পাঁচ হাজার নৌযানের ডাস্টবিন কর্ণফুলী নদী

নুরুল আমিন মিন্টু :: কর্ণফুলী নদীতে চলাচলরত পাঁচ হাজার নৌ যানের কঠিন ও তরল বর্জ্য ফেলা হচ্ছে কর্ণফুলী নদীতেই। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় যুগ যুগ ধরে কর্ণফুলী নদীই নৌযানগুলোর ডাস্টবিন হিসাবে ব্যবহার হয়ে আসছে। এ ছাড়া কলকারখানা ও গৃহস্থালির তরল কঠিন বর্জ্যতো রয়েছে।

ফলে কর্ণফুলী দ্রুত বুড়িগঙ্গার মতো মরা নদীতে পরিণত হতে যাচ্ছে। ময়লা-আবর্জনা ও বিষাক্ত বর্জ্যে ইতোমধ্যে কর্ণফুলী প্রাণবৈচিত্র্য হারিয়েছে। নদীর তলদেশে জমেছে লাখ লাখ টন পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য। স্বাভাবিকভাবে এতে নাব্যতা হারিয়ে ধুকছে কর্ণফুলী।
সরেজমিন দেখা গেছে, কর্ণফুলীর নদীর পানি কালচে রূপ ধারণ করছে। পানিতে ভেসে বেড়াচ্ছে পলিথিন ও প্লাস্টিক বোতলসহ নানা কঠিন বর্জ্য। যার বেশীরভাগই নদীতে চলাচলরত নৌযান থেকে ফেলা হচ্ছে। বেশ কিছু লাইটারেজ, তেল ট্যাঙ্কার, ফিশিং ট্রলার পরির্দশন করে দেখা গেছে, কোনটিতেই ময়লা-আবর্জনা রাখার কোনো পাত্র (ডাস্টবিন) নেই। নৌযানগুলো থেকে ময়লা-আবর্জনা সংগ্রহ করার কোনো প্রতিষ্ঠানও নেই। তাদের রান্নার উচ্ছিষ্ট, বিভিন্ন প্যাকেটজাত খাদ্যের মোড়ক পলিথিন ও প্লাস্টিক ফেলা হচ্ছে নদীতে।

বিভিন্ন নৌযানের মাস্টার, ড্রাইভারদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, স্থলভাগে সিটি করপোরেশন গৃহস্থালি বর্জ্য জমা রাখার জন্য প্রতিটি ঘরে বিন সরবরাহ করেছে। নির্ধারিত সময়ে সিটি করপোশেনের পরিচ্ছন্ন কর্মীরা এসে তা সংগ্রহ করেন। পরে তা নির্ধারিত স্থানে ডাম্পিং করা হয়। কিন্তু কর্ণফুলী নদীতে চলাচলরত প্রায় পাঁচ হাজার নৌযানগুলোতে বসবাসরতদের বিভিন্ন বর্জ্য সংরক্ষণ করার কোনো ব্যবস্থা নেই। কোনো প্রতিষ্ঠানকে এসব বর্জ্য সংরক্ষণ করে তা স্থলভাগে এনে পরিবেশ সম্মতভাবে পরিশোধন ও ডাম্পিং করার দায়িত্ব দেয়া হয়নি। ফলে কর্ণফুলী নদীতে চলাচলরত নৌযান ও নদী দু’পাড়ে স্থাপিত শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং নগরের গৃহস্থালি বর্জ্য রিসাইকেল করার জন্য কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। ফলে বাধ্য হয়ে প্রায় পাচঁ হাজার নৌযান র্কণফুলী নদীকে ডাস্টবিন হিসাবে ব্যবহার করছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কিছু প্রতিষ্ঠান কর্ণফুলী নদীতে চলাচলরত লাইটারেজ, ফিশিং ট্রলার, তেল ট্যাঙ্কার ও অন্যান্য নৌযান থেকে কঠিন ও তরল বর্জ্য সংগ্রহ করে তা পরিশোধন করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জঠিলতা ও আন্তরিকতা না থাকায় এ ব্যাপারে এখনো কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হয়নি। যাচাই-বাছাইয়ের নামে বছরের পর বছর তা ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়েছে। যদিও কর্ণফুলীসহ দেশের সব নদীর দূষণ নাব্যতা রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার বিশেষ নির্দেশনাও রয়েছে।

সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম মহানগর ও কর্ণফুলী নদীর দুই তীরে প্রায় ৭০ লাখ নাগরিক। চট্টগ্রাম ওয়াসার স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা না থাকায় নগরে প্রতিদিন প্রায় ২৮ কোটি ৮০ লাখ লিটার পয়োবর্জ্য নিঃসৃত হয়ে নালা-খাল গড়িয়ে কর্ণফুলী নদীতে পড়ছে। নদীতে পড়ছে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের কলকারখানাগুলোর পরিশোধনহীন বর্জ্যও। এ ছাড়া প্রতিদিন গৃহস্থালির কঠিন ৫ হাজার টন বর্জ্য তৈরি হয়। এসব বর্জ্য দেড় হাজার টন নালা, খাল হয়ে কর্ণফুলীতে পড়ছে। শুধু সিটি কর্পোরেশনই প্রতিদিন ৭৬০ থেকে ৮০০ টন বর্জ্য কর্ণফুলীতে ফেলছে! ফলে দূষণাক্রান্ত নদীটি ব্যবহার উপযোগিতা হারানোর পাশাপাশি ভরাট হয়ে যাচ্ছে তলদেশ।

বন্দর কর্তৃপক্ষ চায়না হারবাল কোম্পানি লিমিটেড এর মাধ্যমে কর্ণফুলী নদীর নাব্যতা বৃদ্ধির জন্য ড্রেজিং করছে। কিন্তু ড্রেজিং মেশিন চালানো যাচ্ছে না। প্রপেলার আটকে যাচ্ছে কয়েক স্তরের পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্যে। ওঠে আসছে শত শত টন পলিথিন ও প্লাস্টিক সামগ্রী।

পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) গবেষণামতে, নদীর দুই তীরে স্থাপিত প্রায় ২১৭টি প্রতিষ্ঠান তাদের বিষাক্ত বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলে। এগুলোর মধ্যে ১৯টি ট্যানারি, ২৬টি টেক্সটাইল মিল, দুটি রাসায়নিক কারখানা, চারটি সাবান ফ্যাক্টরি, দুটি তেল শোধনাগার, পাঁচটি মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, বিটুমিন প্লান্ট, সিইউএফএল, কাফকো, চন্দ্রঘোনা কর্ণফুলী পেপার মিল অন্যতম। দূষণ তালিকার শীর্ষে রয়েছে সরকারি চারটি প্রতিষ্ঠান। এগুলো হচ্ছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানা ও কর্ণফুলী কাগজকল। সরকারি এ প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো বর্জ্য শোধনাগার নেই।

পরিবেশ বিজ্ঞানীরা জানান, পার্বত্য অঞ্চলের কাপ্তাই, চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া, রাউজান, বোয়ালখালী উপজেলা, চট্টগ্রাম বন্দরসহ বেশ কয়েকটি অঞ্চলের ওপর দিয়ে কর্ণফুলী নদী প্রবাহিত। বিভিন্ন শিল্প-কারখানা থেকে ৬২ ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক বর্জ্য নদীর পানিতে মিশে যাচ্ছে প্রতিদিন। এসব বর্জ্যরে মধ্যে রয়েছে সায়ানাইড, ক্রোমিয়াম, পারদ, ক্লোরিনসহ নানা ধরনের এসিড, দস্তা, নিকেল, জিপসাম, সীসা, ক্যাডমিয়াম, লোহা, অ্যালকালির মতো ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য।

ফলে নদীর পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কাজের আওতায় রয়েছে নদীর পানিদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা। বিআইডব্লিউটিএ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নদীতীরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নদীর তলদেশ রক্ষা করে নদীর নাব্যতা ধরে রাখা। ভূমি মন্ত্রণালয় ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নদীর পাড়ের মালিকানা রক্ষা করা। অথচ  দেখা যাচ্ছে না কর্ণফুলী রক্ষায় টাস্কফোর্স কমিটির তৎপরতা।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিবেশ অধিদফতর সূত্র জানায়, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী ভূপৃষ্ঠ বা নদীর প্রতি লিটার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের (ডিও) পরিমাণ ৫ মিলিগ্রামেরও ওপরে, পিএইচ’এর পরিমাণ ৬ দশমিক ৫ মিলিগ্রাম থেকে ৮ দশমিক ৫ মিলিগ্রাম এবং নদীতে বায়োলজিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড (বিওডি) ৫ থেকে ১০ মিলিগ্রাম থাকার বিধান রয়েছে। কিন্তু পরিবেশ অধিদফতরের পরীক্ষায় কর্ণফুলীতে ডিও ৩ মিলিগ্রামেরও নিচে এবং বিওডি ৩ দশমিক ২ মিলিগ্রাম পর্যন্ত পাওয়া গেছে। পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেলে ছোট ছোট মাছ বাঁচে না। এ ছাড়া প্রাণী বৈচিত্র্য নষ্ট হয়ে যায় এবং বাস্তুসংস্থান প্রক্রিয়া ধ্বংস হয়ে যায়।

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর দূষণ রোধ, নাব্যতা বৃদ্ধি এবং অবৈধ দখল রোধকল্পে প্রণীত খসড়া মহাপরিকল্পনায় বলা হয়, মহানগরে ৫০ হাজার স্যানিটারি এবং ২৪ হাজার কাঁচা শৌচাগার রয়েছে। এ ছাড়া ১১টি উপজেলার গরু-ছাগল এবং হাঁস–মুরগির খামারের বর্জ্য নদীতে মেশে। পরিবেশ অধিদফতর ৩৯টি প্রতিষ্ঠানকে কর্ণফুলী দূষণের জন্য দায়ী হিসেবে শনাক্ত করেছে। দূষণের কারণে ২৩ বছরে নদী থেকে বিলুপ্ত হয়েছে প্রায় ৩৫ প্রজাতির মাছ। ওয়াসার কোনো সুয়ারেজ সিস্টেম না থাকায় সমস্যা আরও প্রকট হচ্ছে।
চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম ফজলুল্লাহ এ প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, সুয়ারেজ নিয়ে একটি মহাপরিকল্পনা হয়েছে। নগরকে ছয় ভাগে ভাগ করে সুয়ারেজ প্রকল্পের কাজ শুরু হবে।

খরস্রোতা  কর্ণফুলী নদী ভারতের মিজোরাম রাজ্যের লুসাই পাহাড় থেকে ৩২৩ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রামে এসে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিশেছে। এ নদীর তীরে স্থাপিত হয়েছে দেশের প্রধান সমুদ্র বন্দর। প্রতি বছর এ বন্দর আমদানি-রপ্তানি ভিড়ছে দেশি-বিদেশি হাজার হাজার জাহাজ। এখনই অর্থনীতির লাইফ লাইন খ্যাত কর্ণফুলী নদীকে  বাঁচাতে ব্যর্থ হলে, বাঁচবে না বাংলাদেশের অর্থনীতি। বাস্তবায়ন হবে না, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্ন মিশন ২০৪১ এমনটা শঙ্কা পর্যবেক্ষকদের।

## দৈনিক সংগ্রাম