নকল কিট ও কেমিক্যালে সয়লাব চট্টগ্রাম

শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০১৯, ৭:৫০ পিএম

নিজস্ব প্রতিবেদক : চট্টগ্রামে রোগ নির্ণয়ে নকল কিট ও কেমিক্যাল বিক্রি করে হাসপাতাল, ক্লিনিক ও বিভিন্ন রোগ নির্ণয় কেন্দ্র বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। একটি অসাধু চক্র নামিদামি বিদেশী কিট ও কেমিক্যাল বলে অল্পমূল্যে সরবরাহ করছে চট্টগ্রামের বেসরকারি রোগ নির্ণয় প্রতিষ্ঠার গুলোতে। আর এসব ভেজাল কিটের কারণে পরীক্ষায় মানুষের প্রকৃত রোগ নির্ণয় করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে রোগ নির্ণয়ের নামে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন আর্থিক ভাবে। অভিযোগ, প্রশাসনের সঠিক তদারকি না থাকার সুযোগে নকল ও ভেজাল রোগ নির্ণয়ের কেমিক্যালে দখলকরেছে পুরো বাজার।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভেজাল কেমিক্যালে রোগ নির্ণয় দূরের কথা, রোগ আরও জটিল করে তুলছে। শুধু নিট নয়, একটি অসাধু চক্র নামমাত্র মূল্যে মানহীন চিকিৎসাসামগ্রী বিক্রি করে রমরমা ব্যবসা করছে। মানহীন ওই সব সামগ্রী সরবরাহ করা হচ্ছে দেশের বিভিন্ন ওষুধের দোকান, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতালে। সাধারণ মানুষ এসব সামগ্রী কিনে প্রতারিত হচ্ছে।

চিকিৎসা খাতের সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, নিম্নমানের চিকিৎসাসামগ্রী ব্যবহার করে রোগ নিরাময় হওয়া তো দূরের কথা রোগ আরো জটিল হতে পারে, এমনকি রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। ফলে এসব অসাধু ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনা না গেলে দেশের স্বাস্থ্য খাতে বড় ধরণের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। রোগ নির্ণয়কারী কেমিক্যাল আসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট থেকে।

চট্টগ্রামে একটি চক্র বিদেশী এসব কেমিক্যাল নকল করে বিভিন্ন হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সরবরাহ করছে। চক্রটি আমদানি করা মেডিকেল ও সার্জিক্যাল সরঞ্জামও নকল করছে। এসব সরঞ্জামের মধ্যে রয়েছে- ইনফিউশন সেট, ডিসপোজেবল সিরিঞ্জ, ব্লাড ব্যাগ, গজ-ব্যান্ডেজ, নানা ধরনের কাঁচি, ইসিজি মেশিন, মনিটর, ল্যাবরেটরি ইক্যুইপমেন্ট, ইলেকট্রো-মেডিকেল ইক্যুইপমেন্ট, অ্যাকসিডেন্টাল ও ইমারজেন্সি ইক্যুইপমেন্ট, ডেন্টাল ও ডায়াগনস্টিক ইক্যুইপমেন্ট, ফার্স্টএইড কিট বক্স, মানবদেহের পালস ও অক্সিজেন লেভেল মাপার যন্ত্র।

ভেজাল কিট ও কেমিক্যাল ধরার পড়ার নেপথ্যে : গত সপ্তাহ নগরীর অভিজাত ডায়াগনস্টিক সেন্টার হিসেবে খ্যাত ল্যানসেট ডায়াগনস্টিক সেন্টার কর্তৃপক্ষ মো. ইব্রাহিম খলিল উল্লাহ নামে একজনের কাছ থেকে রোগ নির্ণয়ে ব্যবহত কিট ও রোগ নির্ণয়ের কেমিক্যাল ক্রয় করেন। কিট ও রোগ নির্ণয়ের কেমিক্যালগুলো ব্যবহারের আগে প্যাকেট কেউ খুলেছে দেখতে পান। প্যাকেটের বাইরের মেয়াদত্তোর্ণের তারিখ ও সাল একটি আর বাইরে মেয়াদত্তীর্ণের তারিখ ও সাল আরেক ধরণের। কেমিক্যালের কৌটাও অনেক নি¤œমানের। কৌটার গায়ে লেবেলও স্থানীয়ভাবে লাগানো।

পরে ল্যানসেট ডায়াগনস্টিক সেন্টার কর্তৃপক্ষ খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন ওইসব কিট ও কেমিক্যালগুলো আমদানি করে থাকে ঢাকার এমআর ট্রেডিং ইন্টারন্যালনাল নামে একটি প্রতিষ্ঠান। ল্যানসেট কর্তৃপক্ষ এমআর ট্রেডিং এর মালিক মিজানুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ল্যানসেট কর্তৃপক্ষকে মিজানুর রহমান জানিয়েছে- চট্টগ্রামে ইব্রাহিম খলিল উল্লাহ নামের এমআর ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনালের কোন এজেন্ট বা প্রতিনিধি নেই। কেউ এমআর ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনালের এর পরিচয় দিয়ে থাকলে তাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিকট হস্তান্তর করার অনুরোধ করেন। পরে ল্যানসেট কর্তৃপক্ষ ওইসব নকল কিট ও কেমিক্যাল আটকে রাখে। ওই ডায়াগনস্টিক সেন্টারে বিক্রি করা কেমিক্যালের বিক্রির চালানে এমআর ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনাল এর ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে-‘শান্তিধারা আবাসিক এলাকা, কে.কে টাওয়ার (নবম তলা) চট্টগ্রাম।

এ ঠিকানায় গিয়ে দেখা যায়, এটি একটি আবাসিক ভবন। ভবনের নবম তলায় পরিবার নিয়ে বসবাস করেন মো. ইব্রাহিম খলিল উল্লাহ। এমআর ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনালের কোন অফিসের অস্তিত্ব নেই।

অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটির মালিক মিজানুর রহমানের কর দেয়া তাদের প্যাডে ঠিকানা দেখা যায়- এমআর ট্রেডিং ইনন্টারন্যাশনালের ১৫/২, তোপখানা রোড, বিএমএ ভবন, দ্বিতীয় তলা, ঢাকা-১০০০।’

ল্যানসেট ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ব্যবস্থাপক সাকের খোকন জানান, ল্যানসেট নগরীর ভালোমানের ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর মধ্যে অন্যতম। রোগ নির্ণয়ে আমরা সব সময় উন্নতমানের কিট ও কেমিক্যাল ব্যবহার করে থাকি। যাতে রোগীর প্রকৃত রোগটি ধরা পড়ে। এমআর ট্রেডিং নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ভুয়া এজেন্ট সেজে একজন আমাদের প্রতিষ্ঠানে কাছে নকল কেমিক্যাল বিক্রি করাতে কিছু কেমিক্যাল আটকে রেখেছিলাম। পরে কিছু কেমিক্যাল ফেরত দিয়ে দিয়েছি। একটি মেশিন আটকে রেখেছি।

কেমিক্যাল বিক্রিয়কারী ইব্রাহিম খলিল উল্লাহ বলেন, ‘ওটা (নকল কেমিক্যাল ও অন্যের প্যাড ব্যবহার) আমার ভুল হয়ে গেছে। এ ব্যাপারে এমআর ট্রেডিং এর মালিক মিজান সাহেবের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। আমি ওনার প্যাড আর ব্যবহার করবো না। নকল কেমিক্যাল যখন ধরা পড়েছে তখন ডায়াগনস্টিক সেন্টার কর্তৃপক্ষকে বলেছি রেখে দিতে। ওটা বদলিয়ে দেবো।

এমআর ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনাল এর মালিক মিজানুর রহমান বলেন, ‘ইব্রাহিম নামে চট্টগ্রামে আমার প্রতিষ্ঠানের কোন এজেন্ট নেই। এসব এজেন্ট ভুয়া।’

র‌্যাব-৭ এর কোম্পানি কমান্ডার মেজর মেহেদি হাসান শুক্রবার দুুপুরে বলেন, নকল কিট ও কেমিক্যাল বিক্রির অভিযোগ আমরা পেয়েছি। একটি প্রতিষ্ঠানর প্যাড নকল করে কেমিক্যাল বিক্রির অভিযোগ আমাদের হাতে রয়েছে। এটা নিয়ে কাজ চলছে। নকল কেমিক্যাল বিক্রি করে কেউ পার পাবে না।