কর্ণফুলীতে ঠিকাদারি ও তদবিরে ব্যস্ত আ’লীগ নেতারা

প্রতিনিধি | সিটিজিসান.কম

চট্টগ্রাম | ২৭ এপ্রিল ২০১৯, শনিবার ০৯:৩৫ পিএম |

চট্টগ্রাম : এসময়ে বিএনপির দূর্গখ্যাত চট্টগ্রামের কর্ণফুলীতে মাঝখানে আশা জাগিয়েছিল ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। বর্তমানে তা অনেকটা হারিয়ে যেতে বসেছে পুরা উপজেলায়। ঝিঁমিয়ে থাকা নেতা-কর্মীদের নেই কোনো দলীয় কর্মকান্ড।

কেন না র্দীর্ঘদিন পর উপজেলায় আওয়ামী লীগের একটি কমিটি হলেও তাও প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে প্রকাশ করা হয়নি। কমিটিতে কারা রয়েছেন তবে যে যার মতো স্বেচ্ছায় নিজেদের ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ায় অনেকে বুঝে নিয়েছে কারা রয়েছেন। এতে অনেকে নিশ্চিত ত্যাগীরা জায়গা পায়নি।

উপজেলার ৫টি ইউনিয়ন ও প্রতিটি ওয়ার্ডের সর্বত্রই স্থবিরতা। যার কারণ হিসেবেই দেখছেন; নেতারা ব্যস্ত ঠিকাদারি ব্যবসা, ইজারা, টেন্ডার, মিল-কারখানায় কাঁচামাল সাপ্লাই ও নিজেদের ব্যবসা বাণিজ্য নিয়ে মহা ব্যস্ত। যদিও সাংগঠনিক সমস্যা না থাকায় এক নেতার একাধিক পদ সহ উপজেলায় দল পরিচালনায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ , শ্রমিকলীগ, স্বেচ্ছাসেবকলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাদের অনেক বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। কারণ কোন কমিটির পুর্নাঙ্গ কমিটির রুপ কয়েক যুগেও নেতাকর্মীরা দেখেনি।

অথচ স্থানীয় সংসদ সদস্যের উপর মন্ত্রীত্বেও চাপ থাকলেও প্রতিমাসে সপ্তাহে ঠিকেই এলাকায় আসেন তিনি। মাঠে ঘাটে কর্ণফুলী ও আনোয়ারায় দুই উপজেলার খবরা-খবর নিচ্ছেন ঠিকেই কিন্তু তারপরেও কর্মীদের সাথে তৈরি হয়েছে নেতাদের দুরত্ব। বলা যায়, কর্ণফুলী উপজেলা আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ সাংগঠনিকভাবে অনেকটা নিষ্ক্রিয় ভূমিকায়। প্রশাসনিক কর্মকান্ড আর মন্ত্রীদের সফরকালে মিডিয়ায় মুখ দেখানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান কার্যক্রম।

জানা যায়, বিগত ২০১৪ সালের ১২ অক্টোবর ১৫ সদস্য বিশিষ্ট এডহক কমিটি গঠনের পর থেকে কয়েক মাস চাঙ্গাভাব দেখালেও নির্জীব হয়ে পড়েছে উপজেলা আওয়ামী লীগ। পরে এডহক কমিটির সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি করেও সুফল পায়নি বরং তৃণম‚ল থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন নেতারা। মাঠে থাকা কর্মীদের সাথে দুরত্ব বাড়ছে দিন দিন। এ সমস্যা থেকে উত্তরণে গত বছরের অক্টোবর মাসে এরই মধ্যে এডহক কমিটির সভাপতি পদে পরিবর্তন করে ৭১ সদস্যের কমিটি অনুমোদন দিয়েছেন দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ। তারপরেও সমস্যা কাটেনি।

যদিও তাদের দাবি মাঠে আওয়ামী লীগ সরব রয়েছে কিন্তু কার্যক্রম দেখে সম্পূর্ণ তৃণমুল নেতারাও বিরক্ত পদে থাকা নেতাদের উপর। হচ্ছে না পুরা উপজেলার দলীয় কোন কর্মকান্ড।

সূত্র বলছে, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ ও ওয়ার্ড কমিটিগুলোর অবস্থা আরো নাজুক। কত বছর আর কত যুগ পেরিয়ে গেছে তারপরেও যেনো দলের কঠিন সময়ে কাজ করা ত্যাগী নেতারা পাচ্ছেনা কোন পদ-পদবী। নেতাকর্মীদের বিপদে নেতাদের কাছে সাহায্য চাইতে গেলেও নানা বিড়ম্বনা শিকার হতে হয়। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও ভূমিমন্ত্রী গ্রামে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় বলে জানান অনেক ভোক্তভোগিরা।

এর ফলে কর্ণফুলী উপজেলা আওয়ামী লীগ এখন অনেকটাই নির্ভর হয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুক নির্ভর। এমন অবস্থায় হতাশা দেখা দিয়েছে কর্ণফুলীর তৃণমূল আওয়ামী পরিবার সহ যুবলীগ ও ছাত্রলীগেও।

আওয়ামী লীগের এই নিষ্ক্রিয়তার প্রভাব পড়েছে সর্বশেষ স্থানীয় সরকারের নির্বাচন ও জাতীয় নির্বাচনে। অনেকে নৌকার প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়া ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয় নেতাদের সাথে কর্মীদের বিচ্ছিন্নতা তৈরিসহ নানা সমালোচনায় মুখর ছিলো তখন। উপজেলার চরলক্ষ্যা, জুলধা, বড়উঠান, চরপাথরঘাটা, শিকলবাহা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের একাধিক তৃণমূল নেতাকর্মীরা অভিযোগ তুলেছে, কর্ণফুলীতে রাজনীতি নয়, বরং ঠিকাদারি, ব্যবসা বানিজ্য ও তদবিরে ব্যস্ত পদে থাকা আওয়ামী লীগ নেতারা।

দেখা যায়, বিভিন্ন জাতীয় দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদনের মধ্যেই এখন সীমাবদ্ধ কর্ণফুলী আওয়ামী লীগের কার্যক্রম। সাংগঠনিক তেমন কোনো কর্মকান্ড নেই বললেই চলে। ৪৭ বছরে নেই কোন দলীয় অফিসও। কেবল দলের নেতা ও মন্ত্রীরা এলাকায় সফরে আসলে তাদের সাথে বিভিন্ন কর্মস‚চিতে যোগদান, ফটোসেশন আর প্রশাসনিক বিভিন্ন কর্মস‚চি এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ’র টেবিলে হাজিরা দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেতাদের কার্যক্রম।

এভাবে যদি নেতারা নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত থাকে, তবে কঠিন হয়ে পড়বে সামনে যে কোন রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবেলা করা। সামনের রাজনীতিতে ঠিকে থাকা কঠিন ও ঘাম ঝরিয়ে যাবে বলে ধারণা করছেন।

সাংগঠনিক অচলবস্থার কারণে শহীদ মিনারে পুষ্প অর্পন, সামাজিক অনুষ্ঠানে ফটোসেশন ব্যতিত আর কোনো কর্মস‚চিই পালন করতে পারেনি উপজেলা আওয়ামী লীগ। অন্যান্য বছর মত বিনিময় সভা, বর্ধিত সভা, তৃণমূলে কর্মীসভা, আলোচনা সভা, সদস্য সংগ্রহ কর্মসূচি ও জাতীয় দিবসে উপজেলা আওয়ামী লীগ পৃথকভাবে বড় পরিসরে কর্মসূচি আয়োজন করলেও এখন তাও অদৃশ্য বলে জানা যায়।

দল ক্ষমতায় থাকার পরও উপজেলার এমন করুণ অবস্থা মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি করছে। তাদের অভিযোগ, সামান্য আপদে বিপদে অনেক চেষ্টা করেও নেতাদের পাশে পান না। সবকিছুতেই সংসদ সদস্য ও জেলা কিংবা মহানগর নেতাদের পিছনে ছুটতে হয়। কেননা দলের সাংগঠনিক কর্মকাÐ জোরদার করার বদলে নেতারা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিতেই অধিক মনোযোগী বলে অভিযোগ তৃণমূলের।

সুুত্রে জানা যায়, জুলধা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সক্রিয় নন। বরং সা. সম্পাদক একের ভিতর দুই (ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সা. সম্পাদক), ফলে দলীয় সাংগঠনিক কাঠামো একেবারেই হযবরল অবস্থা! কেননা সভাপতি বেসরকারী ইউসিবিএল ব্যাংক মইজ্জ্যারটেক শাখার ব্যবস্থাপক হিসেবে ব্যস্ত সময় পার করছেন আর সাধারণ সম্পাদক ইউনিয়ন পরিষদ নিয়ে ব্যস্ত। দলীয় কর্মসূচির ধারে কাছে কেউ নেই বলে প্রচলন রয়েছে।

এবিষয়ে জানতে চাইলে জুলধা ইউনিয়ন আ’লীগের সভাপতি আমির আহমেদ বলেন, ‘একেবারেই যে আমরা মাঠে নেই তা নয়; সামনে আমরা তৃণমূল নেতাকর্মীদের সাথে বসে দলীয় কর্মসূচীর প্রস্তুতি নিচ্ছি’।

এদিকে চরলক্ষ্যা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতির সক্রিয়তার দেখা মিলে এলাকায় কিন্তু সা. সম্পাদক প্রায় দলীয় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রেখেছে বলে অভিযোগ ওঠেছে।

বলতে গেলে শিকলবাহা একটি বিশাল ইউনিয়ন। ভোটব্যাংক প্রচুর কিন্তু ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি একের ভিতর তিন (উপজেলা পুরুষ ভাইস-চেয়ারম্যান, জেলা যুবলীগে’র সহ-সভাপতি ও ইউনিয়ন আওয়ামীলীগ সভাপতি) দায়িত্ব পালন করছেন। দলীয় কর্মসূচি তো দুরের কথা সাধারণ সম্পাদক নিজেও নাকি সভাপতির দেখা পায় না বলে প্রচার রয়েছে।

চরপাথরঘাটা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি সক্রিয় থাকলেও সা. সম্পাদক দীর্ঘদিন অসুস্থতার পর গত কিছুদিন আগে মারা গেলে স্থবির রয়েছে সাংগঠনিক কর্মকান্ড।

এবিষয়ে জানতে চাইলে সভাপতি আলহাজ্ব সৈয়দ আহমদ বলেন, ‘অন্যান্য ইউনিয়নের কথা বলতে পারব না। তবে আমার ইউনিয়নে আমরা কেন্দ্রঘোষিত সকল কর্মসূচি যথাযথভাবে পালন করে আসছি; ভবিষ্যতেও করে যাব’।

অপরদিকে বড়উঠান ইউনিয়ন আওয়ামী লীগও প্রায় নিষ্ক্রিয়। এই ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বলতে গেলে এক প্রকার সম্পাদকের উপর নির্ভরশীল।

সাধারণ সম্পাদক সাবেক ছাত্রনেতা হওয়ায় জাতীয় দিবস বা কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচিগুলো যথাযথ ব্যবস্থায় না হলেও সাধ্যমত পালনের চেষ্টা করেন। সভাপতি দলীয় কার্যক্রমে কোনমতেই সক্রিয় ভূমিকা বা নিজ দায়িত্বটুকুও পালন করছেন না বলে প্রচার রয়েছে। সভাপতির সাথে সমন্বয়ের অভাবে অনেক কর্মসূচিও নাকি যথাযথ প্রক্রিয়ায় সম্পাদন করতে পারছে না বলেও জানা যায়।

আওয়ামী লীগের মূল সংগঠনের এই অবস্থা হলে কেন্দ্রীয় কর্মসূচি পালন ও নানা রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যাঘাত ঘটবে বলে মনে করেন পাঁচ ইউনিয়নের তৃণমূল ও অঙ্গসংগঠন।

অভিযোগ আছে, রাজনীতির পদ দখল করে রাজনীতি না করে জেলা উপজেলার গুটি কয়েক নেতাকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ব্যবসা যেমন- তৈলের ব্যবসা, ঘাট ও হাটবাজারে ইজারায় অংশীদার, পাথর ও কয়লা মজুদদারী ব্যবসা, শহরে গোডাউন ব্যবসা, ক্যাট বাংলাতে পাথরের ব্যবসা, জমি জামার ব্যবসায় সিন্ডিকেট গড়ে প্রভাব খাটিয়ে উপজেলার কিছু নেতা চোখের সামনেই কোটিপতি বনে যাচ্ছেন-যা স্থানীয় সংসদ সদস্যের অগোচরে রয়েছে বলে জানা যায়।

নাম প্রকাশে তৃণমূলের এক নেতা জানান, দল করতে হলে দলের প্রতি আনুগত্য থেকে শেখ হাসিনার নির্দেশ বাস্তবায়নে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার কথা নেতাকর্মীদের। অথচ তাঁরা আওয়ামী লীগের রাজনীতির নামে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণের মন্তব্য করেন তিনি।

এবিষয়ে একাধিকবার চেষ্টা করেও কর্ণফুলী আ’লীগের সা. সম্পাদক হায়দার আলী রনি’র কাছ থেকে মন্তব্য পাওয়া যায়নি। অপরদিকে কর্ণফুলী আ’লীগের সভাপতি আলহাজ্ব ফারুক চৌধুরীর মুঠোফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ্ব মোসলেম উদ্দিন বলেন, ‘সাংগঠনিক অবস্থা দূর্বল সেটা বলা যাবে না। তবে সমন্বয়হীনতার অভাব রয়েছে সেটা বলতে পারি। আমরা কর্ণফুলীর রাজনীতি নিয়ে বৈঠক করেছি আশা করি দ্রুত একটি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

তথ্যমতে, গত কয়েক মাস পুর্বে কর্ণফুলী উপজেলা আওয়ামী লীগের ৭১ সদস্য বিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করেছে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ। কমিটিতে কর্ণফুলী উপজেলা চেয়ারম্যান ফারুক চৌধুরীকে সভাপতি ও বর্তমান সাধারণ সম্পাদক হায়দার আলী রনিকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সুত্র জানায়।

সিএস/সিএম/এসআইজে