প্রকাশ: ৬ জুন ২০১৭, ১৫:০৮:৫৫

মুসলমানদের জন্য বৌদ্ধদের ইফতারের আয়োজন

image-35759

অনলাইন ডেস্ক :: সময় বিকাল পাঁচটা। রাস্তায় সারি বদ্ধ মানুষ। ফটকে দাঁড়ানো আনসার সদস্যদের কাছ থেকে টোকেন নিয়ে ঢুকছেন তারা। ভেতরে বড় টেবিল জুড়ে রাখা আছে শত শত খাবারের প্যাকেট। টোকেন জমা দিয়ে একেক জন টেবিল থেকে খাবারের প্যাকেট সংগ্রহ করছেন। কিছুক্ষণ পর কেউ প্যাকেট খুলে সেখানেই খাচ্ছেন অথবা কেউ প্যাকেট নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন।

না, এটা কোন ত্রাণ বিতরণের চিরচেনা দৃশ্য নয়। এ দৃশ্য রমজান উপলক্ষে ইফতার বিতরণের। আর প্রত্যেক রমজানে এমন দৃশ্য আপনার চোখে পড়বে রাজধানীর বাসাবোতে সবুজবাগ এলাকার ‘ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহারে।’

১৯৬০ সালে বিহারটি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে অনাথ ও দুঃস্থ শিশুরা এখানে বিনামূল্যে থাকা-খাওয়া ও পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে। বিহারের অনাথালয়ে ৫৬০ জন অনাথ শিশু আছে।

২০১৩ সাল থেকে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য ইফতারের আয়োজন করে বৌদ্ধবিহারটি। নিজস্ব অর্থায়নে রমজানের প্রতিদিন প্রায় সাড়ে তিনশ মুসলিম রোজাদারের হাতে ইফতার সামগ্রী তুলে দেন ভান্তেরা। শুধু ইফতারই নয়, ঈদের আগের দিন অসচ্ছল পরিবারের মানুষদের শাড়ি, লুঙ্গি, চাল, সেমাই, চিনিসহ বিভিন্ন উপকরণ বিতরণ করেন ধর্মরাজিক বৌদ্ধবিহার কর্তৃপক্ষ।

ইফতারের আয়োজন নিয়ে ধর্মরাজিক বৌদ্ধবিহারের ভিক্ষুদের একজন নিব্বুতি থেরর সাথে কথা হলো। তিনি বললেন, ‘প্রতিদিন প্রায় সাড়ে তিনশ মানুষের ইফতারের আয়োজন হয় এখানে। ইফতারের প্যাকেটে থাকে আলুর চপ, ছোলা, বেগুনি, পিয়াজু, জিলাপি, খেজুর ও মুড়ি। এছাড়া মাঝে মাঝে বিভিন্ন রকম ফল দেওয়া হয়। প্রতি প্যাকেটে খরচ পরে প্রায় পঞাশ টাকা। ধর্মরাজিক বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ শুদ্ধানন্দ মহাথের নির্দেশে বৌদ্ধ মন্দিরের নিজস্ব তহবিল থেকে অর্থ নিয়েই ইফতার এবং ঈদের সামগ্রী বিতরণ করা হয়।’

এরকম একটা আয়োজনের উদ্দেশ্য কি জানতে চাইলে আরেক ভিক্ষু বিপানন্দ বলেন, ‘গরিব অসহায় মানুষকে এক বেলা খাওয়াতে পেরে আমাদের খুব ভাল লাগে। যারা এখানে আসেন ইফতার নিতে তারা সকলে আমাদের আপন জন হয়ে গেছেন। সকাল থেকে চিন্তা থাকে কখন ইফতার রেডি হবে। কখন তাদের মাঝে ইফতারের প্যাকেট বিতরণ করা হবে। এমনকি মাগরিবের আজান পর্যন্ত অপেক্ষা করি, কেউ যাতে এসে ফিরে না যায়। কারণ অসহায় রোজাদার মানুষ গুলো জানে বিহারে তাদের জন্য ইফতার থাকে। তাদের খাবার প্যাকেট হাতে তুলে দেবার পর যে হাসি দেখি সেটাই বড় আমাদের কাছে। গরীব বলে কখন আমরা তাদের অবহেলা করি না।’

ইফতার বিতরণের কার্যক্রম নিয়ে বিহারের আবাসিক ভিক্ষু কল্যাণ জ্যোতি বলেন, ‘প্রতিদিন বেলা ১২টা থেকে ইফতার তৈরির কাজ করেন মন্দিরের বাবুর্চিরা। আর বেশ কিছু ইফতারের পদ বাইরে থেকে কেনা হয়।’

কল্যাণ জ্যোতি আরও বলেন, ‘সামাজিক সম্পৃতি বাড়ানোর জন্যেই এই ইফতার বিতরণের উদ্যোগ। যারা এখানে ইফতার নিতে আসেন তাদের অধিকাংশই দুঃস্থ নারী। এছাড়া অসহায় রোজাদারসহ রিকসাচালক ও দিনমজুররাও আসেন ইফতার নিতে।’

ইফতারি নিতে ভিড় করেছেন যারা, তাদের মধ্যে একজন রফিক মিয়া। বললেন, ‘আমি এই এলাকার বস্তিতে থাকি। প্রত্যেক রোজায় এখানকার ইফতারি দিয়া রোজা ভাঙি।’

জানালেন তার সাথে পরিবারের অন্য সদস্যরাও এখানে আসেন ইফতার নিতে।

৬০ বছরের বৃদ্ধা কুলসুমও ছিলেন সেই ভিড়ে। তিনি বলেন, ‘এখান থেকে ইফতার নিয়া আল্লাহর নামে খাই। বৌদ্ধ বিহারের মানুষ বিনা টাকায় ইফতার করাইতেছে। সেইটা কয়জনে করায়।’ গত রমজানের ঈদে তিনি এখান থেকে একটা শাড়িও পেয়েছিলেন তিনি।

সিটিজিসান.কম/রবি