সিজিএম আদালত ভবন নির্মাণে ঠিকাদারের ব্যাপক দুর্নীতি

শনিবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৩:৪৪ পিএম

নাঈম ইসলাম মুন্না, রাঙামাটি :: পার্বত্য রাঙামাটি চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (সিজিএম) আদালত ভবন নির্মাণে নি¤œ মানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার, সে¦চ্চাচারিতা, হানিকম্ব ও নির্ধারিত সময়ে কাজ বাস্তবায়ন না করে দায়সারাভাবে স্থলগতি কাজ চালিয়ে যাওয়াসহ নানা অনিয়মে অভিযোগে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে দু’বার শো’কজ করা হয়েছে।

তবে গণপূর্তের নিয়োগকৃত ঠিকাদার কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করেই নিজের খেয়াল খুশি মতেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, গণপূর্ত বিভাগের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দৃষ্টিতে ভবন নির্মাণে ঠিকাদারের নানান দুর্নীতি ধরা পড়লেও ঘুমিয়ে আছে রাঙামাটি গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

গণপূর্ত বিভাগের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, এমন গুরুতর অপরাধ সনাক্ত হওয়ার পর পরই নির্মাণ চুক্তি বাতিল, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভূক্ত করা এবং সরকারি কাজ বাস্তবায়নে কালক্ষেপনের মধ্যে উন্নয়ন কাজে বাধাসৃষ্টির অভিযোগে মামলা দায়েরর নিয়ম রয়েছে।

স্থানীয় গণপূর্ত বিভাগকে ম্যানেজ করেই ঠিকাদার ভবন নির্মাণে নিয়ম-নীতি তোয়াক্কা না করে স্বেচ্চাচারিতায় চালিয়ে যাচ্ছে তার কাজ। বড় ধরণের গাফলতি, অনিয়ম এবং কাজের এমন গতি দেখেও শুধুমাত্র অফিসিয়াল চিঠি চালাচালিতে ধামাচাপা দেয়া হচ্ছে ঠিকাদারের যতসব অনিয়ম। মোটা অংকের ঘুষের বিনিময়ে ঠিকাদারের এমনসব দুর্নীতি আর স্বেচ্চাচারিতাকে আড়াল করে দু’বার শো’কজের চিঠি আর উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের লিখিত বুজ দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেছে রাঙামাটি গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী।

রাঙামাটির গণপূর্ত বিভাগের সংশ্লিষ্টরা জানান, গণপূর্ত বিভাগ চট্টগ্রাম জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোসলেহ্ উদ্দিন আহাম্মদ রাঙামাটি সদরে নির্মাণাধীন সিজেএম ভবন পরিদর্শনে গিয়েই ব্যাপক ানিয়ম দেখতে পান। সেখান থেকে ফিরেই তিনি রাঙামাটি গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এএসএম সানাউল্লাহ ও একই বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. জহির রায়হানকে শো’কজ করেন। একই সাথে ঠিকাধারী প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠান ডেল্টা ইঞ্জিনিয়ার্স এন্ড কনস্ট্রাকশনকেও শো’কজ করা হয়। এই শো’কজের পর পরই শো’কজ প্রাপ্তদের একজন উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী জহির রায়হানকে নিজ কর্মস্থল থেকে সরিয়ে চট্টগ্রাম গণপূর্ত বিভাগ ৪ এ যুক্ত করা হয়েছে।

রাঙামাটি গণপূর্ত বিভাগ ও চট্টগ্রাম জোনের সংশ্লিষ্টরা জানায়, সম্প্রতি গণপূর্ত বিভাগ চট্টগ্রাম জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোসলেহ্ উদ্দিন আহাম্মদ রাঙামাটি সদরে নির্মাণাধীন সিজেএম ভবন পরিদর্শনে গিয়ে পাঁচটি ভয়াবহ অনিয়ম খোঁজে পান। পরিদর্শন শেষে কাজের অগ্রগতি দুর্বল পেয়ে তিনি চট্টগ্রামে ফিরে এসে তাৎক্ষণিকভাবে দু’প্রকৌশলীকে শো’কজ করেন। বিষয়টি গুরুতর হওয়ায় গণপূর্ত অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলীকে অবহিত করেন চট্টগ্রাম জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোসলেহ্ উদ্দিন আহাম্মদ।

চট্টগ্রাম জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোসলেহ্ উদ্দিন আহাম্মদের স্বাক্ষরিত ওই পত্রে উল্লেখ করেন, অতি পুরাতন সাঁটার দ্বারা ঢালাই কার্যক্রম সম্পাদন করা, ভবনটির উত্তর দিকে ক্রটিপূর্ণ সাটারের কারণে ঢালাই কংক্রিট বেরিয়ে পড়ে কলামের সাইজের ত্রুটিপূর্ণ করা, ঢালাই কাজে প্রচুর হানিকম্ব সৃষ্টি হয়েছে যা আস্তর দ্বারা আড়াল করা হয়েছে। সাইটের সার্বিক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত দুর্বল।

এসব বিষয়ে শো’কজপ্রাপ্ত রাঙামাটি গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এএসএম সানাউল্লাহ তড়িগড়ি দায়রাসাভাবে শো’কেজের জবাব দেন। তাতে তিনি উল্লেখ করেন, ঠিকাদারের স্বেচ্চাচারিতা ও গাফিলতি, অদক্ষ জনবল দ্বারা কাজ করানো, নি¤œমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহারের কারণে এমনটা হয়েছে বলে তিনি নিজে একটি জবাব দেন গণপূর্ত চট্টগ্রাম জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী বরাবরে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণপূর্ত বিভাগের একাধিক প্রকৌশলী জানান, রাঙামাটিতে যে সিজেএম আদালত ভবন নির্মাে কোনো নিয়মই মানা হচ্ছে না। ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশ করে মোটা অংকে টাকা লেনদেনের মাধ্যমে কোনো রকমে একটি ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। ভনটি নির্মাণের আগে ল্যাব টেস্টে যেসব রড, সিমেন্ট, বালি ও ইট দেখানো হয়েছে তার কোনটাই এখানে ব্যবহার করা হয়নি। মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণভাবেই ভবনটি নির্মাণ করা হচ্ছে।

সরেজমিনে গিলে দেখা যায়, ভবন নির্মাণে পিপিআর নীতিমালা ও উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের আদেশ তোয়াক্কা না করে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানটি তাদের মন গড়াভাবে রাঙামাটি চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (সিজেএম) ভবন নির্মাণ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। কাজ চুক্তির মেয়াদ থেকে প্রথমবারের নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে গেলেও ৩৫ শতাংশ শেষ করতে পারেনি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। গুটিকয়েক লোক দিয়ে যেনতেনভাবে কাজটি চলছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে বেশ কয়েকবার ফোনকরলেও ভবনটির নির্মাণে চুক্তিবদ্ধ হওয়া ‘ডেল্টা ইঞ্জিনিয়ার্স এন্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেড এর স্বত্ত্বাধীকারী মমিন কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

রাঙামাটি গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এএসএম সানাউল্লাহ বলেন, যেসব অভিযোগ উঠেছিল, তা সমাধান করা হয়েছে। ঠিকাদারকে কাজের মান ঠিক করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, সিজিএম আদালত ভবনটি নির্মাণে চুক্তির সময় শেষ। সময় আরও বাড়ানোর জন্য ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান চিঠি দিয়েছে। ষষ্ঠতলা ভবনের এখন মাত্র দ্বিতীয় তলার ঢালাই কাজ শেষ হয়েছে। ভবন নির্মাণে ঠিকাদারের স্বেচ্ছাচারিতা এবং ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের বিল ছাড়ের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি সিক্রেট, জানানো যাবেনা বলে জবাব দেন।##