‘চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় দুদক কম্প’ গণ বদলী

নিজস্ব প্রতিবেদক : চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও ভূমি অধিগ্রহণ (এল.এ) শাখায় গত ক’দিন ধরে দুদক কম্প (আতঙ্ক) বিরাজ করছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্থ ভূমি মালিকদের ক্ষতিপূরণের টাকা পরিশোধে অফিসের চেয়ার-টেবিল ছেড়ে মাঠে কাজ করছেন অতিক্তি জেলা প্রশাসক (এলএ) মো. আমিরুল কায়সারসহ এল.এ শাখার কর্মচারীরা।

এরআগে চলতি মাসের ৭ নভেম্বর (বৃহস্পতিবার) বিকেলে নগরের ষোলশহরের দুই নম্বর গেইট এলাকায় চট্টগ্রাম শপিং কমপ্লেক্সের দ্বিতীয়তলার একটি দোকান থেকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের পিয়নসহ দুইজন কর্মচারী দুদকের জালে আটকরা পরে। দুদকের ওইদিনের অভিযানে আটক দুই কর্মচারীর মধ্যে রয়েছে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এল.এ শাখার চেইনম্যান নজরুল ইসলাম বাবু (৫৫) ও তার সহযোগী অফিস কর্মচারী তছলিম উদ্দিন। অভিযানকালে নজরুলের দোকান থেকে ভূমি অধিগ্রহণের শত শত ফাইল ও নগদ ৮ লাখ টাকা ও কথিত কমিশন নামক ঘুষের কোটি টাকার চেক জব্দ করে দুদক সদস্যরা। এদিন তছলিম ‘ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের’ ভাগের টাকা নিতেই গিয়েই দুদকের জালে ধরা পড়ে বলে জানা গেছে। এর পরই শীর্ষ কর্তা থেকে শুরু করে ওই অফিসের পিয়নদের মধ্যে শুরু হয় এই দুদক আতঙ্ক।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় সূত্রে জানাগেছে, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণের শত শত ফাইল ও নগদ ৮ লাখ টাকা ও কথিত কমিশন নামক ঘুষের কোটি টাকার চেক দুই কর্মচারী দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযানে ধরা পড়ার পর সরকারি এই সংস্থাটির ৪৫জন সার্ভেয়ারকে একযোগে বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় বদলী করা হয়েছে। এরমধ্যে ১২জনই এলএ শাখায় দীর্ঘ দিনধরে ঘুষ কেলেঙ্কারিতে মেতে ছির। চট্টগ্রাম বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) মো. হাবিবুর রহমান ও সিনিয়র সহকারী কমিশনার (রাজস্ব) খোন্দকার মো. ইখতিয়ার উদ্দীন আরাফাত’র গত ১৪ নভেম্বর যৌথ স্বাক্ষরে এক অফিস আদেশে তাদের বদলী করেন। এরমধ্যে বেশকিছু সার্ভেয়ারকে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে দলী করা হয়েছে। একইভাবে নোয়াখালী হাতিয়া, লক্ষিপুর, টেকনাফ, ফেনী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় বদলী করা হয়েছে।

ওই অফিস আদেশে উল্লেখ রয়েছে, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখার সার্ভেয়ার মো. রফিকুল ইসলামকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া, সৈকত চাকমাকে কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া, মোহাম্মদ আল আমিনকে কক্সবাজারের টেকনাফ, রতন চন্দ্র বৈষ্ণবকে নোয়াখালির হাতিয়া, প্রমেশ^র চাকমাকে লক্ষীপুরের রামগতি, মনিরুজ্জামানকে নোয়াখালীল রামগতি, জেনন চাকমাকে রাঙামাটি সদর, মো. মনিরুল আজাদকে নোয়াখালীর চাটখিল, এ.এইচ.এম মোস্তফা কামালকে নোয়াখালী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এস এ শাখা, মো. মাহবুবুর রহমানকে খাগড়াছড়ির রামগড়, আবুল কালাম আজাদ খানকে ফেনীর সোনাগাজি, মোহাম্মদ শাহজাহান সরকারকে খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে বদলী করা হয়েছে।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এল.এ শাখায় বদলী করা হয়েছে, পটিয়া ভূমি অফিসের মোহাম্মদ বদরুজ্জামান, বোয়ালখালীতে সংযুক্তিতে থাকা চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার রাজন কুমার বড়–য়া, বোয়ালখালীর মো. জহিরুল ইসলাম, নোয়াখালী জেলা প্রশাসনের এস.এ শাখার সংযুক্তি সোনাইমুড়ি উপজেলা ভূমি অফিসের মো. সোহেল রানা, নোয়াখালীর চাটখীল ভূমি অফিসের খাজা উদ্দিন, নোয়াখালীর হাতিয়ার আবদুর রব, নোয়াখালী সদরের মো. মাহমুদুল হাসান, কমিল্লা চৌদ্দগ্রামের আবু কাউসার সোহেল, চাঁদপুরের চাঁদপুর সদরের মো. ইব্রাহীম খলিল, আখাউড়ার মো. মুক্তার হোসেন ও নোয়াখালীর কোম্পানী গঞ্জের মো. হাসান ইমামকে।

একইভাবে চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলা ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার অহিদুর রহমানকে লক্ষীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, রাঙ্গুনিয়ার মশিউর রহমানকে চাঁদপুরের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের আশীষ চৌধুরীকে কর্ণফুলী ভূমি অফিস, চট্টগ্রাম এলএ শাখার মো. রফিকুল ইসলামকে খাগড়াছড়ির সদর, মো. মোস্তফা কামালকে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ, চান্দগাঁও সার্কেল ভূমি অফিসের পেয়ার আহমদকে রাংগুনিয়া, নগরের আগ্রাবাদ সার্কেল ভূমি অফিসের ইউনুচ মিয়াকে রাঙ্গামাটির লংগদু, রাউজান ভূমি অফিসের মো. ফারুক আহমদকে চট্টগ্রাম মহানগরের আগ্রাবাদ সার্কেল ভূমি অফিসে, হাটহাজারী উপজেলা ভূমি অফিসের-কক্সবাজার এলএ শাখায় সংযুক্তিতে থাকা সাইফুল ইসলামকে রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের এল এ শাখা, সোনাগাজির মিজানুর রহমানকে কুমিল্লা চৌদ্দগ্রাম, কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এল.এ শাখার সোনিয়া জাহানকে কুমিল্লা চৌদ্দগ্রাম ভূমি অফিস, কুমিল্লা ব্রাহ্মণপাড়ার মিয়া রুহুল আমিনকে চট্টগ্রাম মহানগরের চান্দগাঁও সার্কেল, চাঁন্দপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এল.এ শাখার মো. মোস্তফা কামালকে চট্টগ্রামের পটিয়া, রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এল.এ শাখার নিরুপম চাকমাকে চট্টগ্রামের হাটহারী উপজেলা, রাঙামাটি সদরের রিপন চাকমাকে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এল.এ শাখা সংযুক্তি কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এল.এ শাখা, খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এল.এ শাখার ক্যারিংটন চাকমাকে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী, খাগড়াছড়ি সদরের চৌজী চাকমাকে চট্টগ্রামের রাউজান, খাগড়াছড়ির মানিকছড়ির আর্য নন্দ তঞ্চঙ্গ্যাকে চাঁদপুরের চাঁদপুর সদর, বান্দরবান জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এল এ শাখার এলটন চাকমাকে নোয়াখালী সদর, কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার দেলোয়ার হোছাইনকে চট্টগ্রাম মহানগরের সদর সার্কেল ও খাগড়াছড়ির রামগড়ের সংযুক্তি কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এল.এ শাখার মিশুক চাকমাকে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এল.এ শাখা সংযুক্তি কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এল.এ শাখায় বদলী করা হয়।

ওই আদেশে আরও উল্লেখ রয়েছে, ২১ নভেম্বর ২০১৯ তারিখের মধ্যে বর্তমান কর্মস্থল থেকে অবমুক্ত হয়ে বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগ দেবেন, অন্যথায় ওইদিন অপরাহ্নে বর্তমান কর্মস্থল থেকে তাৎক্ষনিক অবমুক্ত (স্টার্ন্ড রিলিজ) বলে গণ্য হবে।

এর আগে কোনো ধরনের ভয়-ভীতি ও রাগ-ডাক ছাড়াই চেকের মাধ্যমে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ হারে ঘুষ আদায় করতেন জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ (এল.এ) শাখার কর্মচারীরা। এই নিয়ে বাদ-প্রতিবাদ করতেই প্রতিবাদ কারীর উপর নেমে আসতো বিভিন্ন ধরনের হয়রানী ও মামলার খরগ।

অভিযোগ রয়েছে, ভূমি মালিকের অনুকূলে ভূমির ক্ষতিপূনের ইস্যুকৃত চেক ও নির্ধিারিত অংকের ঘুষের চেকসহ বেশ কিছু দালাল আটক হয় সরকারি একটি গোয়ন্দা সংস্থার হাতে। পরে ওই সংস্থাটি তিন দালাকে চেকসহ চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নিয়ে যায়। সেখানে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পরের দিন চেকের বিষয়টি গোপনকরে তিন দালালকে ভবেঘুরে বলে ৫৪ ধারায় আদালতে চালান দিয়ে পার পাইয়ে দেয়া হয়।

সংশ্লিষ্টদের সাথে কথাবলে জানাগেছে, চট্টগ্রাম শপিং কমপ্লেক্সের দ্বিতীয় তলায় আনুকা স্টোর্স নামক পাঞ্জাবির দোকানেই চলছিল চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের (ডিসি) এলএ (ভূমি অধিগ্রহণ) শাখার ক্ষতিপূরণের টাকার ফাইল প্রসেসিং ও অবৈধ লেনদেন। অনেকে এটিকে ‘অঘোষিত এলএ অফিস’ হিসেবে জানে।

আটক নজরুলের বাড়ি হাটহাজারী উপজেলার মির্জাপুরে। প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ নজরুলকে একবার তাৎক্ষণিক বদলির নির্দেশ দিয়েছিলেন।

এলএ শাখার এসব অনিয়ম ও দুই কর্মচারীর বিষয়ে সংস্থাটির অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এলএ) মো. আমিরুল কায়সার বলেন, দুই কর্মচারীর মধ্যে নজরুলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবে ভূমিন্ত্রণালয়। কারণ সে এল.এ শাখার অধিনে না। তার ব্যাপারে ভূমি মন্ত্রণালয়ে নোট দেয়া হয়েছে। আর অপর কর্মচারী এডিসি (রাজস্ব) এর অধীনে। যতটুকু জানি তাকে চাকরি থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আমরা এখন আর এলএ শাখায় কোনো কাজ সিমাবদ্ধ রাখতে চাচ্ছি না। যে মৌজার কাজ সেই মৌজায় গিয়ে ফাইল প্রসেসিং, শুনানী ও পেমেন্ট দেয়ার কাজ শুরু করেছি। মঙ্গলবার (১৯ নভেম্বর) প্রথম চট্টগ্রামের ভাটিয়ারিতে এই কার্যক্রম শুরু করেছি। ক্ষতিগ্রস্থ কোনো ভূমি মালিক এখন আর এলএ শাখায় এসে দিনের পর দিন ধর্ণা দিতে হবে না।##