জিম্মিদশায় চট্টগ্রাম অভ্যন্তরীণ খাদ্য পরিবহন!

চট্টগ্রামের অভ্যন্তরে সরকারি খাদ্য পরিবহন কাজ চার বছর ধরে জিম্মি হয়ে আছে ২৪ ঠিকাদারের হাতে। চট্টগ্রাম অভ্যন্তরীণ সড়ক পরিবহন কন্ট্রাক্টরের (আইআরটিসি) এ জিম্মিদশার কারণে নতুন কোনো ঠিকাদার কাজে অংশ নিতে পারছেন না।

জেলার অভ্যন্তরে খাদ্য পরিবহনে নিয়োজিত এসব ঠিকাদারের মেয়াদ ২০১৫ সালের জুনে শেষ হয়ে গেলেও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক নতুন ঠিকাদার নিয়োগ দিচ্ছেন না।

ফলে এসব ঠিকাদার ও তাদের প্রতিষ্ঠান সিন্ডিকেট করে খাদ্য পরিবহন, সাইলো ও দুই সিএসডির হ্যান্ডলিং ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। ২৪ ঠিকাদারের মধ্যে রয়েছে কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা সৈয়দ মাহমুদুল হকের মালিকানাধীন একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

অভিযোগ রয়েছে, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়কে ‘ম্যানেজ’ করে প্রভাবশালী ঠিকাদাররা নিজেদের মতো করে খাদ্য পরিবহন করছেন। পরিচালনা করছেন সাইলো ও সিএসডির খাদ্য হ্যান্ডলিং কাজ। এসব কাজে কোটি কোটি টাকা বিল তুলছেন তারা। নতুন ঠিকাদার নিয়োগ না হওয়ায় প্রতিযোগিতাও নেই।

যে কারণে সরকারের বিপুল অর্থ গচ্চা যাচ্ছে বলে বদ্ধমূল ধারণা সংশ্লিষ্টদের। খাদ্য পরিবহন ও হ্যান্ডলিংয়ে অনিয়মের বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট অনেকে দুদকে আবেদনও করেছেন বলে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, ২০১৩ সালে সর্বশেষ খাদ্য পরিবহনের জন্য দরপত্রের মাধ্যমে ২৪ জন ঠিকাদার নিয়োগ করে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক অফিস। দরপত্রে প্রদত্ত দর অনুযায়ী এই ২৪ ঠিকাদার ‘বাইরোটেশন’ খাদ্য পরিবহন করেন। ২০১৫ সালের জুনে এসব ঠিকাদারের কাজের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়।

কিন্তু এরপর নতুন ঠিকাদার নিয়োগ না দিয়ে তিন মাস অন্তর অন্তর বিদ্যমান ঠিকাদারদের কাজের মেয়াদ বাড়ানো হয়। সর্বশেষ গত বছরের অক্টোবরে নতুন ঠিকাদার নিয়োগে দরপত্র আহ্বান করে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক অফিস।

ঠিকাদারদের কাছে শিডিউল বিক্রি করে। শিডিউল জমাও নেয় জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়। কিন্তু জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক অদৃশ্য কারণে সেই দরপত্র বাতিল করে।

এরপর থেকে আবারও তিন মাস অন্তর অন্তর চুক্তি করে পুরনো ২৪ জন ঠিকাদারকে দিয়েই খাদ্য পরিবহন করানো হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আগ্রহী একাধিক ঠিকাদার অভিযোগ করেছেন, চট্টগ্রাম জেলা খাদ্য বিভাগ প্রভাবশালী এসব ঠিকাদারের হাতে জিম্মি।

চট্টগ্রামের অভ্যন্তরীণ খাদ্য পরিবহন কাজের ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ করছে- কেন্দ্রীয় যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ মাহমুদুল হকের মালিকানাধীন ‘জয় কন্সট্রাকশন’, আওয়ামী লীগ নেতা আবদুর রাজ্জাকের মালিকানাধীন ‘রাজ্জাক এন্টারপ্রাইজ’ এবং মো. মাসুদ মাহমুদের ‘হাসান অ্যান্ড কোং’ ও ‘মাসুদ অ্যান্ড সন্স’সহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।

তাদের হাতে শুধু অভ্যন্তরীণ খাদ্য পরিবহন নয়, জিম্মি রয়েছে হালিশহর সিএসডি, দেওয়ানহাট সিএসডি ও পতেঙ্গার সাইলোর হ্যান্ডলিং ঠিকাদারিও। তাদের সিন্ডিকেটের কারণে আইআরটিসির নতুন ঠিকাদার নিয়োগ করা যাচ্ছে না। তারাই নামে-বেনামে বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার কাজ করছে।

চট্টগ্রামে দুই সিএসডির খাদ্যপণ্য হ্যান্ডলিং কাজের নিয়ন্ত্রণও গত ছয় বছর ধরে কব্জায় রেখেছে দুই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সাধারণ ঠিকাদারদের মধ্যে এ নিয়ে ক্ষোভ বিরাজ করছে। সরকারদলীয় এক প্রভাবশালীর নিয়ন্ত্রণে থাকা ওই দুই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পণ্য হ্যান্ডলিং শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা না দেয়া, অবৈধভাবে অর্থ আদায়সহ নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

খাদ্য নিয়ন্ত্রক দফতরের তথ্যানুযায়ী, গত অর্থবছরে (২০১৭-১৮) দেওয়ানহাট সিএসডি থেকে লেবার বিল বাবদ জয় কন্সট্রাকশন ২ কোটি ৬৩ লাখ ৭৪ হাজার ২২৪ টাকা এবং হালিশহর সিএসডি থেকে রাজ্জাক এন্টারপ্রাইজ ২ কোটি ১৩ লাখ ৭৯ হাজার ১৫১ টাকা উত্তোলন করেছে।

চলতি অর্থবছরে (২০১৮-১৯) প্রথম চার মাসে মোট ২ কোটি ১৬ লাখ ৯২ হাজার ৬৯ টাকা লেবারদের বিল বাবদ উত্তোলন করেছে প্রতিষ্ঠান দুটি। দীর্ঘ সময় ধরে গুদামের হ্যান্ডলিং কাজ তাদের একক নিয়ন্ত্রণে।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় ঠিকাদার ও মুক্তিযোদ্ধা আবু তৈয়ব বলেন, চট্টগ্রাম খাদ্য বিভাগ এখন গুটিকয়েক ঠিকাদারের হাতে জিম্মি। তাদের কাছ থেকে খাদ্য বিভাগকে উদ্ধার করতে হবে। আইআরটিসির টেন্ডার হচ্ছে না। গত বছর টেন্ডার আহ্বান করে শিডিউল জমা নেয়া হলেও অজানা কারণে টেন্ডার প্রক্রিয়া বাতিল করা হয়।

তিনি আরও বলেন, দুই সিএসডিতে ২০১২ সালে যখন হ্যান্ডলিং কাজে দরপত্র আহ্বান করা হয় তখন লটারির মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগ পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠান দুটি গোপনে কাউকে কিছু না জানিয়ে সিন্ডিকেট করে কাজটি হাতিয়ে নিয়েছে। তখন থেকে প্রতিষ্ঠান দুটি এখনও হ্যান্ডলিং কাজ দখল করে রেখেছে।

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক অফিসের টেন্ডার কব্জায় রাখা প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা ও জয় কন্সট্রাকশনের মালিক সৈয়দ মাহমুদুল হক জানান, তার প্রতিষ্ঠান নিয়ম অনুযায়ী দরপত্র দাখিল করে কাজ নিয়েছে। কেন জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক অফিস খাদ্য পরিবহনে আইআরটিসির টেন্ডার দিচ্ছে না, তাদের কী সমস্যা, তা তিনি জানেন না।

তাছাড়া তার মালিকানাধীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থাকলেও ওই প্রতিষ্ঠান দেখাশোনা করেন মাসুদ নামে একজন। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আবু নঈম মোহাম্মদ শফিউল আলম বর্তমানে দেশের বাইরে রয়েছেন। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।

ভারপ্রাপ্ত জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক দোলন দেব বলেন, ‘স্যার দেশের বাইরে রয়েছেন। তিনি দেশে এলে আইআরটিসির নতুন ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হবে।’ কেন এতদিন ঠিকাদার নিয়োগ দেয়া হয়নি, বা এসব কাজে কোনো ধরনের অনিয়ম আছে কিনা- সে বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।- যুগান্তর