প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০১৭, ১২:৩৬:৩৫

রিজিয়া নদভীকে নিয়ে নানা কথা ও প্রশ্ন কেন?

ctg

চট্টগ্রাম :
রিজিয়া রেজা চৌধুরী ওরফে রিজিয়া নদভী। ছবি ফেসবুক থেকে নেওয়া ।জামায়াত নেতার মেয়ে রিজিয়া রেজা চৌধুরী ওরফে রিজিয়া নদভীকে মহিলা আওয়ামী লীগের কমিটির সদস্য করায় তুমুল সমালোচনা চলছে। বিষয়টিকে গুরুতর বলে মনে করছে না মহিলা আওয়ামী লীগ। রিজিয়া নদভী মনে করছেন, দল ও তাঁর পরিবারকে ছোট করতেই সমালোচনার জন্ম।

গত শনিবার মহিলা আওয়ামী লীগের ১৫১ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। কমিটিতে ২১ জনকে সহসভাপতি, ৮ জনকে যুগ্ম সম্পাদক ও ৮ জনকে সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়। এ ছাড়া আরও ২৩ জনকে অন্যান্য বিষয়ের সম্পাদক ও ৮৯ জনকে সদস্য মনোনয়ন করা হয়। সদস্যদের তালিকায় ৬৮ নম্বরে সদস্য মনোনীত হন চট্টগ্রামের রিজিয়া নদভী। এর পর থেকে সমালোচনা শুরু হয়।

চলতি বছরের শুরুতে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের কমিটিতেও সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে রিজিয়া নদভীর নাম এসেছিল। পরে সমালোচনার মুখে তাঁকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

রিজিয়া নদভীর বাবা মুমিনুল হক চৌধুরী জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য ছিলেন। এই বিষয়টি নিয়ে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা দলের সিদ্ধান্তের বিষয়ে সমালোচনা করতে শুরু করেন। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি সফিকুল ইসলাম লেখেন, ‘…যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী ও বদর কমান্ডার মুজাহিদের গায়েবানা জানাজার ইমাম, বাঁশখালী আসন থেকে বারবার দাঁড়িপাল্লা নিয়ে নির্বাচন করা মুমিনুল হক চৌধুরীর মেয়ে রিজিয়া নদভী। যিনি ছাত্রী সংস্থার নেত্রী, তিনি এখন বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, রিজিয়া নদভী!!!!!’

সফিকুল ইসলামের ফেসবুক থেকে নেওয়া ।

দেওয়ান জমির হোসাইন নামের অপর একজন ফেসবুকে লেখেন, ‘বসন্ত আসুক…. আর কোকিল ডাকুক…? কাউয়া কিন্তু সারা বছরই কা. . কা করে।’

২০১৬ সালের ১১ মে চট্টগ্রামে যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামীর গায়েবানা জানাজা পড়ান মুমিনুল হক চৌধুরী। এরপর ওই দিন বেলা দেড়টায় নগরের চট্টগ্রাম কলেজ-সংলগ্ন প্যারেড মাঠে নিজামীর দ্বিতীয় গায়েবানা জানাজার কর্মসূচি দেয় জামায়াত। সেই কর্মসূচি ঠেকানোর ঘোষণা দিয়ে চট্টগ্রাম কলেজ শাখা ছাত্রলীগ কলেজের ফটকে অবস্থান নেয়। পরে জামায়াতের নেতা-কর্মীর সঙ্গে ছাত্রলীগ ও পুলিশের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ইটপাটকেল ছোড়ার ঘটনা ঘটে।

এর আগে ২০১৩ সালের ২৫ এপ্রিল জামায়াতে ইসলামীর চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা শাখার আমির জাফর সাদেককে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। দক্ষিণ চট্টগ্রামে পুলিশের ওপর হামলাসহ বিভিন্ন সহিংস ঘটনার পরিকল্পনার অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। জাফর সাদেককে গ্রেপ্তারের ঘটনায় চট্টগ্রাম জামায়াতের পক্ষ থেকে তীব্র নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দেওয়া হয়েছিল। সেই বিবৃতি দাতাদের অন্যতম একজন ছিলেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য মুমিনুল হক চৌধুরী।

এসব অভিযোগের বিষয়ে রিজিয়া নদভী বলেন, ‘একজন নারী হিসেবে আমার লিগ্যাল গার্ডিয়ান আমার স্বামী। এটা বাংলাদেশের আইন। এখানে আমার বাবার বিষয়টা গৌণ বিষয়। আমার স্বামীর সহযোদ্ধা হিসেবে আমিও আওয়ামী লীগ করি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে আস্থা নিয়ে আমার স্বামীকে নৌকা প্রতীক দিয়েছেন, সেই আস্থা থেকে আমিও পদ পেয়েছি। যেহেতু বাঁশখালী-লোহাগড়ায় নারীদের ভোটে আওয়ামী লীগ পরাজিত হয়, মাঠের এই অবস্থা দেখে আমি আমার স্বামীর সঙ্গে কাজ শুরু করি। আর আমার কার্যক্রমকে দল মূল্যায়ন করেছে।’

মুমিনুল হক চৌধুরী যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামীর গায়েবানা জানাজা পড়িয়েছিলেন, এ বিষয়ে রিজিয়া নদভী বলেন, ‘আমি অস্বীকার করব না। আমার বাবা তখন অনেক অসুস্থ ছিলেন। তাঁর ডায়রিয়া হয়েছিল। আমার বাবাকে ভুল বুঝিয়ে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।’ তিনি বলেন, সাতকানিয়া-লোহাগড়া এলাকা জামায়াত অধ্যুষিত। এই এলাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজনীতি করার কারণে দল তাঁকে মনোনীত করেছে। যাঁরা সমালোচনা করছেন, তাঁরা সরকার ও তাঁর পরিবারকে হেয় করার জন্য এসব করছেন।

নেতা-কর্মীদের সমালোচনার বিষয়ে মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদা বেগম বলেন, ‘ওনার (রিজিয়া নদভী) বিয়ে হয়েছে ১২ কী ১৩ বছর বয়সে। স্বামীর সঙ্গে সংসার করছেন আজকে ৩০ বছর হবে। স্বামীর সঙ্গে ৩০ বছর সংসার করছেন, স্বামী একজন সংসদ সদস্য। উনি (রিজিয়া নদভী) কি এখনো আওয়ামী লীগ হতে পারেননি?’

মাহমুদা বেগম বলেন, স্বামীর সংসারে স্বামীর সঙ্গে রাজনীতি করল। তাঁর মৃত্যু হলে তো স্বামীর বাড়িতেই দাফন করা হবে। তাহলে তাঁর বাবার বিষয়টি বারবার কেন সামনে আনা হচ্ছে? আর রিজিয়া নদভীর স্বামীর বিরুদ্ধে যদি কোনো অভিযোগ থাকে, সেটি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দেখবে।

রিজিয়া নদভীর স্বামী আওয়ামী লীগের চট্টগ্রাম-১৫ (সাতাকানিয়া-লোহাগড়া) আসনের সংসদ সদস্য আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামুদ্দিন নদভী।

মহিলা আওয়ামী লীগের কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান নেত্রী এ ঘটনায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, এ দেশে পরিবার একটি বড় বিষয়। এখানে যুদ্ধাপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধী নিয়ে সমাজ দুই ভাগে বিভক্ত। সেখানে এমন একজন ব্যক্তিকে পদ না দিলেও হয়তো হতো। এ ছাড়া এখন আওয়ামী লীগের কর্মীর অভাব নেই, এই মুহূর্তে এমন একজনকে মনোনীত না করলেও হতো। সামনে নির্বাচন হওয়ায় এ বিষয়টি দলকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

প্রায় ১৪ বছর পর গত ৪ মার্চ মহিলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন হয়। সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন সভাপতি হন সাফিয়া খাতুন এবং সাধারণ সম্পাদক হন মাহমুদা বেগম। একই দিন ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের কমিটি ঘোষণা করা হয়। ঢাকা উত্তর মহিলা লীগের সভাপতি হন শাহিদা তারেক, সাধারণ সম্পাদক শবনম শীলা এবং দক্ষিণে সভাপতি সাবেরা বেগম ও নার্গিস রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।-প্রথম আলো