প্রকাশ: ৯ ডিসেম্বর ২০১৭, ১১:৪২:০৮

নিউইয়র্কে বাংলাদেশী স্ত্রীসহ গ্রেফতার, পরে মুক্তি

আন্না খালেদ ও মোহাম্মদ আজিজ

আন্না খালেদ ও মোহাম্মদ আজিজ

অনলাইন ডেস্ক : প্রথম স্ত্রীর নাম এবং সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বরসহ যাবতীয় তথ্য চুরি করে দ্বিতীয় স্ত্রীর সন্তান প্রসবের প্রক্রিয়া অবলম্বনের অভিযোগে মোহাম্মদ আজিজ (৬১) এবং তার দ্বিতীয় স্ত্রী আন্না খালেদকে (৪২) গ্রেফতার করেছিল নিউইয়র্ক সিটি সংলগ্ন নাসাউ কাউন্টির পুলিশ।

নাসাউ কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট এটর্নী ম্যাডেলাইন সিঙ্গাস এবং নাসাউ কাউন্টি পুলিশ ডিপার্টমেন্ট যৌথভাবে গত বৃহস্পতিবার এই প্রতিবেদককে চাঞ্চল্যকর এ মামলার তথ্য জানিয়েছেন।

নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির বোর্ড অব ট্রাস্টির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আজিজকে গ্রেফতার করা হয় ২৯ নভেম্বর এবং পরদিন ৩ হাজার ডলার বন্ডে জামিনে মুক্তি পান। অপরদিকে, আন্না খালেদকে গ্রেফতারের পরদিন ২৮ অক্টোবর জামিন দেয়া হয়।

নারায়ণগঞ্জের সন্তান মোহাম্মদ আজিজের বিরুদ্ধে প্রথম ডিগ্রির আইডেন্টিটি চুরি, চতুর্থ ডিগ্রির হেলথকেয়ার প্রতারণার অভিযোগ আনা হয়েছে। অপরদিকে আন্না খালেদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছে সেকেন্ড ডিগ্রির প্রতারণা এবং ফার্স্ট ডিগ্রির আইডেন্টিটি চুরির অভিযোগ।

মোহাম্মদ আজিজকে কোর্টে যেতে হবে ১৭ জানুয়ারি এবং তারা বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে বলেও ডিস্ট্রিক্ট এটর্নী উল্লেখ করেছেন।

অপরদিকে আন্না খালেদকে কোর্টে যেতে হবে ১৬ ফেব্রুয়ারি। তিনি দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ ৭ বছরের জেল হতে পারে।

মামলার বিবরণে প্রকাশ, তালাকের প্রক্রিয়ায় থাকা প্রথম স্ত্রী ফারহানা সম্প্রতি চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে গেলে উদঘাটিত হয় এই জালিয়াতির তথ্য। চিকিৎসকরা তার কাছে জানতে চান যে, সন্তানটি কেমন আছে, তার শরীর কেমন ইত্যাদি।
এমন প্রশ্নে চমকে উঠেন ফারহানা।

চিকিৎসককে তিনি অবহিত করেন যে, কয়েক বছরের মধ্যে তিনি সন্তান সম্ভাবা ছিলেন না, সন্তান প্রসব করা দূরের কথা। ডিস্ট্রিক্ট এটর্নী উল্লেখ করেছেন, একজনের তথ্য চুরি করে অপরজনের চিকিৎসা চালানো যে কত বড় ঝুঁকির তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

কারণ, প্রকৃত রোগীর শরীরের মত আন্না খালেদের শরীর নাও হতে পারে। অর্থাৎ ওষুধে বিষক্রিয়া দেখা দেয়া অস্বাভাবিক নয়। এ ব্যাপারে নাসাউ কাউন্টি পুলিশ সামগ্রিক তদন্ত অব্যাহত রেখেছে।

পুলিশ কমিশনার প্যাট্রিক রাইডার বলেন, ডিস্ট্রিক্ট এটর্নী অফিসের সমন্বয়ে এই মামলার তদন্ত ব্যাপকভাবে চালানো হচ্ছে। সন্তানের স্বাস্থ্য এবং প্রসূতির স্বাস্থ্যও পরীক্ষা করা হচ্ছে।
ডিস্ট্রিক্ট এটর্নী বলেন, ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে মিনিওলায় অবস্থিত উইনথ্রোপ হাসপাতালের (Winthrop Hospital in Mineola) জরুরি বিভাগে গিয়েছিলেন ভিকটিম ফারহানা। সে সময় তাকে পরীক্ষার সময় চিকিৎসক জানতে চান যে, আগে নেয়া ওষুধ কোন উপকারে আসছে কিনা। এর জবাবে তিনি চিকিৎসককে জানান যে, যেসব ওষুধের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো তিনি কখনো নেননি।

চিকিৎসক তাকে জানান যে, তার (ভিকটিম) মেডিক্যাল রেকর্ডে রয়েছে ঐসব ওষুধের তালিকা। নিউইয়র্কে লং আইল্যান্ড এলাকার গ্লেনকোভে অবস্থিত গ্লেনহেড ফার্মেসি (Glen Head Pharmacy in Glen Cove, New York) থেকে ওই সব ওষুধ তিনি রিসিভ করেছেন বলেও চিকিৎসক উল্লেখ করেন।

চিকিৎসক তার মেডিক্যাল রেকর্ড পরীক্ষা করে আরো জানান যে, কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি নর্থশোর লং আইল্যান্ড জুইশ-গ্লেনকোভ হাসপাতালে সন্তান প্রসব করেছেন।

এসব জানার পরই ফারহানা ওই ফার্মেসিতে যান এবং সেখানকার সিকিউরিটি ভিডিও ফুটেজ পরীক্ষা করে দেখেন যে, একজন নারী তার নামে ইস্যুকৃত ওষুধ রিসিভ করছেন। হাসপাতালে গিয়েও ডক্যুমেন্ট উদ্ধার করেন যে, তার নামসহ বিস্তারিত তথ্য ব্যবহার করে অন্য এক মহিলা সন্তান প্রসবসহ সমস্ত চিকিৎসা-ব্যয় নির্বাহ করেছেন তারই হেলথ ইন্স্যুরেন্স কার্ডে।

এ সময় আরো জানতে সক্ষম হন যে, ওই নারীর কিছু ডক্যুমেন্টে মোহাম্মদ আজিজের নামও রয়েছে। অর্থাৎ দ্বিতীয় স্ত্রী আন্নার সন্তান প্রসবের যাবতীয় ব্যয় চালিয়ে নিয়েছেন প্রথম স্ত্রীর ইন্স্যুরেন্সে।

আদালতে এই মামলা পরিচালনা করছেন ডিস্ট্রিক্ট এটর্নীর ইকনোমিক ক্রাউম ব্যুরোর দায়িত্বে থাকা সহকারি ডিস্ট্রিক্ট এটর্নী বেটি রডরিগুয়েজ।

অভিযোগ প্রসঙ্গে মোহাম্মদ আজিজ এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘ঘটনাটিতে আমাকে জড়িয়ে প্রথম স্ত্রী ফারহানা ধ্রুমজাল সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। প্রকৃত অর্থে আমার অজ্ঞাতে বর্তমান স্ত্রী আন্না খালেদ এ্যাজমার ওষুধ নিয়েছেন ফারহানার হেলথ ইন্স্যুরেন্স কার্ডে। কারণ, ওই সব ইন্স্যুরেন্সের পেমেন্ট নিয়মিতভাবে আমাকেই করতে হয় বিধায় তার (ফারহানার) হেলথ কার্ডের চিঠি আমার বাসায় আসছে।

বর্তমান স্ত্রী তা সঠিকভাবে অনুধাবনে সক্ষম না হওয়ায় এ্যাশমার ওষুধ নেন। তবে আন্নার সন্তান প্রসবের বিল ফারহানার ইন্স্যুরেন্সের বিপরীতে সমন্বয় সাধনের যে অভিযোগ করা হয়েছে, তা সত্য নয়। আমি সমস্ত খরচ বহন করেছি। ’

বাংলাদেশ সোসাইটির দুইবারের সভাপতি দায়িত্ব পালনের পর বর্তমানে বোর্ড অব ট্রাস্টির চেয়ারম্যান এবং কন্সট্রাকশন ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আজিজ ক্ষোভের সাথে আরো বলেন, ‘রাজধানী ঢাকায় আমার অনেক সম্পত্তির দলিল আমার স্বাক্ষর জাল করে লিখে নিয়েছেন প্রথম স্ত্রী। সে সব নিয়ে আইনী লড়াই চলছে। নিষ্পত্তি হবার পরই ডিভোর্সের বিষয়টি সম্পন্ন হবে। এমনি অবস্থায় ফারহানা আমাকে নানাভাবে হেনস্তার পন্থা অবলম্বন করেছেন-যা খুবই দুঃখজনক। ’

আজিজ উল্লেখ করেন, ‘ফারহানার দুই সন্তানসহ বর্তমান স্ত্রীর সন্তান এবং পরিবারের সকলের হেলথ ইন্স্যুারেন্সের মাসিক প্রিমিয়াম হিসেবে ২২০০ ডলার করে প্রদান করছে আমার কোম্পানি। তাই, অন্যের ইন্স্যুরেন্স ব্যবহারের প্রশ্নই উঠে না। ’

‘অভিযোগ নিয়ে কারো বিভ্রান্তির অবকাশ নেই এবং আইনগতভাবেই আমি তা মোকাবেলা করবো’-বলেন এম আজিজ।