প্রকাশ: ৭ ডিসেম্বর ২০১৭, ১৩:৩২:৪০

চট্টগ্রাম-৯ আসনে হেভিওয়েট প্রার্থীদের ভীড়

চট্টগ্রাম : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঠিক কবে হবে তার নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই। তবুও ২০১৯ সালকে টার্গেট করে এখন থেকেই তসবিহ গণনা শুরু করেছেন মনোনয়ন প্রত্যাশীরা। এ নিয়ে তোড়ঝোর চলছে সুবিধাভোগী নেতাকর্মীদের মধ্যেও।

কোন দল থেকে কে মনোনয়ন পাচ্ছেন এ নিয়ে চায়ের কাপে ঝড় তুলছেন তারা। এর ব্যতিক্রম নয় চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালী) আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশীরাও। যাদের প্রত্যেকেই হেভিওয়েট হিসেবে পরিচিত।

ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা অনেক আগে থেকেই বুক ফুলিয়ে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। জোটের কারণে সে সুযোগ পাচ্ছেন জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরাও। সেদিক থেকে ব্যতিক্রম বিএনপি। জিন্দাবাদ নিয়ে মাঠে নামলেই তাড়া খেতে হয় পুলিশের। শুরু হয় ধরপাকড়।

কারণ নগর বিএনপির এমন কোন নেতা নেই যার পেছনে হাফ ডজন-ফুল ডজন থেকে অর্ধশতাধিক পর্যন্ত মামলা নেই। এরমধ্যে নাশকতা মামলার আসামিও অনেকে। ফলে কোনভাবেই মাঠে স্বাভাবিক নয় বিএনপি। তবে নগরীর নুর আহমদ সড়কে নিজস্ব কার্যালয়ে স্বাভাবিক কাজকর্ম চালাচ্ছেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। সেখান থেকে যতটুকু পারছেন দলীয় কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন মনোনয়ন প্রত্যাশীরাও।

চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি) সংসদীয় আসনটি সিটি করপোরেশনের ৫, ১৬, ১৭, ১৮, ১৯, ২০, ২১, ২২, ২৩, ৩১, ৩২, ৩৩, ৩৪ এবং ৩৫ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত হওয়ায় আরেকটু বেশি বেকায়দায় রয়েছেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। এ আসনটি বিএনপির দূর্গ হিসেবে পরিচিত হওয়ায় ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের নজরও যেন একটু বেশি।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এ আসনে বিএনপিই অধিকসংখ্যক জয়লাভ করেছে এ আসন থেকে। ফলে দলীয় কার্যক্রমসহ সবরকম কৌশলে এ আসনটি এবার আওয়ামী লীগের পক্ষে আনতে মরিয়া ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা। সেভাবে প্রস্তুতি নিয়েও এগিয়ে যাচ্ছেন তারা।

এ আসন থেকে জয়লাভ করতে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একজন হেভিওয়েট প্রার্থী দিতে চান আওয়ামী লীগ। এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি। তিনি ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

এ প্রসঙ্গে নুরুল ইসলাম বিএসসি বলেন, চট্টগ্রামের এই সংসদীয় আসনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ আসনে আমি ব্যক্তিগতভাবে স্কুল-কলেজ নির্মাণসহ এলাকার প্রচুর উন্নয়ন করেছি। ফলে নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ব্যাপক জনসমর্থন আমার পক্ষে আছে। তাই আগামি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসন থেকে আমি নৌকার প্রার্থী হতে চাই। তবে এক্ষেত্রে নেত্রীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

তিনি বলেন, ২০১৪ সালে ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে মহাজোটের হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন জাতীয় পার্টির জিয়া উদ্দীন আহমেদ বাবলু। তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন ওয়ার্কাস পার্টির মোহাম্মদ আবু হানিফ। বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ) এর আরিফ মঈনুদ্দীন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী আলী আহমেদ নাজির। কিন্তু আগামি নির্বাচনের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। জাতীয় পার্টি আলাদাভাবে নির্বাচন করলে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন দেবে।

এ আসন থেকে মনোনয়ন চাইবেন বলে জানিয়েছেন নুরুল ইসলাম বিএসসির ছেলে মুজিবুর রহমানও। তিনি বলেন, বাবাকে যদি এ আসন থেকে মনোনয়ন দেয়া না হয়; তাহলে আমি এই আসন থেকে নৌকা প্রতিকে মনোনয়ন চাইব।

১৪ দল থেকে অন্য কাউকে প্রার্থী করলে সমর্থন করবেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ আসনে এবার আওয়ামী লীগ থেকে দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন দেয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

এদিকে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর ছেলে ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলও এ আসন থেকে মনোনয়ন চাইতে পারেন বলে গুঞ্জন রয়েছে।

নওফেল দলের বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক পদ পাওয়ার পর নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করায় দলের সাধারণ সম্পাদক সেতুমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুনজরে আছেন। ২০১৪ সালে ঘোষিত ৭১ সদস্যের চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির নির্বাহী সদস্যও তিনি।

২০১০ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে বাবা এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যাপকভাবে অংশ নেন নওফেল। ওই প্রথম রাজনীতির মাঠে সক্রিয় দেখা যায় লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স থেকে স্নাতক করা নওফেলকে।

২০১০ সালেই বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে রাজনীতিবিদ হওয়ার আগ্রহের কথা জানিয়েছিলেন তিনি। ঢাকা বারের আইনজীবী নওফেল চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিরও সদস্য। তিনি বেসরকারি একটি স্যাটেলাইট টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালকও।

এই প্রসঙ্গে নওফেল বলেন, আমি আগে বাবার জন্য মনোনয়ন চাইব। তবে বাবা এখন অসুস্থ। বাবার সুস্থ হওয়ার উপর নির্ভর করছে মনোনয়ন চাওয়া। যদি কোনো কারণে বাবা বাদ পড়েন তাহলে চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি) আসন থেকে আমি মনোনয়ন চাইব।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম-৯ আসন থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশীর তালিকায় রয়েছেন চট্টগ্রাম নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-সিডিএর বর্তমান চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম। তিনি ২০০৯ সালের ২৮মে চউক চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে চলতি মাসে ষষ্ঠবারের মতো ফের দায়িত্ব পান তিনি।

মনোনয়ন প্রসঙ্গে আবদুচ ছালাম বলেন, জনকল্যাণে সংসদ নির্বাচন করতে চান তিনি। অতীতে দুবার মনোনয়ন চেয়েও ব্যর্থ হয়েছি। রাজনৈতিক কর্মীদের একটা স্বপ্ন থাকে। ঊর্ধ্বমুখী এ প্রত্যাশার জন্যই তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে চট্টগ্রাম-৯ আসন থেকে নির্বাচন করার জন্য মনোনয়ন চাইবেন।

এছাড়া এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেতে নিজেদের প্রস্তুত করছেন বলে জানিয়েছেন নগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও বার কাউন্সিলের সদস্য অ্যাডভোকেট ইব্রাহিম হোসেন বাবুল। ইব্রাহিম হোসেন বাবুল সাবেক সেনা প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) হারুনুর রশীদের ফুফাতো ভাই।

এদিকে নগর বিএনপি থেকে এ আসনে সম্ভাব্য ৩ জন প্রার্থীর নাম জোরেশোরে আলোচনায় আসছে। তবে একক প্রার্থী হিসেবে নগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেনের প্রধান্যতা পাচ্ছে বেশি।

চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন এই প্রসঙ্গে বলেন, নেত্রী (খালেদা জিয়া) এরই মধ্যে চট্টগ্রাম-৯ আসন থেকে আমার নির্বাচন করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দিয়ে দিয়েছেন। এ আসনে আগের নির্বাচনগুলোতে আমি দলের পক্ষে সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেছি। নিজের এলাকা হওয়ায় বাকলিয়ার সঙ্গে আমার আত্মার সম্পর্ক। ইনশাআল্লাহ এই আসন থেকে আসছে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবো এবং জনগণ আমাকেই এমপি হিসেবে নির্বাচিত করবেন।

এ আসনের অন্যান্য প্রার্থী সম্পর্কে তিনি বলেন, আমি একজন ফেলোশিপ করা ডাক্তার। আবার এই আসনের অধিকাংশ ভোটারও উচ্চশিক্ষিত। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজও এই আসনটিতে। তাই ভোটাররা আমার পক্ষে রায় দেবেন বলেই আশা করছি।

আলোচিত্র এ নেতার বাইরেও বিএনপি থেকে মনোনয়ন চাচ্ছেন সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সাবেক চট্টগ্রাম সিটি মেয়র মীর মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনও। তিনিও বিএনপির হেভিওয়েট নেতা।

এদিকে জাতীয় পার্টি আলাদাভাবে নির্বাচনে অংশ নিলে এ আসন থেকে মনোনয়ন চাইতে পারেন বর্তমান সংসদ সদস্য জিয়াউদ্দীন আহমেদ বাবলু ও জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য সোলায়মান আলম শেঠও। সোলায়মান শেঠ বলেন, আমি এ আসনে জাতীয় পার্টি থেকে প্রার্থী হতে যাচ্ছি।

তবে রাজনৈতিক মহলের মতে, বন্দরনগরীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি) আসন। এটি জাতীয় সংসদের ২৮৬ নম্বর আসন। যে আসনে চূড়ান্ত প্রার্থী নির্বাচনে হিমশিম খেতে হয় রাজনৈতিক দলগুলোকে। নগরীর রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাবশালী শীর্ষ নেতারাই এ আসন থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী। যাদের হাতে নগরীর রাজনীতির রশি। ফলে প্রার্থী নির্বাচনের সমীকরণ বেশ জটিলই হবে।

প্রসঙ্গত, ২০১৯ সালে ২৮ জানুয়ারির আগে ৯০ দিনের মধ্যে একাদশ সংসদ নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সে হিসেবে ২০১৮ সালের ৩১ অক্টোবরের পর থেকেই শুরু হবে পরবর্তী নির্বাচনের দিনক্ষণ গণনা। ফলে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে কাকে প্রার্থী করলে ভোটের মাঠে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা যাবে তা নিয়ে চলছে ব্যাপক পর্যালোচনা। এতে পুরানো প্রার্থীদের অনেকেই বাদ পড়তে পারেন, আসতে পারেন তরুণ মুখও।