশ্রেষ্ঠরা নেই বলে বড় বাঁচা বেঁচে গেলেন।

বিষয়টা হয়ে যাচ্ছে রাখাল বালকের ওই গল্পের মতো। তৃতীয় দিনে সত্যি সত্যি বাঘ এলেও মানুষ আর ঘর থেকে বের হয় না। তেমনিভাবে আজ এটা করে শিবিরকে ব্লেম দেওয়া হচ্ছে, কাল সেটা করে শিবিরকে ব্লেম দেওয়া হচ্ছে। এভাবে যখন সত্যিই শিবির কোনো দুষ্কর্ম করবে সেদিন সেই সত্যটাও মানুষকে বিশ্বাস করাতে বেগ পেতে হবে নিঃসন্দেহে।

বলা হয়ে থাকে, নেগেটিভ মার্কেটিং ইজ দ্য বিগেস্ট মার্কেটিং। জামায়াত-শিবিরের ব্যাপারে চেতনার একচ্ছত্র ঠিকাদারি নেওয়া লোকজন ক্রমাগত এই মার্কেটিং করে চলেছে। আর যাকে-তাকে ট্যাগ দেওয়ার সমস্যা তো আছেই। যে শিশুটি এখনো শিবিরকে ভালোভাবে জানে না, সে ভাববে, সংগঠনটির ব্যাপারে আগে-পিছের সব অভিযোগই বোধহয় এমন ফাঁপা। ব্যাস, এভাবে তার সহানুভূতি তৈরি হওয়া শুরু হয়। চূড়ান্তভাবে শিবির যখন তাকে বোঝানোর চেষ্টা করে, ওই দেখ, আবরারকে যে মারল, সে তো আসলে শিবির করে না। জাবিতে শিবিরের নাম দিয়ে পেটানো হয়েছে হিন্দু ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদের। ব্যাস, এ প্রক্রিয়ায় নতুন একজন কর্মী যোগ হয় শিবিরের পতাকাতলে।

আবরার হত্যার পর প্রগতিশীলতার ধ্বজাধারী একজন ফেসবুকে লিখেছেন, ‘সে শিবির করত এটা মিথ্যা না। কিন্তু ছেলেটাকে মারা উচিত ছিল না, যদিও সে দুধে ধোয়া তুলসীপাতা না, সে শিবির এটাই সত্য।’ পরিষ্কারভাবে এই মতামত ব্যক্তকারীও ছাত্রলীগের কুকর্মের একজন সক্রিয় সঙ্গী। আবরার হত্যার দায় তারও কম নয়। ভবিষ্যতে অন্য কোনো আবরার খুনের পথটা কিছুটা হলেও এই স্টাটাসের মাধ্যমে তৈরি হয়ে যায়।

এখানে একটা বিষয় পরিষ্কার করা দরকার- আবরার শিবির করত না তাই তার হত্যাকাণ্ডে প্রতিবাদের টর্নেডো বয়ে গেছে। যদি সত্যিই সে শিবির করত তাহলে ৩৭ দিনের মাথায় চার্জশিট তো দূরের কথা, নিদেনপক্ষে একটা মামলা হতো কিনা, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করার অবকাশ আছে।

প্রশ্নটা ঠিক এখানেই, শিবিরকে পেলেই যে পেটানো যাবে, এটা আমাদের সংবিধানের কোন অনুচ্ছেদে আছে? সরাসরি না থাকলে কোন অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যায় তা আছে? কিংবা তাও না থাকলে কোন আইনে বলা আছে, তা জানিয়ে দেওয়া উচিত। কিন্তু জানিয়ে দেওয়ার আগ পর্যন্ত আপনি যতদিন শিবিরের রাজনৈতিক অধিকার স্বীকার না করবেন, ততদিন আপনাকে শিবির ট্যাগ দিয়ে পেটানো বন্ধ হবে না। কারণ আপনি শিবিরের ওপর বলপ্রয়োগের পক্ষে (যেহেতু শিবির মারতে গিয়ে ভুলে অন্য কাউকে মেরে ফেললেই শুধু আপনি প্রতিবাদ করেন)। আপনি তাদের মতাদর্শিক মোকাবেলার পক্ষে নন।

রাষ্ট্রের যতটুকু সিদ্ধ সীমানা, ততটুকু পর্যন্ত একজন নাগরিক তার ইচ্ছানুযায়ী বিচরণ করবে, এটাই স্বাধীন দেশের নিয়ম। রাষ্ট্র যদি কোনো গোষ্ঠীকে তার জন্য হুমকি মনে করে তবে যথাযথ নিয়মে তাদের নিষিদ্ধ করুক। তারপর জনগণের কাছে পরিষ্কার নির্দেশনা পৌঁছে দিক যে, এরা এখন থেকে নিষিদ্ধ, এদের সঙ্গে এই এই করা যাবে এবং এই এই করা যাবে না।

ক্ষমতাসীনরা চতুর বটে! তারা জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে লড়াইটা সারতে চান শুধু ‘ঘৃণা’ দিয়েই। ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ প্রক্রিয়া। রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করার কোনো পন্থা নেই, কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডা নেই। জামায়াত-শিবিরের ব্যাপারে বরাদ্দ শুধু ছিঃ ছিঃ। নিষিদ্ধ না করে মুলোটা ঝুলিয়ে রাখতে হবে তো! অনেকটা ক্যারামের লাল ঘুঁটির মতো, পকেটে ফেলতে পারলে পয়েন্ট বেশি বটে কিন্তু তাতে খেলাটা যে শেষ! তেমনিভাবে সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করলেই তো তাদের নিয়ে ‘রাজনৈতিক ব্যবসাটা’ আর থাকে না।

ইতিহাসের মুখ অবশ্য বন্ধ রাখা যায় না। জামায়াতের সঙ্গে আমেদুধে মিশে সরকার নামানো হালাল, সংসদে একসঙ্গে বসা হালাল, যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে মেলামেশা হালাল, এমনকি তাদের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কও হালাল। যত হারাম অন্যদের বিষয়ে। জামায়াতের সঙ্গে এই করা সমস্যা, ওই করা সমস্যা, হেন-তেন, আরও কত কী!

দলটির কোন নেতার সঙ্গে কে কবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা বলেছে, কে সেলফি তুলেছে, কে ফেসবুকের বন্ধু তালিকায় আছে, জামায়াত নেতার কললিস্টে কার নম্বর পাওয়া গেছে, জামায়াতের বিশ্ববিদ্যালয়ে কে পড়ায়, জামায়াত নেতার লেখা বই কে পড়ে, জামায়াতের প্রতিষ্ঠানে কে চাকরি করে, জামায়াতের হাসপাতালে কে চিকিৎসা নেয়…। আর কিছুই না, এ প্রক্রিয়ায় জামায়াত শক্তিশালী হয় মাত্র।

আমরা বলে থাকি, দেশের সবচেয়ে সচেতন শিক্ষার্থীরাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় বা ভর্তি হয়ে সচেতন হয়ে ওঠে। এখন একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন- এই শিক্ষার্থীরাই কেন শিবির করে বা করতে হয়? শিবির নিয়ে হাজার হাজার আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে ঠিক এই পয়েন্টে আজ পর্যন্ত কোনো আলাপ খুঁজে পাইনি। পাইনি, বোধহয় আলোচনাটা বড্ড নিষ্ঠুর বলে। এই আলোচনা মানে তো উপরের দিকে থুতু ফেলা। বড় দুটি দলের ছাত্রসংগঠন আদর্শিক রাজনীতির পরিবর্তে গুণ্ডামির রাজনীতি করার কারণেই সুযোগটা লুফে নেয় শিবির। সোজা কথা, এটা অপরাপর ছাত্র সংগঠনের ‘ইন্টালেকচুয়াল ভ্যাকুয়ামে’র ফসল।

চেতনান্ধরা কিছুটা শিশুসুলভ, অবিকশিত মস্তিষ্কের। ‘জামায়াত-শিবিরের টাকা’ প্রপঞ্চটি ব্যবহার করে এরা প্রায়ই বলে, কারা এই টাকা খায়, সেটা নাকি তারা জানে। যদিও নিজেরটা বেমালুম চেপে যায়। এদের কে বোঝাবে- জামায়াতের টাকা বলে আলাদা কিছু নেই। জামায়াতের কর্মীরা পকেটে যে টাকা নিয়ে ঘুরে বেড়ায় সেটাতেও জাতির জনকের ছবি সাঁটানো আছে এবং লেখা আছে, ‘চাহিবা মাত্র ইহার বাহককে দিতে বাধ্য থাকিবে।’ চেতনার নামে এরা দিশাহারা। আপনার ঘরে ঢুকে বললে, ছিঃ ছিঃ আপনার ঘরে পাকিস্তানি ফ্যান ঘুরছে কিংবা খেতে বসে বলবে, ওহ, পাকিস্তানি কক আমি খাই না!

মনে রাখা দরকার, কোনো না কোনোভাবে আজকে ছাত্রলীগের সব কুকর্মের কিঞ্চিত হলেও বেনিফিশিয়ারি শিবির। আর যাকে-তাকে শিবির ট্যাগ দিয়ে নিগ্রহ করার বেনিফিশিয়ারি তো বটেই। তা ছাড়া আজ যারা মনের আনন্দে যাকে-তাকে জামায়াত-শিবির ট্যাগ দেওয়ার রাজনীতির জন্ম দিয়েছেন, তাদের মনে করিয়ে দিই-ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দানব কিন্তু প্রভু চিনে না। সুতরাং সাধু সাবধান!

সাইদ রহমান : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
sayd.rahman99@gmail.com