কুরআন জানা জরুরি কেন

40231_178

সৈয়দ ফয়েজুল ইসলাম ::
পবিত্র কুরআন হলো স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে এবং ফেরেশতা জিবরাইল আমিনের মাধ্যমে নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা:-এর কাছে পর্যায়ক্রমে ওহিরূপে প্রেরিত সর্বশেষ কিতাব। কুরআন শব্দের অর্থ- যা পঠিত হয়, যা বেশি বেশি পঠিত হয়।

সমগ্র মানবজাতির জীবনবিধান তথা জীবন পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিধিবিধান সম্বলিত একটি অপরিবর্তনযোগ্য ও অনোপনোদনযোগ্য কিতাব। এ কিতাবে কোনো প্রকার ভুল নেই, ত্রুটি নেই; সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। পরিবর্তন বা পরিবর্ধনের সুযোগবিহীন একটি পরিপূর্ণ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ কিতাব। সমগ্র মানবজাতির হিদায়াত বা পথপ্রদর্শনের লক্ষ্যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কর্তৃক নাজিলকৃত একটি অলৌকিক কিতাব।
ইল্মি দীন বা দীনি জ্ঞান আহরণের প্রধানত পাঁচটি উৎস রয়েছে।

সেগুলো হলো আল্লাহর কুরআন, রাসূলুল্লাল্লাহি সা:-এর হাদিস, ফুকাহাদের ইজমা, মসজিদ ও মাদরাসাসহ সব দীনি প্রতিষ্ঠান এবং ওলামায়ে কিরামের লিখা ইসলামি বই-পুস্তক ও তাদের দেয়া দীনি বক্তব্য। এগুলোর মধ্যে প্রথম ও প্রধান উৎস হলো আল-কুরআন। তাই দীনি ইল্মের জ্ঞান অর্জন করতে হলে কুরআন শিক্ষাকে কিছুতেই উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। আল্লাহ বলেন, ‘একজন চক্ষুষ্মান লোক আর একজন অন্ধ ব্যক্তি কখনো সমান হতে পারে না; আর না আঁধার ও আলো সমান হতে পারে’ (সূরা ফা’তির : ১৯-২০)।

কুরআন না বুঝে তিলাওয়াত করলেও অনেক সওয়াব আছে প্রতি র্হফ বা অক্ষরে দশ নেকি। এ ব্যাপারে দ্বিমত নেই। কুরআনই একমাত্র কিতাব যা শুধু পড়লেই সওয়াব হয়। বস্তুত নিয়মিতভাবে কুরআন তিলাওয়াত অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইবাদাত। কিন্তু বুঝে পড়লে উল্লেখিত সওয়াবত হবেই, উল্লিখিত ইবাদাত ত হবেই- অধিকন্তু এতে আরো অনেক বেশি উপকারিতা লাভ করাও সম্ভব হবে। যেমন আল্লাহ তায়ালার আদেশ-নিষেধগুলো জানা যাবে, বোঝা যাবে। আল্লাহ তায়ালার প্রতি আস্থা-ভরসা বৃদ্ধি পাবে। জানলে-বুঝলে সেগুলো মানাও যাবে। মানাটা সহজ ও সম্ভব হবে। আবার অন্যের নিকট প্রচারও করা যাবে অর্থাৎ কুরআনের তাবলিগও করা যাবে। ফলে ইসলামি সমাজ বা পরিবেশ গঠনে অবদান রাখা যাবে।

বিদায় হজের ভাষণে রাসূলে-পাক সা: বলেছিলেন, আমি তোমাদের মধ্যে দু’টি জিনিস রেখে যাচ্ছি: কিতাবুল্লাহ তথা আল-কুরআন আর সুন্নাতে রাসূলিল্লাহ তথা আল-হাদিস। যত দিন তোমরা এ দু’টিকে আঁকড়ে ধরবে তত দিন পথভ্রষ্ট হবে না। আঁকড়ে ধরে রাখার অর্থ শুধু তিলাওয়াত নয়। বরং আঁকড়ে ধরার অর্থ হলো কুরআন শুদ্ধভাবে তিলাওয়াত, পরিমাণমতো তিলাওয়াত, কুরআন বোঝার উদ্দেশ্যে অধ্যয়ন, কুরআনি বিধিবিধান নিজের জীবনে বাস্তবায়ন এবং যথাসাধ্য অন্যের কাছে পৌঁছানো।

শুধু তাই নয়। ঈমানকে যথার্থরূপে অনুধাবন করতে হলেও কুরআনের জ্ঞান আবশ্যক। ঈমানের মূল বিষয়গুলো যেমন তাওহিদ, রিসালাত, আখিরাত, তাকদির, কিয়ামাত ইত্যাদি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা আয়ত্ত করতে হলে কমবেশি কুরআনি ইল্ম থাকা জরুরি। কুরআন এসব বিষয়ের আলোকপাত করেছে অলৌকিক জ্ঞানের মাধুরী দিয়ে, ঐশ্বরিক ভাষার সুনিপুণতা দিয়ে, ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে, অনেক ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতে এবং আকর্ষণীয় দৃষ্টান্তের মাধ্যমে।

আল-কুরআন হলো একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান (সূরা মায়েদা : ৩)। অর্থাৎ ব্যক্তিগতভাবে একজন মানুষের জীবন কিভাবে পরিচালিত হবে, একটি পরিবারে যে ক’জন সদস্য-সদস্যা আছে সামষ্টিকভাবে তাদের জীবন কিভাবে চলবে, অনুরূপভাবে একটি সমাজে বা দেশে যেসব লোক বসবাস করে কিভাবে তারা তাদের সমাজ বা দেশকে পরিচালনা করবে; জীবন, পরিবার, সমাজ ও দেশ পরিচালনায় কোন পন্থা সঠিক কোন পন্থা বেঠিক, কোনটা গ্রহণীয় আর কোনটা বর্জনীয় তারই পরিপূর্ণ বিধিবিধান হলো আল কুরআন।

কুরআন মেনে জীবন গড়তে চাইলে সব মানুষকেই কুরআন বুঝতে হবে। অন্তত কুরআন সম্পর্কে এ পরিমাণ জ্ঞান অর্জন করতে হবে, যে পরিমাণ জ্ঞান থাকলে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক জীবনে কুরআনি জিন্দেগি অনুসরণ করা সহজ ও সম্ভব হয়। অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালার পছন্দনীয় জীবনযাপন করতে হলে কুরআনি শিক্ষাকে সম্পূর্ণরূপে বর্জন করা কোন মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয়। বলছি না যে প্রতিটি মানুষকে বা প্রতিটি মুসলিমকে কুরআনে হাফিজ বা মুফাস্সিরে কুরআন অথবা শায়খুল হাদিস হতে হবে; তাকে মুফতি হতে হবে বা কামিল পাস করতে হবে। এটা র্ফয বা আবশ্যকীয় নয়। তবে কোন মানুষের পক্ষেই কুরআনের বেসিক নলেজ বিবর্জিত থাকা জীবন চলার দিক থেকে নিরাপদ নয়।

সত্যিকার মুসলিম হতে হলে কুরআন শিখতে হবে, আখিরাতকে বিশ্বাস করলে কুরআন শিখতে হবে, কবরে শান্তি চাইলে কুরআন শিখতে হবে, কিয়ামতে নাজাত পেতে হলে কুরআন শিখতে হবে। কুরআন শিক্ষার বিকল্প নেই। কারণ জীবনে সফলতা অর্জন করতে হলে কুরআনকেই জীবন সাথী বানাতে হবে।

আল্লাহ বলেন, ‘আমরা এ কুরআনকে উপদেশের জন্য সহজ মাধ্যম বানিয়ে দিয়েছি। উপদেশ গ্রহণ করতে প্রস্তুত এমন কেউ আছে কি’ (সূরা আল-কামার : ১৭, ২২, ৩২, ৪০)? আল্লাহ আরো বলেন, ‘আমরা এই কুরআনে নানাভাবে বুঝিয়েছি যেন তারা শিক্ষা গ্রহণ করে’ (সূরা বানী ইসরাইল : ৪১)। তিনি বলেন, ‘আমরা উহাকে আরবি ভাষায় কিতাব বানিয়েছি যেন তোমরা তা বুঝতে পার’ (সূরা যুখরুফ : ৩)। ‘হে মানুষ! আমরা তোমাদের প্রতি এমন একখানা কিতাব পাঠিয়েছি যাতে তোমাদেরই বর্ণনা রয়েছে’ (সূরা আম্বিয়া : ১০)। তারা কি কুরআন সম্বন্ধে চিন্তা-গবেষণা করে না- নাকি তাদের দিলসমূহে তালা পড়ে গেছে (সূরা মুহাম্মাদ : ২৪)।

‘হে নবী! আমরা এ কিতাবকে তোমার ভাষায় খুব সহজ বানিয়ে দিয়েছি যেন এ লোকেরা নসিহত গ্রহণ করে’ (সূরা : দোখান-৫৮)। রাসূলুল্লাহ সা: বলেন: ‘তোমাদের মধ্যে ওই ব্যক্তিই সবচেয়ে উত্তম যে কুরআন নিজে শিক্ষা করে এবং অন্যকেও কুরআন শিক্ষা দেয়।’
আল্লাহ প্রদত্ত জীবনবিধান ইসলামের প্রকৃত স্বাদ পেতে হলে মানুষকে কুরআনের কাছাকাছি আসতে হবে, কুরআনকে বন্ধু বানাতে হবে, কুরআনি জিন্দেগি অবলম্বন করতে হবে।

কুরআনকে ব্যক্তিগত জিন্দেগিতে বা পারিবারিক জীবনে মেনে চলতে হলেও কুরআন বুঝতে হবে; সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অনুসরণ করতে হলেও কুরআন বুঝতে হবে। আখিরাতে সফলতা অর্জনের জন্য ত বটেই। অর্থাৎ কুরআন পড়া, অধ্যয়ন করা, অনুধাবন করা এবং কুরআনি বিধি-বিধান বাস্তবায়ন করা এ সবের কোনো বিকল্প নেই। লেখক : প্রবন্ধকার

সিটিজিসান.কম/রবি