এক কেজি পেঁয়াজের দামে সাত কেজি চাল!

বিশেষ প্রতিনিধি :

শুধু পেঁয়াজ নয়, বেড়েছে চাল, ডাল, সবজিসহ সবধরণের ভোগ্যপণ্যের দাম। তবুও এককেজি পেঁয়াজের দামে পাওয়া যাচ্ছে সাত কেজি চাল, ১২ কেজি ধান। যা নিয়ে মুখর এখন চট্টগ্রাম। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও এ নিয়ে চলছে ঝড়।

চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা সুভাষ দত্ত শুক্রবার সকালে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে লিখেছেন-পদুয়া রাজারহাটে এক কেজি পেঁয়াজ বিক্রয় হচ্ছে ২৪০-২৫০ টাকায়। আর ১২ কেজি নতুন পাকা ধান বিক্রয় হয়েছে ২৪০ টাকায়।
তিনি লিখেন, সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কম দামে ধান বিক্রয় হলেও লাগামহীন ঘোড়ার মতো লাফিয়ে লাফিয়ে অনির্ধারিত দামে বিক্রয় হচ্ছে পেঁয়াজ।

চট্টগ্রাম মহানগরীর বহদ্দারহাটের মাতৃভান্ডার চালের আড়তদার সঞ্জয় সাহা বলেন, বাজারে সব ধরণের চালের দাম বস্তাপ্রতি ১০০-১৫০ টাকা বেড়েছে। দেশীয় মোটা চাল ৫০ কেজির বস্তা সর্বনিম্ম ১ হাজার ৬৫০ টাকায় বিক্রয় হচ্ছে।
আর এক কেজি পেঁয়াজ খুচরা বিক্রয় হচ্ছে ২৪০-২৫০ টাকায়। সে হিসেবে এক কেজি পেঁয়াজের দামে ৭ কেজি চাল বিক্রয় হচ্ছে। শুক্রবার সকালে চাল কিনতে এসে চালের দাম বাড়ার বিষয়ে এক ক্রেতার আপত্তির জবাবে এ মন্তব্য করেন সঞ্জয় সাহা।

এ সময় রিক্সা চালক, মাছ-মাংস ও সবজি ক্রেতা-বিক্রেতাসহ সবার মুখে শুনা যায় পেঁয়াজের দাম নিয়ে মুখরোচক আলোচনা। শুধু তাই নয়, লাগামহীন পেঁয়াজের দাম নিয়ে সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন অনেকে।

ক্রেতারা জানান, শুধু পেঁয়াজ বা চালের দাম বাড়েনি। ডাল, তেল, আদা, রসুন, তরি-তরকারিসহ সবকিছুর দাম বেড়েছে। চট্টগ্রামের সবকটি বাজারে চায়না আদা প্রতিকেজি বেড়ে ২০০ টাকা, রসুন ১৮০ টাকা, সয়াবিন তেল প্রতিলিটার বেড়ে ১০৫-১১০ টাকায়, মসুর ডাল প্রতিকেজি বেড়ে ১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ফুলকপি প্রতিকেজি বেড়ে ১০০-১২০ টাকা, শিম ১১০-১২০ টাকা, বেগুন ৬০ টাকা, বরবটি ৬০-৭০ টাকা, বাঁধাকপি ৪০-৫০ টাকা, টমেটো ১০০-১২০ টাকা, মুলা ৬০ টাকা, ঝিঙা ৮০ টাকা, ঢেঁড়শ ৮০ টাকা, পটল ৬০ টাকা, তিতকরলা ৭০ টাকা, চিচিঙ্গা ৬০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৫০ টাকা, লাউ ৪০ টাকা, শসা ৬০ টাকা ও কাঁচামরিচ ১০০ টাকায় বিক্রয় হচ্ছে।

ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাবে শীতকালিন সবজির দাম বেড়েছে বললেও পেঁয়াজ, আদা, রসুন, তেল, ডালসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ার জন্য ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযানকে দুষছেন ব্যবসায়ীরা।

নগরীর চকবাজার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সভাপতি আবুল কালাম আজাদ বলেন, পেঁয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমান আদালত অভিযান চালিয়ে একেকজন ব্যবসায়ীকে ৪-৭ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করেছে। ফলে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ব্যবসায়ীরা কৌশলে পেঁয়াজের দাম আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সেই সাথে সব ধরণের ভোগ্যপণ্যও বেশি দামে বিক্রয় করছে।

কাজীর দেউরি বাজারের খুচরা ব্যবসায়ী হাজী আনোয়ার হোসেন সওদাগর বলেন, পাইকারি ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে, তাই আমাদেরও দাম বাড়িয়ে বিক্রী করতে হচ্ছে।

চাক্তাই খাতুনগঞ্জে আড়তদার ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি সোলেমান বাদশা বলেন, আমদানিমূল্য বেড়ে যাওয়ায় পেঁয়াজ, আদা-রসুনসহ সব পণ্যের দাম বেড়েছে। আর পেঁয়াজ তো এখন বাজারে নেই। আগের যেগুলো ছিল তাই বিক্রী হচ্ছে। ফলে দাম বেড়েছে।

তিনি বলেন, এস আলম গ্রুপ ৫০ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানির কথা বললেও তা এখনো বাজারে আসেনি। মিয়ানমার থেকে আমদানি করা পেঁয়াজ গত ৭ নভেম্বর থেকে খাতুনগঞ্জে তেমন একটা আসেনি। আমদানিকারকরা টেকনাফ থেকে সরাসরি পেঁয়াজ বিক্রী করে দিচ্ছে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ৮ নভেম্বর থেকে পেঁয়াজ কেজিপ্রতি ১০০ টাকা বিক্রীর কথা বলায় ব্যবসায়ীরা এমনটা করছে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তৌহিদুল ইসলাম বলেন, মিয়ানমার থেকে ৩০ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছিল। যা খরচসহ কেজিপ্রতি ৪২ টাকা কেনা পড়েছে। আর এসব পেঁয়াজ ব্যবসায়ীরা ৯৫ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রয় করেছে। এভাবে আমদানিকারকরা ১৫৯ কোটি টাকা, খুচরা পর্যায়ে ২০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ব্যবসায়ীরা। সাধারণ ক্রেতার পকেট থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে এসব টাকা। ফলে জেলা প্রশাসন অতি মোনাফা রোধ করে পেঁয়াজের মূল্য নিয়ন্ত্রণে অভিযান পরিচালনা করেছে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন বলেন, ব্যবসায়ীরা খুচরায় ১০০ টাকা কেজিতে পেঁয়াজ বিক্রীর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তারা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। পেঁয়াজের সাথে তারা সব ভোগ্যপণ্যের দামও বাড়িয়ে দিয়েছে। এটা খুবই দু:খজনক। বিষয়টি নিয়ে আমি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলব।