প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০১৭, ১২:৫৭:১২

এ কী কথা শুনি আজ…

তায়েব মিল্লাত হোসেন :
জিয়াউর রহমান। সাবেক রাষ্ট্রপতি। তার আগে সেনা প্রধান। আর একটু পেছনে ফিরলে ‘বীরউত্তম’ খেতাব পাওয়া মুক্তিযোদ্ধা। এক নম্বর সেক্টরের কমান্ডার। জেড ফোর্সের প্রধান। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বেতারে স্বাধীনতা ঘোষণার অন্যতম সফল একজন পাঠক। এখানে থামতে পারলে বাংলার ইতিহাসে জিয়া মহানায়কদের সারিতেই সামিল হতে পারতেন। কিন্তু মহামতি হুমায়ুন আজাদের একটি বাণী আছে না, ‘‘একবার রাজাকার মানে চিরকাল রাজাকার; কিন্তু একবার মুক্তিযোদ্ধা মানে চিরকাল মুক্তিযোদ্ধা নয়।’’

এই বাণীখানি জিয়ার বেলায় দারুণভাবে খেটে যায়। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট জাতির জনককে সপরিবারের হত্যা করা হলো। ঘাতকেরা বাংলার মাটিতে পাকিস্তানি আদর্শের ভূত আবার বাঙালির কাঁধে চাপাতে চাইলো। রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস তথা মুক্তিযুদ্ধের সময়কার দেশি ঘাতকরা আবার গর্ত থেকে বেরিয়ে আসতে লাগলো। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের নেতা মোশতাকের সরকার ‘জয় বাংলা’, ‘বাংলাদেশ বেতার’ বাদ দিয়ে পাকিস্তানি ভাবাবেগে কায়েম করে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’, ‘রেডিও বাংলাদেশ’। বঙ্গবন্ধুর খুনীদের বিচারের পথ বন্ধ করতে জারি হলো ইনডেমিনিটি বিল। যাই হোক, মোশতাকদের ক্ষমতার সুখ বেশি দিন সয়নি। বিপ্লব-প্রতিবিপ্লব ঘটে যায়। ক্ষমতার ভরকেন্দ্র হয়ে ওঠলেন জিয়া। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তিনি আবার একাত্তরের আদর্শ ও দর্শনের পথে দেশকে নিয়ে যেতে পারতেন। তিনি সেই পথে হাঁটলেন না। তিনি হাঁটলেন মোশতাকদের পথে।

ইনডেমিনিটি বিলকে সাংবিধানিক বৈধতা দিয়ে দিলেন। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় আরো গতি আনলেন। ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ আর ‘রেডিও বাংলাদেশ’ তো থাকলোই, তিনি তার চেয়েও বড় বিষয় বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ আমদানি করে বসলেন পাকিস্তান থেকে। বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম-নিশানা মুছে দিতে যা যা করা দরকার করলেন তার সবই। মেঘ দিয়ে অবশ্য সূর্য বেশি দিন আড়াল রাখা যায় না। যায়নি। অন্ধকারের যুগ শেষে জাতির জনক আপন মহিমায় উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়েছেন।

প্রসঙ্গে আসি, গণতন্ত্রের জন্যেও কিছু কলঙ্কজনক অধ্যায় তৈরি করলেন জিয়া। সেনাপতির পদে থেকেই রাষ্ট্রপতি হলেন, রাজনৈতিক দলের নেতা হলেন। সমর-শক্তিকে কাজে লাগিয়ে হয়ে গেলেন, একজন গণতান্ত্রিক নেতা! পৃথিবীর গণতন্ত্রের ইতিহাসে এর চেয়ে নিন্দনীয় আর কিছু হয় না, হতে পারে না।

পুরনো কাসুন্দি আপাতত থাক। ফিরি এই সময়ে। ১৫ অক্টোবর রোববার জিয়ার জন্ম দেয়া দল বিএনপি আলাপ করেছে ইসিতে গিয়ে। সংসদ-হারা, রাজপথ-ছাড়া প্রধান দলটিকে আপ্যায়নে কোনো খামতি রাখেননি আমাদের প্রধান নির্বাচন কমিশনার-সিইসি। বেশি খাতির-যত্ন করেছেন। অতিথিকে নারায়ণ ভেবে কথা দিয়েও চিড়ে ভিজিয়েছেন। তিনি বলেই বসেন, ব্যক্তি হিসেবে এবং দলনেতা হিসেবে জিয়াউর রহমান চার বছর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন।

“তার হাত দিয়েই দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনপ্রতিষ্ঠা লাভ করে।”- এমন উক্তিতে যেন তুরুপের তাস পেয়ে গেছে বিএনপি। ফেসবুক ছেয়ে গেছে তাদের বিজয় মিছিলে।

আমাদের দেশে, আমাদের গ্রাম যে চর্চা আমাকে প্রায়ই ভাবিয়ে তোলে তা হচ্ছে গিয়ে- আপনি কিভাবে ধনবান হয়েছেন, তা কোনো বিষয় নয়। আপনি দান-খয়রাত করছেন কিনা সেটাই বড় বিষয়। তাই সৎ হিসেবির চেয়ে অসৎ দানবীরের জয়-জয়কার আজকের সমাজে। মহামান্য সিইসির ‘জিয়া’ দর্শনেও ছিল তারই আলামত।

কিন্তু অসৎ কেউ যদি দানবীর হন, আর আইনের মুখোমুখি কোনো একবার হন, তাকে বিচারের মুখে পড়তে হয়; তখন আর কিন্তু পার পাওয়া সহজ হয় না। শত-হাজার-লাখো মানুষ তার পক্ষে হাত তালি দিলেও আইন চলে আইনের পথেই। তাই জিয়ার শংসাবচন রচনার আগে সিইসি মহোদয়ের উচিৎ ছিল একবার অন্তত উচ্চ আদালতের আদেশ-উপদেশ-নির্দেশনা-রায় জেনে নেয়া। হয়তো তিনি জানেনও। যেমন, কর্নেল তাহেরকে ফাঁসি দেয়ার ‘বিচার-প্রক্রিয়া’ উচ্চ আদালতের রায়ে এখন ঠাণ্ডার মাথার খুন। একই আদালত, জিয়াকে সেই খুনের পরিকল্পনাকারী বলেছেন। অন্যদিকে তারও আগে পঞ্চম সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করতে গিয়ে উচ্চ আদালত বলেছিলেন, সংবিধান-বহির্ভূতভাবে মোশতাক, সায়েম ও জিয়া ক্ষমতা দখল করেছেন। কারণ আমাদের সংবিধানে সামরিক আইন বলে কিছু নেই।

টিপ্পনী
শহরের লোকজন হয়তো জানেন না। কিন্তু যারা গ্রামে বড় হয়েছেন, তারা নিশ্চয় জানেন। ডাহুক ধরতে শিকারীরা ডাহুকই ব্যবহার করে। খাঁচায় বন্দী ডাহুক পুকুরের কচুরির উপর বসানো হয়। এরপর সেই ডাহুক ডাকতেই থাকে, ডাকতেই থাকে! তার আহ্বানে মুক্ত ডাহুক সাড়া না দিয়ে আর পারে না। যখন আকুল হয়ে ছুটে আসে, তখনি ফাঁদে আটকা পড়ে সে। গ্রামের এই ঘটনা গ্রাম অবধি থাকুক। শহুরে রাজনীতির রঙ্গমঞ্চের সঙ্গে একে আর না মেলাই!

তায়েব মিল্লাত হোসেন : সাংবাদিক, গবেষক ও সাহিত্যিক