প্রকাশ: ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১২:১৭:৪২

বাংলাদেশে ঘন্টায় ৩শ’ রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ

কক্সবাজার : গতকাল শুক্রবার দুপুর ১২ টা। উখিয়ার কুতুপালংয়ের রাস্তার দুই পাশ্বে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছে হাজারো নারী পুরুষ। একটি ট্রাক ভর্তি ত্রানের গাড়ির দেখা মিলতেই সবাই এক যোগে ছুটে গেছে গাড়ির কাছে। কিন্তু এক যোগে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা নারী পুরুষ ত্রানের গাড়ি ঘিরে ধরায় ত্রানের মালামাল নিয়ে আসা লোকজন ত্রান না দিয়েই সামনে অগ্রসর হলো। এর একটু পরেই আরেকটি ত্রান (রান্না করা খাবার) ভর্তি পিকআপ ভ্যান আসার সাথে সাথে আবারো ঘিরে ধরে রাস্তার পাশে অবস্থান করা রোহিঙ্গারা।

এবারের চিত্রে আছে ভিন্নতা। গাড়ি থেকেই রান্না করা আখনি বিরানীর প্যাকেট ছুড়ছে রোহিঙ্গাদের উদ্যেশে। একটি বিরানীর প্যাকট মাঠিতে পড়ার আগেই শতাধিক হাত তা নিজের আয়ত্তে আনতে মরিয়া। বিরিয়ানী পেয়ে অনেকে খুশি হলেও খাবার না পেয়ে ফিরে যাওয়া মানুষের সংখ্যা নিহায়েত কম নয়। এদেরই এক জন করিমুন্নেছা (৪০)। তার কোলে রয়েছে দেড় বছরের একটি শিশু। আর তার পেছনে হাটছে তার দুই কন্যা সন্তান যথাক্রমে সোনাবি আক্তার (৭) ও হাবিবি (৫)।

তার সাথে আলাপ কালে জানা যায়, গত বুধবার সে তার তিন সন্তানকে নিয়ে নাফ নদী সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশের হোয়াইক্ষং সীমান্ত হয়ে কুতুপালংয়ে পৌছে। গত রবিবার তার স্বামী ও নুরুল বশর ও তার দেবর নুরুল আলমকে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ধরে নিয়ে যাওয়ার পর তারা কোন রকমে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়। এখনো পর্যন্ত স্বামী ও দেবরের কি পরিণতি হলো তা জানেনা সে। ঘর থেকে বের হয়েছিল এক কাপড়েই সহায় সম্ভল হিসেবে পরনের কাপড়ই তার একমাত্র সম্ভল। কোন খাবার না থাকায় গত তিন দিন ধরেই অভুক্ত পুুরো পরিবার।

এহেন পরিস্থিতিতে কোন ত্রানের গাড়ি দেখলেই খাবারের আশায় রাস্তার কিনারায় জড়ো হয়। শুধু করিমুন্নেছা নয় এ ধরনের পরিবারের সংখ্যা শুধুমাত্র কুতুপালংয়ে ত্রিশ হাজারেরও অধিক বলে জানান স্থানীয়রা।

টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্ষং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাওলানা নুর আহমদ আনোয়ারী জানান, মিয়ানমারে সহিংসতা শুরু হওয়ার পর থেকে নাফ নদী পার হয়ে শুধুমাত্র হোয়াইক্ষং সীমান্ত দিয়ে অন্তত ৫০ হাজারেরও অধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। তারা হোয়াইক্ষং, থ্যাংখালী, বালুখালী, পালংখালী এলাকায় বিভিন্ন পাহাড় ও রাস্তার কিনারায় অবস্থান নিয়েছে। এসব রোহিঙ্গা জনগোষ্টির জন্য বিভিন্ন ধর্ণাঢ্য ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সেচ্ছাবেী সংগঠনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের ত্রান সামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। তবে এখনো পর্যন্ত সরকারী ভাবে কোন ত্রান দেওয়া হয়নি বলে জানান তিনি।

রোহিঙ্গাদের ত্রান দিতে আসা বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটসের চট্টগ্রাম অঞ্চলের সভাপতি এডভোকেট এএম জিয়া হাবিব আহসান ও সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট শরীফ উদ্দিন বলেন, আমরা মিয়ানমারে নির্যাতিত জনগোষ্টির জন্য তিনটি গাড়িতে করে মশারী, পরনের কাপড়, শুকনো খাবার ও নগদ টাকা আনছিলাম। কিন্তু গত কয়েক দিনে নির্যাতনের মুখে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গার তুলনায় এ ত্রান কিছুই না। আরো ব্যাপক আকারে ত্রান প্রয়োজন রয়েছে।

তিনি বলেন, বানের স্রোতের মত বাংলাদেশে প্রবেশ করা এসব রোহিঙ্গা রাস্তার ধারে ও পাহাড়ে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছে। বৃষ্টিতে ভেজা ও রোদে পোড়া অবস্থা তাদের। তাদের নেই কোন স্যানিটেশন ব্যবস্থা, রয়েছে পানির প্রকট সংকট। এহেন অবস্থায় অনেক শিশু সেখানে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। তাদের জন্য জরুরী ভিত্তিতে ব্যাপক আকারে ত্রান ও চিকিৎসা সেবা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

গতকাল শুক্রবার সরেজমিন পরির্দশনকালে দেখা যায়, প্রতি এক ঘন্টায় অন্তত ৩শ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। এদের মধ্যে নারী শিশু ও বৃদ্ধ লোকও রয়েছে। দুই ছেলের কাদে করে নিজ ঘর ছেড়ে বাংলাদেশে আসা নুর আয়শা বেগম (৯০) বলেন, আমি এমন নির্যাতন আর দেখিনি। ঘরের সব কিছু ফেলে ছেলেরা আমাকে নিয়ে পালিয়ে এসেছে জানিনা আর কোন দিন নিজ ঘরে ফিরতে পারব কিনা।

দুই কন্যা ও এক ছেলে সন্তান এবং স্ত্রীকে নিয়ে আসা মোহাম্মদ জোবায়ের বলেন, আমি সেখানে (মিয়ানমারে) ব্যবসা করতাম। আমার মুদির দোকান ছিল। কিন্তু মিয়ানমারের রাখাইনরা আমার দোকান পুড়ে দিয়েছে। তাই বাড়ি ঘর ছেড়ে চলে এসেছি। দিন দিন বাড়ছে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা। বাড়ছে নানা সমস্যাও। এহেন সমস্যা থেকে কখন পরিত্রান পাবে বাংলাদেশ এমন প্রশ্ন সকলের।